হেনরি কিসিঞ্জার তার হোয়াইট হাউজ ইয়ার্স গ্রন্থে ১৯৭১-এ স্বাক্ষরিত ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির ঘোষণাকে একটি ‘বিস্ফোরক’ ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন। ‘আমরা পত্রিকা পড়ে জানতে পারি, সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকোর ভারত সফরের সময় নয়াদিল্লিতে উভয় দেশের মধ্যে একটি ২০ বছর মেয়াদি শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিটির ধারাগুলোর ভাষা সাদামাটা হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন কঠিন নয়।’ এ কৌশলগত গুরুত্ব, কিসিঞ্জারের ব্যাখ্যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নকে তার অনাগ্রহ সত্ত্বেও ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তান, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করা।
‘আমরা জানতাম, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রধান বাধা ছিল তেমন কোনো যুদ্ধে সোভিয়েত বিরোধিতা ও তাদের সামরিক সাহায্য বন্ধের সম্ভাবনা, যা চীনকে (পাকিস্তানের পক্ষে) হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করবে। এতএব এ চুক্তির ফলে সেই ভয় দূর হলো, কিন্তু পাশাপাশি তেমন যুদ্ধের সম্ভাবনা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিল।’
যে চুক্তির কথা বলা হচ্ছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে ৯ আগস্ট ১৯৭১-এ স্বাক্ষরিত হলেও এর প্রথম খসড়া সোভিয়েতরা তৈরি করেছিল ১৯৬৯ সালে, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভের এশিয়ায় একটি ‘যুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’র প্রকল্পের অংশ হিসেবে। এ প্রকল্প ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে দুটি সামরিক জোট সিয়াটো ও সেন্টো গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে। উভয় জোটই কার্যত এশিয়ার, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের, দেশগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক নির্মাণের অস্ত্র হয়ে ওঠে। ব্রেজনেভ যে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি প্রস্তাব করেন, তাতে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের অন্তর্ভুক্তির কথা ভাবা হয়েছিল। এতে চীন নেই এ যুক্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান ছিল কিছুটা সতর্কতামূলক। তারা প্রস্তাবটির ব্যাপারে মৃদু আগ্রহ প্রকাশ করে, তবে নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে অধিক আগ্রহ দেখায়।
ভারতের জোটনিরপেক্ষ পরিচয় অমলিন রাখতে আগ্রহী মিসেস গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে খোলামেলা গাঁট বাঁধতে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের কেউ কেউ, বিশেষত মস্কোতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ডিপি ধর একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির খসড়া তার দেরাজে প্রস্তুত রেখেছেন, এমন কথাও বলেছেন ধরের একাধিক সহকর্মী। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর তেমন চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকেই বলেছেন, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় রেখে মিসেস গান্ধী তাতে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। অবস্থা বদলে যায় ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর। এ যুদ্ধে কার্যত ভারত একাই বাংলাদেশের পাশে ছিল। এ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান নৈকট্য ভারতের জন্য শিরপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ প্রশ্নে যুদ্ধ অনিবার্য, এ কথা ভারতীয় মহলে বলা হলেও তাদের প্রধান ভীতি ছিল চীনকে নিয়ে। এ ভীতি সত্য হোক অথবা কাল্পনিক, মিসেস গান্ধীর জন্য এ মনোভাব রাজনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি ‘সামরিক’ চুক্তি জরুরি হয়ে ওঠে। ডিপি ধর যুক্তি দেখিয়েছিলেন, এ চুক্তির ফলে পাকিস্তান যেমন বড় রকমের ধাক্কা খাবে, তেমনি দেশের ভেতরে ভারতীয় মনোবল নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এ কথা ঠিক, বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক অধিগ্রহণ ও হামলা শুরুর পর মস্কোই ছিল প্রথম রাজধানী, যেখান থেকে প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানো হয়। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের কাছে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নির লেখা চিঠিতে ‘পূর্ব পাকিস্তানে অবিলম্বে রক্তপাত ও নির্যাতন বন্ধ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানে’র আহ্বান জানানো হয়েছিল। শুধু চিঠি লেখা নয়, বার্তা সংস্থা তাসের মাধ্যমে তা পত্রপত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে মস্কো এ প্রশ্নে তার অবস্থান স্পষ্ট করে তোলে।
