১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের কথা। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময় পার করছেন সোভিয়েত প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহর ‘টেনথ অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপের’ কমান্ডার অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকভ। টোনকিন উপসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে চলছে মার্কিন নৌবহর ‘টাস্ক ফোর্স ৭৪’ (সপ্তম নৌবহর)। অন্যদিকে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ‘এইচএমএস ঈগলের’ নেতৃত্বে ভারতের আরব সাগর উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরেকটি ব্রিটিশ নৌবহর। ক্রুগলিয়াকভের ওপরওয়ালাদের আদেশ, দুটি বহরেরই জাহাজগুলোকে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে তারা আর সামনের দিকে এগোনোর সাহস না পায়।

সমস্যা হলো আদেশে যতটা সহজ করে বলা হয়েছে, এর বাস্তবায়ন ততটা সহজ কিছু নয়। সোভিয়েত যুদ্ধজাহাজগুলোর গতি অসাধারণ। কিন্তু জাহাজগুলোর ক্ষেপণাস্ত্রের আওতা খুব একটা বেশি নয়, ৩০০ কিলোমিটারেরও কম। সেক্ষেত্রে মার্কিন ও ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলোকে ঘিরে ফেলতে চাইলে সোভিয়েত জাহাজ ও সাবমেরিনগুলোকেও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায় নিয়ে আসতে হবে।

তার পরও পিছু হঠার উপায় নেই। কারণ বিষয়টির ওপর শুধু সোভিয়েত-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে একটি জাতির ভাগ্যও। মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবহর যদি বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলে নোঙর ফেলতে পারে, তাহলে ভেস্তে যেতে পারে একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নও। সুতরাং ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করতে হবে অত্যন্ত দক্ষতা ও নৈপূণ্যের সঙ্গে।

অ্যাডমিরাল ক্রুগলিয়াকভের নেতৃত্বে ভ্লাদিভস্তক থেকে বিরামহীনভাবে ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে চলল টেনথ অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপের পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত জাহাজ ও সাবমেরিনের বহরটি।

অন্যদিকে মার্কিন নৌবহর টাস্ক ফোর্স ৭৪-এর মিশনটি ছিল বেশ সহজ। সোভিয়েতরা এত দূরে তাদের অভিযান ঠেকাতে চলে আসবে, বিষয়টি ওয়াশিংটন ও পেন্টাগনের কর্তাব্যক্তিরা ভাবতেও পারেননি। তাদের হিসাব মতে, বহরটির প্রতিপক্ষ বলতে শুধু তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ও ভারতীয় নৌবাহিনী। এর মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাতে যুদ্ধ করার মতো জাহাজ বলতে তেমন কিছুই নেই। ভারতীয় নৌবাহিনীও তেমন একটা শক্তিশালী নয়। দেশটির নৌবহরে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার আছে মোটে একটি। সেটির সক্ষমতাও খুব একটা বেশি নয়। মোটে ২০টি হালকা যুদ্ধবিমান বহনে সক্ষম ক্যারিয়ার। সহজ কথায়, টাস্ক ফোর্স ৭৪কে ঠেকানোর সক্ষমতা প্রতিপক্ষের নেই বলেই ধারণা মার্কিন কর্তাদের।

অভিযানটিকে সহজ হিসেবে নিলেও যুদ্ধাভিজানের সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে ১৩ জাহাজের বহর টাস্ক ফোর্স ৭৪। ৯০টি সুসজ্জিত যুদ্ধবিমান নিয়ে এসেছে টাস্ক ফোর্সের ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ। ল্যান্ডিং অপারেশনের জন্য দুটি উভচর অ্যাসল্ট শিপে প্রস্তুত আছেন দুই হাজার মেরিন সৈন্য। রসদ সরবরাহের জন্য আছে একটি নাইট্রো ক্লাস অ্যামুনিশন শিপ ও একটি রিপ্লেনিশমেন্ট অয়লার। পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত একটি সাবমেরিনও আছে। উপরন্তু ভারতের আরব সাগর উপকূলের দিকে ধাবমান ব্রিটিশ নৌবহরের সঙ্গে সমন্বয় করেই এগোচ্ছে টাস্ক ফোর্স ৭৪। অভিযান সহজ হওয়ায় বিষয়টিতে তাড়াহুড়োরও কিছু দেখছেন না নৌবহর দুটির কমান্ডাররা। বরং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বেশ ধীরগতিতেই এগোচ্ছে জাহাজগুলো। 

এত বিপুল পরিমাণ প্রস্তুতি সত্ত্বেও মার্কিন বহরের একটি নৌযানও বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করেনি। দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে যায় ব্রিটিশ নৌবহরও। তাদের অগ্রাভিজান ঠেকিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সোভিয়েত নৌবহরের জাহাজগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবেই পালন করতে সক্ষম হয়। এ সফলতা অর্জিত হয়েছে একটিও মিসাইল বা গুলি খরচ না করেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক হস্তক্ষেপের পথকে রুদ্ধ করে দেয় টেনথ অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপ। নৌবহর পরিচালনায় দক্ষ নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের নজির রেখে এ সফলতার চাবিকাঠি হয়ে ওঠেন অ্যাডমিরাল ক্রুগলিয়াকভ।

