১৯৭২ সালের শুরুর সময়টা নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চারপাশে পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া ধ্বংসের চিহ্ন। দেশ চালাচ্ছে একেবারে নতুন প্রশাসন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে প্রথমে ভারতে, পরে দেশের মাটিতে ফিরেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি মাতৃভূমিতে ফেরার পর পরই প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি পদ ছেড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তিনি। নয় মাসের যুদ্ধে দেশের অবকাঠামো কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বেশির ভাগ কারখানা। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে গোলায় খাবার নেই। সরকারি তহবিলে নেই টাকা। স্বাধীন দেশে সংকট ছিল কাপড়, ওষুধ, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের। চাপ ছিল এক কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনার। সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার।
এমন পরিস্থিতিতে কার্যত শূন্য হাতে নতুন করে দেশ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বঙ্গবন্ধু। স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়টা বাংলাদেশ ছিল পুরোপুরি বিদেশী সহায়তানির্ভর। আর্থিক, কারিগরি ও পণ্য সহায়তা পেতে বঙ্গবন্ধুকে বিদেশী রাষ্ট্র ও সংস্থার মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ১৯৭২ সালের ১-৫ মার্চের এ সফরকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ও কৃতজ্ঞতার সফর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরকারপ্রধান হিসেবে উপমহাদেশের বাইরে এটাই বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। এর আগে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কলকাতা সফর করেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের বাইরে বঙ্গবন্ধুর প্রথম এ রাষ্ট্রীয় সফর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত সরকার যেভাবে মুক্তিবাহিনী ও প্রবাসী সরকারকে সহায়তা করেছে, তা নজিরবিহীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েতের একের পর এক ভেটো প্রদান আজো বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে আলোচ্য হয়ে আছে। ’৭১ সালে পাকিস্তানের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বিভিন্ন উদ্যোগ আটকে দেয় মস্কো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর যাত্রা ঠেকাতে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের। বলা হয়, পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবিত ফিরে আসার পেছনেও অবদান ছিল দেশটির।
মুক্তিযুদ্ধের পরও সোভিয়েত সহায়তা অব্যাহত ছিল। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় দেশটি। ভারত ব্যতীত ওই সময়ের বৃহত্তম ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন অকৃত্রিম বন্ধুত্বপূর্ণ সহায়তার কথা ভোলেননি বঙ্গবন্ধু। তাই স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিদেশ সফরে তিনি মস্কোকে বেছে নেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একে শুভেচ্ছা সফর অভিহিত করে বিবৃতি দেয়া হয়। বলা হয়, একটি বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করাই এ সফরের উদ্দেশ্য।
তবে তখনকার বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ সফরের সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিল না। কেননা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। পুরো পৃথিবী কার্যত সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ—এ দুই মেরুতে বিভক্ত। ১৯৭১ সালে মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে সরাসরি সহায়তা করেছে ওয়াশিংটন। তখনো সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি মার্কিন প্রশাসন। এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক বলয়ে ঠেলে দেবে বলে মনে করা হয়েছিল।
একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সুনিপুণভাবে এ সংকট উতরে যান। পাঁচদিনের মস্কো সফরের আগেই তিনি ঘোষণা দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা—সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য, বিশ্ব রাজনীতিতে স্বাধীন বাংলাদেশ কোনো একক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না। বরং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সদস্য হতে তখন থেকেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে তিনি মূলত সোভিয়েত-মার্কিন দুই বলয়কে সন্তুষ্ট রাখতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়ে সেই থেকে বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির সূচনা।
বঙ্গবন্ধুর এ সফরের পেছনে প্রধানত দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অসামান্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে মস্কোর সহায়তা পাওয়া। এজন্য বঙ্গবন্ধুর এ সোভিয়েত যাত্রা বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ও কৃতজ্ঞতার সফর হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে।
সফর শুরুর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের ও জনগণের জন্য সাড়ে সাত কোটি মানুষের শুভেচ্ছা নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন ও সাহায্য দানের জন্য আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার ও জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ।
২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ মুজিবুর রহমান মস্কোর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উড়োজাহাজ দেশের বিমান বহরে ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন বঙ্গবন্ধু ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে যেতে একটি বিশেষ উড়োজাহাজ পাঠান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর বড় সন্তান শেখ কামাল মস্কো যান।
ঢাকা ছাড়ার পর বঙ্গবন্ধু প্রথমে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) যান। সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি শেষে জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিস হয়ে পরদিন তিনি মস্কো পৌঁছান। তিবলিস বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বাংলা ভাষার শিক্ষক ড. নাচুল দানিলচুক। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে এক সাক্ষাত্কারে বাংলাভাষী এ গবেষক স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার মুখে বাংলা কথা শুনে শেখ মুজিব কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। পরে খুশি হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তার মতো একজন মহান নেতার সান্নিধ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এটা আমার জীবনের একটা দুর্লভ স্মৃতি। বঙ্গবন্ধুর পুরো সফরে ও সোভিয়েত নেতাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বৈঠকগুলোয় দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেন ড. দানিলচুক।