এ পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখ্য আগ্রহ ছিল কোনো সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই এ বিবাদের মীমাংসা। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হলেও মস্কো পাকিস্তানের সঙ্গেও নিকট সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সামরিক মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থা পোক্ত করার যে উদ্যোগ নেয় তা মস্কোকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল। বিনা প্রতিবাদে তেলসমৃদ্ধ এ অঞ্চল ছাড়তে সে প্রস্তুত ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে নিজদের জন্য পা ফেলার জায়গা করতে সে তাই পাকিস্তানকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে আরব সাগরের অন্য পাড়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক নির্মাণ তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মস্কো ১৯৬৯ সালে ভারত-পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নিয়ে এক আঞ্চলিক সহযোগিতা মোর্চার প্রস্তাব দিয়েছিল। পাকিস্তানকে হাতে রাখতে সীমিত আকারে সামরিক সাহায্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও ছিল এ চেষ্টার অংশ।
অবস্থা বদলে গেল চীন ও মার্কিন কূটনৈতিক উদ্যোগের পর। ১৯৭১-এর মাঝামাঝি পাকিস্তানের সহায়তায় গোপনে পিকিং ঘুরে এলেন হেনরি কিসিঞ্জার। ঘটনাটি শুধু ভারতকে নয়, মস্কোকেও বিস্মিত করেছিল। এ নৈকট্যের লক্ষ্য ছিল একদিকে চীনকে বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, অন্যদিকে মস্কোকে কোণঠাসা করা। এ পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি শুধু ভারতের জন্য নয়, মস্কোর জন্যও কূটনৈতিকভাবে সঠিক জবাব মনে হলো। জুনের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরন সিংয়ের মস্কো সফরের এক পর্যায়ে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকো নিজেই প্রশ্ন করেন, মৈত্রী চুক্তির ব্যাপারে আপনাদের মনোভাব কী? একদিন পর দিল্লি থেকে উত্তর হাতে পেয়ে সরন সিং জানালেন, তারা প্রস্তুত চুক্তি স্বাক্ষরে। তিনি গ্রোমিকোকে জানালেন, এ রকম একটি চুক্তি (ভারতের বিরুদ্ধে) কোনো সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ডেটারেন্ট বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।
৯ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হলো চুক্তিটি। দীর্ঘ নথি, যার অধিকাংশই প্রথামাফিক ধারা, নতুন তেমন কোনো কথা তাতে ছিল না। ব্যতিক্রম হলো নবম ধারা যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হলো, এ দুটি দেশের কেউ যদি ভবিষ্যতে কোনো সামরিক সংঘর্ষে জড়িত হয়, তাহলে তাদের কেউ তৃতীয় পক্ষকে কোনো রকম মদদ জোগাবে না। যেকোনো নিরাপত্তাজনিত হুমকির মুখে দেশ দুটি সে হুমকি দূর করতে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অবিলম্বে আলাপ-আলোচনা শুরু করবে, এ কথাও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত হলো।
শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি বলা হলেও এটি আসলে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, ভারতীয় পক্ষের এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। অভ্যন্তরীণভাবে সব মহলেই চুক্তিটি আদৃত হলো, পত্রপত্রিকার বিবরণ থেকে মনে হয় পাকিস্তান, চীন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধ ভারত এক রক্ষাকবচ পেয়ে গেছে। ভারতীয়দের এমন আশা জোগাতে মস্কোর কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু এটি যে চীন বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রাকপ্রস্তুতি, এ কথা সে কখনই ভাবেনি। বাংলাদেশ যুদ্ধের এ পর্যায়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক নয়, রাজনৈতিক সমাধানের ওপরই জোর দিয়ে যাচ্ছিল। বস্তুত কোনো কোনো গবেষকের ধারণা, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধ এড়াতেই মস্কো এ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মার্কিন লেখক রিচার্ড সিসন ও লিও রোজ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান অর্জিত না হলে তারা শক্তি প্রয়োগের কথা ভাবছে, ভারতের কাছ থেকে এ কথা জানার পর চুক্তিটি স্বাক্ষরে মস্কো তত্পর হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিটিকে তার বিরুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি সামরিক আঁতাত হিসেবে এর নিন্দা করে। প্রাক্তন সামরিক শাসক আয়ুব খান অবশ্য ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে। তার মতে, ভারতকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতেই সোভিয়েতরা এ চুক্তি করেছে। চীন ও আমেরিকা নিজেদের বিবাদ মিটিয়ে ফেলে নিকট সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এরপর হয়তো ভারতও তাদের সঙ্গে যোগ দেবে, যার ফলে মস্কো একদম একঘরে হয়ে পড়বে। তা সামলাতেই এ চুক্তি।