পরবর্তী সময়ে অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকভের বর্ণনায় ওই ঘটনার বিবরণ উঠে আসে। এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘সর্বাধিনায়কের আদেশ ছিল, আমাদের সাবমেরিনগুলোকে তখনই ভেসে উঠতে হবে; যখন মার্কিন নৌবহর আসবে। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের দেখানো; ভারত মহাসাগরেও আমাদের পরমাণুচালিত সাবমেরিন রয়েছে। সুতরাং যখন আমাদের সাবমেরিনগুলো ভেসে উঠল, তারা (মার্কিনরা) আমাদের চিনতে পারল। ওই সময় মার্কিন নৌবাহিনীর পথে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার ও জাহাজবিধ্বংসী মিসাইলসংবলিত পরমাণুচালিত সাবমেরিন। আমরা তাদের ঘিরে ফেললাম এবং ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের দিকে মিসাইল তাক করলাম। আমরা তাদের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলাম, যাতে তারা করাচি, চট্টগ্রাম বা ঢাকা কোনো দিকেই যেতে না পারে।

ঠিক একই সময়ে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের অধিনায়ক ব্রিটিশ নৌবহরের অধিনায়কের কাছ থেকে একটি বার্তা পান, যা সোভিয়েত বহরের রেডিওতে ধরা পড়ে। এতে বলা হয়, ‘স্যার! আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। এখানে রুশ আণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন এসে হাজির হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু যুদ্ধজাহাজও রয়েছে।’

ব্রিটিশ নৌবহরের জাহাজগুলো সেখানে আর অপেক্ষা করেনি। দ্রুত মাদাগাস্কার উপকূলের দিকে চলে যায় তারা। অন্যদিকে মার্কিন নৌবহরের জাহাজগুলো ভারত মহাসাগরে অবস্থান করে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের পুরোটাই সোভিয়েত নৌবহরের জাহাজগুলোও ছিল সম্পূর্ণ সতর্কাবস্থায়।

অ্যাডমিরাল ক্রুগলিয়াকভের রণকুশলতা ও দক্ষ নেতৃত্ব সেদিন ব্রিটিশ ও মার্কিন নৌবহরকে যুদ্ধের দৃশ্যপটে হাজির হওয়ার আগেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর এ ঘটনার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

ক্রুগলিয়াকভের ঠেকিয়ে দেয়া মার্কিন বহরের জাহাজগুলো যে সাধারণ কোনো উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে আসেনি, তা সেগুলোর প্রস্তুতির আধিক্যেই পরিষ্কার ছিল। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে তুমুল সমালোচনা হলে মার্কিনীরা দাবি করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্যই এ বহর পাঠানো হয়েছে। গুটিকয়েক নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র রীতিমতো পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে, এ কথা সে সময় কেউই বিশ্বাস করতে চায়নি।

পরবর্তী সময়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়, ভারতকে ভয় দেখিয়ে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই এ নৌবহর পাঠানো হয়েছে। বহরের নাবিক-সৈনিকদের প্রতি ওয়াশিংটনের আদেশ ছিল, যাতে কোনোভাবেই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া হয়।

অন্যদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নথিতে দাবি করা হয়েছে, ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের বোমারু বিমানগুলোর ওপর প্রয়োজন দেখা দিলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমিউনিকেশন লাইনে বোমা বর্ষণের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমোদনও ছিল।

ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিদের হিসাব অনুযায়ী, ১৬ ডিসেম্বর সকালেই মার্কিন নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করার কথা ছিল। সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেই যুদ্ধের মোড় ভিন্নদিকে প্রবাহিত হয়ে পড়তে পারত। ওয়াশিংটন যে সে সময় পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, পরবর্তী সময় প্রকাশিত দেশটির গোপন নথি ও হোয়াইট হাউজের ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবহরের উদ্দেশ্য যাই হয়ে থাকুক, অ্যাডমিরাল ক্রুগলিয়াকভের নেতৃত্বে সোভিয়েত নৌবহর তা বানচাল করে দিতে সক্ষম হয়। পরে তার এ ভূমিকা নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয়েছে খুব কম। হলেও অধিকাংশই ভারতীয় গণমাধ্যমে। তার সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্যও পাওয়া যায় না। পর্দার আড়ালে এক প্রকার বিস্মৃতির ধোঁয়াশাতেই হারিয়ে গিয়েছেন তিনি। এ কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নায়ক অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকভকে বলা চলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বিস্মৃত নায়ক।

সাইফুল ইসলাম: সাংবাদিক