১৯৭১ সালে পৃথিবী দুটি পরাশক্তিতে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিল মার্কিন প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্ব, অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। প্রধানত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো শেষোক্ত দলে ছিল। আবার চীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও দেশটি এবং রাশিয়ার মধ্যে তত্ত্বগত ক্ষেত্রে বিভেদের পাশাপাশি স্বার্থগত একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে চীন-রাশিয়ার সীমান্ত এলাকায় একটা সাংঘর্ষিক অবস্থাও তখন সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিভাজনের বাইরে একটি শক্তিশালী জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনও বজায় ছিল, যার সূচনা করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী শিমাভো বন্দরনায়েকে, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের এবং যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেপ ব্রজ টিটু। এ ধরনের এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যখন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে লক্ষ করেছিলাম প্রেসিডেন্ট নিক্সন নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন, চীনের মাওবাদী নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। এক্ষেত্রে অবশ্য উল্লেখ করা যেতে পারে যে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কনসল জেনারেল আর্চার ব্লাড গণহত্যার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন এবং তিনিসহ তার ২০ জন সহকর্মী ঐতিহাসিক নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। এটি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট নিক্সন অবস্থান পরিবর্তন করেননি। 

এদিকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় এক কোটি শরণার্থী প্রবেশ করেছিল। তাই ভারত সরকার স্বাভাবিকভাবেই বিবেচনা করে যে দুই পরাশক্তি বিভক্ত পৃথিবীতে যদি সোভিয়েত ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব সমর্থন না করে, তাহলে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দৃঢ় অবস্থানে যাওয়া খুব কঠিন হবে। এছাড়া মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের সরকারের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ ছিল। সে সময়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার করাচি হয়ে অপ্রকাশ্যে বেইজিংয়ে যান এবং চীনের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিক্সনের পরবর্তী বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। কাজেই স্বাভাবিকভাবে সবকিছু একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যে যাচ্ছিল। সে কারণে ১৯৭১ সালের মে মাসে বুদাপেস্টে একটি বিশ্ব শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনকে উপলক্ষ করে ভারতের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে এখান থেকে একটি প্রতিনিধি দল যাওয়া উচিত এবং এটি ছিল প্রবাসী সরকারের প্রথম কোনো প্রতিনিধি দল। এ প্রতিনিধি দলটি ছিল তিন সদস্যের। এর নেতৃত্বে ছিলেন ড. আব্দুস সামাদ আজাদ। সদস্য হিসেবে ছিলেন ন্যাপের দেওয়ান মাহবুব আলী এবং আমি। শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নেতারা এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। তাদের আমরা বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা লক্ষ করেছিলাম যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা গণহত্যার বিরোধিতা করেছেন। তারা ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখেছিলেন এর একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির তখনো সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল না। 

১৯৭১ সালের মে মাসে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে প্রথম শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ব শান্তি পরিষদ এটি আয়োজন করেছিল। সাধারণত সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোস্যাল ডেমোক্রেট পার্টিগুলো (যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টিসহ) এর অংশী ছিল। এর বাইরে কিছু লিবারেল পার্টির এ পরিষদের সঙ্গে যুক্ততা ছিল। সর্বোপরি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতারা, বিশেষ করে আফ্রিকা ও ফিলিস্তিনের নেতারা। শান্তি সম্মেলনের সভাগুলো যখন অনুষ্ঠিত হলো যেখানে আমাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আমরা স্বাধীনতার কথা বলেছি বটে, যেহেতু ভারত আমাদের তখনো স্বীকৃতি দেয়নি সেহেতু তা জোরালোভাবে বলেনি। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ভি কে কৃষ্ণ মেনন (ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। তিনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন, ভারতীয় নেতাদের প্রায়ই কাছাকাছি। সেটি মোটামুটি এ রকম যে ভারতে বিপুল শরণার্থী আশ্রয় নেয়ার কারণে ভারতের অর্থনীতি চাপে রয়েছে। বাংলাদেশে গণহত্যা হচ্ছে। গণহত্যার অবসান হওয়া উচিত, সর্বোপরি তারা বারবার বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করেছিলেন। বুদাপেস্ট থেকে পূর্ব জার্মানির বার্লিন শহরে, তারপর পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে, এরপর চেকোস্লোভাকিয়া এবং সর্বশেষ মস্কোতে সফর করেছিলাম। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় আমরা এটি বোঝাতে চেষ্টা করি যে স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। এ বার্তা আমরা মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে দেয়ার চেষ্টা  করেছিলাম, সম্ভবত কিছুটা সফলও হয়েছিলাম। 

রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক বৈঠক কেবল পূর্ব জার্মানিতে হয়েছিল। পূর্ব জার্মানি পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়নি। কাজেই সেখানকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল। অন্য জায়গায় ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল। মস্কোতেও একই। রাষ্ট্রদূত ডি পি ধর শুধু একটা আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের একটা আলাদা বৈঠক হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। কিন্তু  তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ করেনি। আমি পেশাদার কূটনীতিক ছিলাম না। তবে আমাদের সফরের ফলে ডি পি ধরের ভাষায় ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার চুক্তি করা অনেক সহজ হয়েছে। তার ভাষায় আমরা একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পেরেছিলাম। ফলে কাজটি অনেক সহজ হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা সংক্ষেপে তুলে ধরলে দাঁড়ায় যে তারা সরাসরি অস্ত্র দেয়নি, কিন্তু কিছু লজিস্টিকস সাপোর্ট আমাদের দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় সাহায্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির সক্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল এবং এক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত ভূমিকা রেখেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অনেকেরই জানা, ইউএস কংগ্রেসের অনেক সিনেটর বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা সিনেটে পাস করাতে সক্ষম হন যে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার সমস্যার মধ্যে কোনো অস্ত্র পাকিস্তানে পাঠানো যাবে না। ফিলাডেলফিয়ায় সাধারণ মানুষ অবরোধ করেছিল বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে। কিন্তু এর পরও নিক্সন সরকার জর্ডানের মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। কাজেই এর বিপরীতে রাজি থাকলেও সরাসরি অস্ত্র দেয়াটা সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুচিত বিবেচনা করেছিল।

