আগামী অর্থবছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে। ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য প্রকল্পটি নতুন বছরের উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়েছে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় যা ৫৫ শতাংশ বেশি।

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণসহ নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ২০৩৩ সালে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং ভবিষ্যতের যানবাহনের চাপ সামলাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।

মেট্রোরেলের সঙ্গে মনোরেল-ভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা এবং পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার, প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিতকরণ, রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার যানজট নিরসন, ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেল-ভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হবে।

এর আগে সরকার ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি স্থানীয় অর্থায়ন ও ১ লাখ ১০ হাজার কোটি বৈদেশিক অর্থায়নে সংস্থান করা হবে। বাকি টাকা বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ১ হাজার ১২১টি প্রকল্পের জন্য এ বরাদ্দ। এর মধ্যে আটটি মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩৬ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন দিলেও বরাদ্দ রাখা হয়নি।

প্রকল্পেভেদে রূপপুরের পর সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের লাইন-৫ (উত্তর রুট)। যার জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের সংশোধিত বরাদ্দ ১ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৮৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

প্রস্তাবিত এডিপি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কয়েকটি বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সামগ্রিকভাবে মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ তেমন বাড়ানো হয়নি। বরং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পানি ব্যবস্থাপনা খাতের মাঝারি প্রকল্পগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ঢাকা এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি, যদিও প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এছাড়া ডিপিডিসি এলাকায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচিতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষায় লার্নিং অ্যাক্সেলারেশন প্রকল্পে বরাদ্দ ২১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা করা হয়েছে।

পরিবহন খাতে, ঢাকা এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পে ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়াল গেজ রেললাইন রূপান্তর প্রকল্পেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে কিছু চলমান মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এবং এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্প।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এবারের এডিপির আকার বড় হওয়া এবং একাধিক প্রকল্প সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় প্রকল্পগুলোয় বড়ি ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষত মেট্রোরেল, স্কুল ফিডিংয়ের মতো প্রকল্পগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। অন্যদিকে রূপপুর, মাতারবাড়ির বিদ্যুতের প্রকল্পগুলো বিদেশী ঋণে নেয়ায় এগুলো দ্রুত শেষ করার একটি বিষয় থাকে। সে জায়গা থেকে প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানোর অনুমিত ছিল।’

বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী নতুন মেগা প্রকল্পের সময় এসেছে বলেও মনে করেন তারা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখন সময় আসছে অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী দ্বিতীয় পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের। আমাদের মতো দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হলে ব্যক্তি খাতের জন্য যেমন সুবিধা সৃষ্টি হয়, তেমনি সাধারণ মানুষও আরো উন্নত নাগরিক সেবা পেতে পারেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বৈদেশিক সহায়তা নিতে হবে। তাই প্রকিউরমেন্ট যেন সঠিকভাবে হয়, প্রাক্কলন যেন যথাযথ থাকে, ডিপিপি ও ফিজিবিলিটি স্টাডি যেন নির্ভুলভাবে করা হয় এবং ইন্টারনাল রেট অব রিটার্নসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক যেন সঠিকভাবে হিসাব করা হয়—সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এসব বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি আরো শক্তিশালী করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এসব অবশ্য বাস্তবায়ন একদিনে হবে না, এটি পর্যায়ক্রমে এবং দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করেই এগিয়ে নিতে হবে। তবে এসব অবকাঠামো প্রকল্প যদি আমরা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ব্যক্তি খাত উৎসাহিত হবে এবং বিনিয়োগও প্রণোদিত হবে। তবে সবকিছুই সুশাসনের সঙ্গে করতে হবে, ব্যয় সাশ্রয়ীভাবে করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে।’