এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এছাড়া শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে মোট প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। অবশিষ্ট প্রায় ১৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বস্ত্র, রেল, প্রতিরক্ষা, কৃষি, মৎস্য এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত শিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠবে। শিক্ষা কারিকুলাম রূপান্তরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক চরিত্র বিকাশে গুরুত্ব দেয়া হবে। কারিকুলামে বাধ্যতামূলক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং আনন্দময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা যেমন জাপানিজ, কোরিয়ান, মান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ইত্যাদি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে সরকার তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দিচ্ছে।’ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অনুধাবন, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ক্লাবভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম, যেমন বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং প্রান্তিক থেকে জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করা হবে।’ মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ করার কথাও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া পর্যায়ক্রমে ‘মিড ডে মিল’ সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মানোন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু, উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে।
বাজেটের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার এ বাজেটকে আমরা স্বাগত জানাই। বাজেটে দুটো ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো সরকার শিক্ষাকে একক খাত হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, শিক্ষার সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হতো, দীর্ঘদিন ধরেই আমরা এটিকে একক খাত হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়ে আসছিলাম। দ্বিতীয়ত, সরকার শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে একসঙ্গে বিবেচনা করছে। বাজেটে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কিছু উদ্যোগের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে। তবে বরাদ্দ সন্তোষজনক হলেও কিছু উদ্বেগ ও ঝুঁকির জায়গা রয়েছে। একটি হলো বাজেটে গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়নি, আরেকটি বিষয় হলো শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যয়ের ৭০ শতাংশ পরিবার বহন করে, সেটি এ বাজেটের মাধ্যমে কমবে কিনা স্পষ্ট নয়। এছাড়া শিক্ষা উপকরণের মূল্যহ্রাসের বিষয়েও কিছু উল্লেখ করা হয়নি৷ সরকার বিনামূল্যে বই, ইউনিফর্মের কথা বলছে, কিন্তু এর বাইরেও সারা বছরই শিক্ষার্থীদের অনেক শিক্ষা উপকরণ কিনতে হয়, এগুলোর মূল্যহ্রাসও জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ শিক্ষার অনেক প্রকল্পেই বিপুল পরিমাণ অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ভালো থাকলেও তা কার্যকর হয়নি, শিক্ষার উন্নয়ন হয়নি। এমনটি যেন না হয়। পর্যাপ্ত মনিটরিং ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২ শতাংশের কাছাকাছি উন্নীত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের দাবিরই প্রতিফলন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সমান গুরুত্ব দেয়ার কারণে, বিগত সরকারের আমলাতান্ত্রিক ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতার যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই হবে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাজেটের আসল পরীক্ষাটি হলো বর্ধিত তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।’










