বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রফতানি আয় বৃদ্ধি, রফতানির সম্প্রসারণ ও বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সংযোজন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুদহার নীতি, আর্থিক ও ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কার্যক্রম জোরদারকরণ, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রাজস্ব নীতির সংস্কার এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়—এসবই আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সর্বোপরি সব স্তরে সুশাসনের নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই আজ জাতীয় অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনকে সামনে রেখে আমাদের অর্থনৈতিক পলিসি সমন্বয় করা জরুরি। বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে আমরা আশা করি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমে গ্রহণযোগ্য, সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রতিফলিত হবে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে হলে ব্যবসায়িক ব্যয় (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমিয়ে আনা, বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব মুদ্রা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি শিপিং ব্যয়সহ পরিবহনসংশ্লিষ্ট সব খরচ হ্রাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ স্থায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কর আদায় ব্যবস্থায় হয়রানি ও জটিলতা হ্রাস করে একটি সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।
জাতীয় বাজেট সম্পর্কিত মৌলিক নীতিগত প্রস্তাবগুলো
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ নজর দেয়া জরুরি—
কর্মসংস্থানের স্বার্থে বিনিয়োগ, দেশীয় শিল্প ও সেবা খাত এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে শুল্ক এবং করনীতির মাধ্যমে যৌক্তিক প্রতিরক্ষণ প্রদান;
ক্ষেত্রবিশেষে কর অব্যাহতি বা বন্ড সুবিধা দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তিতে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা;
ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা;
করনীতি, কর ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির আধুনিকায়ন, অটোমেশন এবং ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণ;
স্বেচ্ছায় কর প্রদানের হার বৃদ্ধি করে রাজস্ব আদায় ও কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ;
আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং যথাযথ করনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস।
সামষ্টিক অর্থনীতিবিষয়ক প্রস্তাব—
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে সুদহার স্থিতিশীল রাখতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির স্বার্থে সুদহার যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনতে হবে।
বৈদেশিক অর্থায়ন এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও অনুৎপাদনশীল প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিং রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বিদেশে দক্ষ জনসম্পদ প্রেরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব। দক্ষ জনবল কর্তৃক প্রেরিত রেমিট্যান্স অধিক মূল্য সংযোজন করতে সক্ষম। সম্ভাবনাময় এবং নতুন জনশক্তি রফতানি বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে।
ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসির অংশ হিসেবে দেশের বৈদেশিক মিশনগুলোকে রফতানি বাজার সম্প্রসারণে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে কমার্শিয়াল কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, সহায়ক নীতিগত সমর্থন, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ এবং করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নগদ সহায়তার বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প সহায়তা হিসেবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পরিবহন খাতে প্রণোদনা বা বিশেষ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত প্রস্তাব
করহার যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস করে আয়কর ও মূসকের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে হবে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যে সক্ষম করদাতাদের করের আওতায় আনতে হবে। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জরুরি সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ অপরিহার্য।
আমদানি পণ্যের যথাযথ শুল্কায়ন, দ্রুত পণ্য খালাস এবং সব ধরনের শুল্ক ও কর পরিশোধ কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর ব্যবস্থা সম্প্রসারণে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।
রাজস্ব আহরণ ও রাজস্ব নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পৃথক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে একটি সমন্বিত ও অটোমেটেড প্লাটফর্মের আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত এ তিনটি শাখার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দেয়। এ কারণে একটি সম্পূর্ণ অটোমেটেড ও ইন্টিগ্রেটেড রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য ও গবেষণা অনুবিভাগকে শক্তিশালী করার জন্য একজন সদস্যকে আলাদা দায়িত্ব প্রদান করা উচিত। সেই সঙ্গে ‘বাজেট সমন্বয়’ নামে একটি স্থায়ী অনুবিভাগ গঠন করা যেতে পারে, যাতে বাজেট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সারা বছরব্যাপী চলমান থাকে।
আমদানীকৃত কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর এবং মূসক আইনের আওতায় আগাম কর প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হচ্ছে। কারণ এগুলো সম্পূর্ণ আয়করও না আবার ভ্যাটও না।
করদাতা সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকায় একটি নতুন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) এবং চট্টগ্রামে আরো একটি এলটিইউ স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সব উপজেলা পর্যায়ে আয়কর অফিস চালু করে সক্ষম করদাতাদের করের আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি বাস্তবায়নের দায়িত্ব জাতীয় স্বার্থে এবং বিশেষ করে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের ওপর অর্পণ করা দরকার।
শুল্ক, মূসক ও আয়কর কর্মকর্তাদের কর ফাঁকি শনাক্তে পুরস্কার প্রদান করা হয়, যা অনেক সময় আইনের অপপ্রয়োগ ঘটায় এবং সৎ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন। তাই এ পুরস্কার প্রথা বাতিল করে একটি বিকল্প ও স্বচ্ছ প্রণোদনা কাঠামো চালু করার সুপারিশ করছি।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ও পরিদর্শন কার্যক্রম যথাযথ বিধিবিধানের আলোকে এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক।