মস্কো পৌঁছার পর বঙ্গবন্ধুকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনসহ উচ্চপদস্থ সোভিয়েত কর্মকর্তা ও রাজনীতিকরা বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন। তীব্র শীত উপেক্ষা করে এ সময় মস্কোয় অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীসহ দেশটির হাজারো মানুষ সমবেত হন। ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ ও সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে শুধু সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় বরং বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের নেতা হিসেবে সাদরে বরণ করে নেয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ও স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে সোভিয়েত গণমাধ্যম নিয়মিত সংবাদ ও বিশ্লেষণ ছেপেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি সোভিয়েতবাসীর আগে থেকেই আগ্রহ ছিল।
সফরকালে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন ছাড়াও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি লিওনিদ ব্রেজনেভ, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির সঙ্গে বৈঠক করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজ আয়োজন করেন কোসিগিন। এ সময় বঙ্গবন্ধু মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য সোভিয়েত সরকার ও জনগণকে আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানান। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বৈপ্লবিক স্বাধীনতা অর্জন ও ন্যায়ের পথে অবস্থানের জন্য বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
মস্কো সফরে যাওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা চেয়ে একটি তালিকা সোভিয়েত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। সফর শুরুর সপ্তাহখানেক আগে দ্বিপক্ষীয় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে। এ সময় দুই পক্ষ বিস্তারিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ধারণাপত্র তৈরি ও বিনিময় করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনে ঢাকার পক্ষ থেকে মস্কোর কাছে ১৫০ কোটি টাকার পণ্য, প্রকল্প ও কারিগরি খাতে সহায়তা চাওয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আগেই বাংলাদেশ থেকে পাট ও চা আমদানি করছিল। বঙ্গবন্ধুর এ সফরে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি হয়। এসব সহায়তা ও চুক্তি দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে সহায়ক ছিল। বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন ও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ব্রেজনেভকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এ সফর থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব পোক্ত হওয়া। সদ্যস্বাধীন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে যা সুদূরপ্রসারি প্রভাব ফেলে। এর অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের জন্য সংগ্রহ করা শস্য থেকে বাংলাদেশকে দুই লাখ টন শস্য সহায়তা হিসেবে পাঠায়। একই বছর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সোভিয়েতের কাছ থেকে মিগ যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার আনা হয়।
সোভিয়েত সফরের সময় ঐতিহাসিক শহর লেলিনগ্রাদ ভ্রমণ করেন বঙ্গবন্ধু। এ সময় হাজারো মানুষ পথের দুইপাশে হাত নেড়ে বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানায়। লেলিনগ্রাদের স্বাধীনতা স্তম্ভগুলো দেখে তার মনে ভাবনা জাগে, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দেশেও এমন স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা উচিত। এ ভাবনার ফলে পরবর্তী সময় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।
৩ মার্চ ক্রেমলিনে অনুষ্ঠিত দুই সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজন ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ভ্রমণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে সোভিয়েত ইউনিয়ন চট্টগ্রাম ও চালনা (বর্তমান মোংলা) সমুদ্রবন্দর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পুঁতে রাখা মাইন অপসারণে বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রুশ নৌ সেনাদের টহলের অনুমতি চাওয়া হয়।
ওই সময়ের বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সদ্যস্বাধীন ও বিদেশী সহায়তানির্ভর একটি দেশ হিসেবে এ প্রস্তাবে সায় দেয়া বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কেননা তখনো বাংলাদেশের মাটি থেকে মিত্র বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান ছিল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে স্বাধীন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, এমনকি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশ সরকারকে ঠিক ভরসা করতে পারত না। সমাজতান্ত্রিক মৈত্রীর সম্ভাবনা খুঁজত। বঙ্গবন্ধু বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণের দায়িত্ব দেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। পরবর্তী সময় চালনা বন্দর নিরাপদ করার দায়িত্ব পায় জাতিসংঘ।
সফরকালে মস্কো টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বঙ্গবন্ধু বলেন, নবীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সব বন্ধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশের সহায়তা প্রয়োজন। তবে এসব সহায়তা অবশ্যই শর্তমুক্ত হতে হবে।
সামগ্রিক বিচারে বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর বেশ ফলপ্রসূ ছিল। এর মধ্য দিয়ে তখনকার অন্যতম পরাশক্তির সঙ্গে সবচেয়ে নবীন একটি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়, যা পরবর্তী সময় দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ সফরের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ও সোভিয়েত নেতা কোসিগিনের প্রথমবার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল, তা আজো অটুট আছে। এখনো জ্বালানি, প্রতিরক্ষাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার সোভিয়েত উত্তরসূরি রাশিয়া।
দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে আশার কথা শোনা যায়। তিনি বলেন, আমার এ ভ্রমণটা বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও আলোচনা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। দুনিয়ার শান্তি রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একযোগে কাজ করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনিন্দ্য সাইমুম ইমন: সংবাদকর্মী