উল্লেখ করা দরকার যে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত ডিপি ধর জুলাই মাসে দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ-বিষয়ক প্রধান দূত নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি মোটামুটি প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মস্কো থাকাকালে ডিপি ধরের সঙ্গে আমাদের আলাদা বৈঠক হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন যে একটি ভারত-মৈত্রী চুক্তির চেষ্টা হচ্ছে। এটি যদি সফল হয়, তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থানটি পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর পেশাদার কূটনীতিক। আগস্ট মাসে ভারত-সোভিয়েত শান্তি  মৈত্রী চুক্তি হয়। এ চুক্তিতে একটি ধারা ছিল, এই দুটি দেশের কোনো একটি অন্য কোনো পক্ষ দ্বারা যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে দুই দেশই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবে।

এ চুক্তি সম্পাদনের পরে আমরা লক্ষ করেছি আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সংখ্যা বেড়েছিল, অস্ত্র সরবরাহ বহুগুণ বেড়েছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক মহলে আরো দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ শুরু করেছিল। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছিলেন। এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন উপমহাদেশের কোনো বিষয়ে কেবল একবারই যুক্ত হয়েছিল এবং তা ছিল ১৯৬৫ সালে তাসখন্দ চুক্তির সময়ে। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন আর এ অঞ্চলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির পর তাদের যুক্ততা বেড়েছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয়তা বেড়েছিল। এর নিদর্শন দুটি ক্ষেত্রে দেখেছিলাম। একটি হলো যে জাতিসংঘে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক বৈঠক হয়েছে ৩ ডিসেম্বরের পর থেকে যখন মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ড দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা শুরু করেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘বিজয় আমাদের কব্জায়’। তখন লক্ষ করা গেছে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছিল, যাতে এ মুক্তিবাহিনী ও যৌথ বাহিনী ঢাকা পর্যন্ত প্রবেশ না করতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পর পর তিনবার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করেছিল। এ পটভূমিতে মিত্রবাহিনী ও যৌথ বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রবেশ করেছিল এবং পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি যে পাকিস্তান একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র ছিল, যেখানে দুটি অংশ হাজার মাইলের ব্যবধান ছিল, ঐতিহ্য-সংস্কৃতিতে বিরাট পার্থক্য ছিল। কাজেই দুটো দেশ একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ ছিল, বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যখন নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকট হয়েছিল। কিন্তু আমার ধারণা যে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারত শক্ত অবস্থান গ্রহণ না করত তাহলে সম্ভবত নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন খুব কঠিন হতো। সেজন্য বিজয় দিবস যখন আসে তখন তত্কালীন ভারতের নেতা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের খুব সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা জরুরি। দ্বিতীয় যে কারণে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা প্রয়োজন সেটি হলো সামরিক সহায়তার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে এসে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হয় এবং তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের তারা এখানে উদ্ধার করতে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজস্ব রণতরী দিয়ে তার পেছনে ধাওয়া করেছিল। তারা এগিয়ে না এলে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশ স্বাধীন করা কঠিন ছিল। মোটা দাগে বলা যায়, মূলত আমাদের বিজয় সম্ভব হয়েছিল, জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো প্রদান এবং ভারতের অনমনীয় অবস্থান ও শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ়তার জন্য। 

যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেও সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন স্থানে মাইন অপসারণে সহযোগিতা করেছিল। তদুপরি অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সাহায্য ও সহযোগিতা নিয়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি পাওয়া। আমরা লক্ষ করেছি অধিকাংশ দেশ (চীন ও সৌদি আরব ছাড়া) আবশ্যিকভাবে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার পেছনে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা ভূমিকা ছিল। আমাদের গণহত্যা ২৫ মার্চ শুরু হয়েছিল, তার চারদিনের মাথায় সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি গণহত্যা বন্ধ করার জন্য ইয়াহিয়া খানকে আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখেছিলেন। তার আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত জামসেদ মার্কারকে ডেকে খুবই দ্রুততার সঙ্গে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। তারা পুরো ব্যাপারটি যে প্রথম থেকেই পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ইত্যাদি না হলে সাহায্য করা সহজ ছিল না, আজকে যেমন অনেক সহজ। তার কারণ হলো যে জাতিসংঘে সব দেশের জন্য একটা নীতি ছিল যে কোনো দেশ কারো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। সেই নীতিটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মানতে হয়েছিল। ভারতকেও মানতে হয়েছিল। যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে আনুষ্ঠানিক একটা অবস্থান গ্রহণ কঠিন ছিল। এখন পৃথিবীটা বদলে গেছে। কাজেই তখন এটি খুব একটা সহজ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পেছনেও সোভিয়েত ইউনিয়নের বড় ভূমিকা ছিল। সর্বোপরি যুদ্ধটা দ্রুত শেষ করা এবং আমাদের বিজয় নিশ্চিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্তরালে থেকে কাজ করেছিল। পরিশেষে উল্লেখ করব ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি না হলে ভারতের পক্ষে এত বড় ঝুঁকি নেয়া সম্ভব হতো না। বাংলাদেশ স্বাধীন হতো বটে, কিন্তু অনেক বেশি রক্তক্ষয় হতো।

ডা. সারওয়ার আলী: ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর