একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা কেমন ছিল, সে আলোচনা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জয় অর্জনের ঘটনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে এসে স্নায়ুযুদ্ধের দুই পরাশক্তি পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরাসরি পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে সমর্থন দিতে শুরু করে। বিশেষ করে একাত্তরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলিষ্ঠ সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে কথা বললে খুব একটা অত্যুক্তি করা হবে না। এক্ষেত্রে যার নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তিনি জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের তত্কালীন স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জ্যাকব মালিক। ইউক্রেনের খার্কভে ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করা সোভিয়েত ইউনিয়নের এ শীর্ষ কূটনীতিক জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর পরই ১৯৪৮ সালে সেখানে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে তিনি চিয়াং কাইশেকের জাতীয়তাবাদী চীনা সরকারের প্রতিনিধির জাতিসংঘের কার্যাবলিতে উপস্থিত থাকার প্রতিবাদ জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বের হয়ে যান এবং প্রায় ছয় মাস পরিষদকে বয়কট করেন। ১৯৫২ সালে তিনি মস্কো ফিরে যান সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত হিসেবে আবার ফিরে আসেন ১৯৬৮ সালে এবং ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জাতিসংঘে মস্কোর প্রতিনিধি হিসেবে অনেকটা একা হাতেই সমস্ত কূটনৈতিক কাজ সামলেছেন তিনি। তাকে এ সময় পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছেন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি বাঙালি কূটনীতিক সমর সেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এক ধরনের ‘পরোক্ষ যুদ্ধ’ (চত্ড়ীু ডধৎ) ছিল। বলা বাহুল্য যে যুক্তরাষ্ট্র অবিভক্ত পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের স্বার্থের রক্ষাকবচ হিসেবে দেখত। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব অটুট রাখতে এবং চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কে সঙ্গে নিয়ে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছিল। অন্যদিকে উঠতি পরাশক্তি চীন এ যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সশস্ত্র বাহিনী না পাঠালেও বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রেরণের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন প্রদান করে। তবে এ তিন পরাশক্তির কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাই এক পর্যায়ে স্থান নেয় বিশ্বরাজনীতির নাট্যমঞ্চ জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। বিশেষ করে ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে পাকিস্তানের পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর একের পর এক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন, সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভেটো’ প্রদান এবং চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্কের কারণে জাতিসংঘ হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেক রণাঙ্গন। জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত জ্যাকব মালিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এ জোরালো অবস্থান না নিলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করার সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল সে সময়।
যুদ্ধের শুরুতে সোভিয়েত সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে উৎসাহিত করার চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে সোভিয়েত দৃষ্টিভঙ্গিও ক্রমশ বদলে যেতে শুরু করে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নতুন মাত্রাও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের ৯ অগাস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ বছর মেয়াদি ‘শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা’ চুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা দেয়া হয় যে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনো তৃতীয় কোনো দেশের দ্বারা আক্রান্ত হলে তা নিজের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করবে এবং পরস্পরের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। এ চুক্তি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত এ চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে কূটনৈতিক উপায়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেষ্ট হয়েছিল। ৩ ডিসেম্বর যখন পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাল্টা যুদ্ধের ঘোষণা দেয়, তখনই এটি নিশ্চিত হয়ে যায় যে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমতাবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আশু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাসের ব্যাপারে মরিয়া হয়ে ওঠে।
৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে নিরাপত্তা পরিষদের নয়টি সদস্য রাষ্ট্রের অনুরোধে ৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি অধিবেশন শুরু হয়। বিবদমান পক্ষ হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভা শুরুর আগেই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কর্তৃক লিখিত একটি চিঠির কপি নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। বিচারপতি চৌধুরী সে চিঠিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে পরিষদের সামনে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ প্রদানের ব্যাপারে অনুরোধ জানান। নিরাপত্তা পরিষদের মিটিংয়ের শুরুতে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত জ্যাকব মালিক ও অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেয়ার অনুমতি প্রদানের প্রস্তাব তোলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিনিধি আগা শাহি বাংলাদেশের পক্ষে বিলি করা চিঠিকে ভারতের কারসাজি হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়া বলেন, ‘তথাকথিত বাংলাদেশ’ বা পূর্ব পাকিস্তানের ‘বিদ্রোহী অংশের’ কোনো প্রতিনিধিকে নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিলে তা হবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ। এর জবাবে জ্যাকব মালিক বাংলাদেশের চলমান যুদ্ধকে একটি জাতির ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ ও ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ আদায়ের আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার জাতিসংঘ সনদেও স্বীকৃত। মূলত বাংলাদেশের প্রশ্নে এ বক্তব্যের মাধ্যমে জ্যাকব মালিক সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই এ সমস্যার মূল সমাধান। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি চৌধুরী তার বক্তব্য প্রদান করতে না পারলেও সেদিন জ্যাকব মালিকের এ দৃঢ় অবস্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে বিশ্বমঞ্চে আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।
এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে আশু ভোট গ্রহণের দাবি জানান। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত জ্যাকব মালিক জানতেন যে নিরাপত্তা পরিষদে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব সহজে নাকচ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ‘ভেটো’ প্রদান করার পাশাপাশি মস্কোর পক্ষে বিকল্প প্রস্তাবও পেশ করলেন, যেখানে তিনি যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ শর্তও উত্থাপন করেন। চীন এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়ায় এবং পরিষদের বাকি সদস্যরা ভোটদানে বিরত থাকলে সোভিয়েত প্রস্তাবটিও বাতিল হয়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে যুদ্ধের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিশ্চিত করা। কারণ প্রথমত একের পর এক ‘ভেটো’ প্রদান করলে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক হতো। যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তার জন্য কড়া সমালোচনা শুনতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের সঙ্গে আপসের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। যুদ্ধবিরতি হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নের সমাধান করতে হতো। সেক্ষেত্রে এ আপসকামী গোষ্ঠীটিই যে রাজনৈতিকভাবে প্রাধান্য পাবে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভালোভাবেই অবগত ছিল। আর সেটি ভারতের জন্যও মূলত নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসত এবং সোভিয়েত স্বার্থও তাতে ব্যাহত হতো। তাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো উপায়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আটকে রাখাই ছিল জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোহ বারবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তুললেও সোভিয়েত ভেটোর কারণে তা নিরাপত্তা পরিষদে পাস হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদে এ ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়নের একমাত্র মিত্র ছিল পোল্যান্ড।
৫ ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদে আরো কিছু প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরোধিতায় সেই সংশোধনীও বাতিল হয়ে যায়। এর মধ্যে ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত দিলে ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। নিরাপত্তা পরিষদ দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর যখন কোনো সিদ্ধান্তে আসতে ব্যর্থ হয়, তখন ৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রস্তাবের অধীনে সেটি স্থানান্তরিত হয় এবং সে অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপিত হলে সেটি ১০৪-১১ ভোটে পাস হয়। যদিও সাধারণ পরিষদের এ প্রস্তাব মানার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যুদ্ধের একটি পক্ষ হিসেবে ভারত আবারো কালক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করে ১২ ডিসেম্বর এক কূটনৈতিক জবাবের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়ার ব্যাপারটি কৌশলে এড়িয়ে যায় এবং আরো জানায় যে এ প্রস্তাবে সমস্যার মূল কারণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
সাধারণ পরিষদের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে কাজ না হওয়ায় ১২ ডিসেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। জ্যাকব মালিক মস্কোর সঙ্গে সলাপরার্মশের জন্য সময় চেয়ে বিতর্ক একদিন পেছাতে সক্ষম হলেন। ১৩ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ পুনরায় একত্রিত হলেও ভোটাভুটিতে কোনো প্রস্তাবই শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। ১৩ থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে ফের যুদ্ধবিরতির একাধিক প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। সোভিয়েত ভেটোর কারণে ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির কোনো প্রস্তাবই পাস হয়নি। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পাঁচদিন পর অবশেষে ২১ ডিসেম্বরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোল্যান্ড এক্ষেত্রে ভোট প্রদানে বিরত থাকে। সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জ্যাকব মালিক সোভিয়েত অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে আবারো বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একই সঙ্গে যুদ্ধে নিহত লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুতে চীনের নিশ্চুপ থাকাকে ভর্ত্সনা করতেও ভোলেননি।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও বিশ্বশান্তির রক্ষক হিসেবে যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে মতামত দেয়ায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রচণ্ড সমালোচনার সম্মুখীন হতে হলেও তার সেই জোরালো অবস্থানের কারণেই মূলত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে পাস করানো সম্ভব হয়নি। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন যে আরো ত্বরান্বিত হয়েছে, সে কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গেলে তাই জ্যাকব মালিকের অবদানকে ভুলে গেলে চলবে না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে তিনি সে সময় হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আরাফাত রহমান: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