এ চুক্তির মাধ্যমে মস্কো যে ভারতকে চীনের সম্ভাব্য হামলার মুখে পাশে দাঁড়াবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার প্রমাণ মেলে হেনরি কিসিঞ্জারের বয়ানিতে প্রস্তুত একটি ব্রিফিং নোট থেকে। জুনে সরন সিং মস্কো সফরে এলে গ্রোমিকোর সঙ্গে মৈত্রী চুক্তির বিষয়টি আলোচিত হয়, এ কথা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। কিসিঞ্জার লিখছেন, এ আলোচনার সময় মস্কো শুধু চীনের বিরুদ্ধে হামলায় সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয় তা-ই নয়, তারা পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থনেরও প্রতিশ্রুতি দেয়।
বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত সোভিয়েত সাহায্যের সম্ভাবনা প্রবল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক ভারত ছাড়া এ যুদ্ধে তখন পর্যন্ত ছোট-বড় অন্য কোনো দেশকেই বাংলাদেশ কার্যত পাশে পায়নি। এ চুক্তির ফলে মস্কোকে পাশে পাওয়ার সম্ভবনা সৃষ্টি হওয়ায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার স্বাভাবিকভাবেই উত্ফুল্ল
এরপর » পৃষ্ঠা ২
হয়েছিল। একদিকে চীন-পাকিস্তান, অন্যদিকে চীন-আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক আঁতাত বাংলাদেশকে উদ্বিগ্ন করেছিল। এ অবস্থায় মস্কো-দিল্লির সামরিক জোট তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তিতে ফেলে। এতদিন মূলত উদ্বাস্তু শিবিরে আসা বাংলাদেশীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণেই সোভিয়েত সাহায্য সীমিত ছিল। এ সামরিক চুক্তির ফলে বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সামরিক সাহায্যের পথ উন্মুক্ত হবে, বাংলাদেশ সরকার এমন ধারণা করেছিল। বাস্তবে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়, এ চুক্তির পর পূর্ব জার্মানিসহ অন্যান্য সোভিয়েত-বলয়ভুক্ত দেশগুলো অনেক বেশি খোলামেলাভাবে বাংলাদেশকে সামরিক ও অন্যান্য ত্রাণে অংশ নেয়া শুরু করে।
এ চুক্তির আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসাবে স্বীকৃতি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর গোড়া থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানের সামরিক হামলার তীব্র সমালোচনা করলেও তাকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সে স্বীকৃতির অর্থ দাঁড়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অনিবার্য বলে মেনে নেয়া ও তার প্রতি সমর্থনের নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি গ্রহণ করা। অবস্থার পরবর্তন ঘটল দিল্লি-মস্কো মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের স্বীকৃতির পূর্ব শর্ত হিসেবে মস্কো বাংলাদেশে যুদ্ধরত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোহের সমন্বয়ে একটি ঐক্য জোট গঠনের ওপর জোর দেয়। এ ঐক্য জোট গঠনে উৎসাহ জোগান মিসেস গান্ধীর অন্যতম উপদেষ্টা ডিপি ধর। বর্ষীয়ান ভারতীয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন।
মইদুল ইসলাম তার ‘মূলধারা একাত্তর’ গ্রন্থে স্মরণ করেছেন, ভারত-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পর অর্থাৎ ১০ আগস্ট তিনি আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি যুক্তি দেখান, “মস্কোপন্থী নামে পরিচিত দুটি দলসহ স্বাধীনতার সমর্থক সব ক’টি দলের সমবায়ে একটি ফ্রন্ট গঠন করা সম্ভব হলে তত্ত্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট’ গঠনের পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়ার কাছে তা আদৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” এ কথা ডিপি ধরই তাকে জানিয়েছিলেন। ডিপি ধরের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি অন্যত্র জানিয়েছেন, মুক্তি ফ্রন্ট গঠন ভিন্ন সোভিয়েত সাহায্য পাওয়া কঠিন হবে।
এ কথা কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ভেতর কোনো ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে অনাগ্রহ ছিল। শেষ পর্যন্ত শুধু নয়াদিল্লি ও মস্কোর চাপে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি ‘জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি’ গঠিত হয়। ক্ষণস্থায়ী এ উপদেষ্টা কমিটির ভন্তর্ভুক্ত হন আওয়ামী লীগের দুজন প্রতিনিধি—তাজউদ্দীন আহমদ ও খন্দকার মোশতাক আহমদ, মস্কোপন্থী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান মণি সিংহ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মুজাফ্ফর আহমদ, ন্যাপ (ভাসানী) গ্রুপের প্রধান মাওলানা ভাসানী ও বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর।
এ ফ্রন্ট গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সোভিয়েত পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত হয়নি। সে অবস্থা বদলে গেল উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর। এ পরিষদকে সোভিয়েত সরকারি তথ্যমাধ্যমে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট হিসেবেই পরিচয় করানো হলো শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন শহরে, বিশেষত ফ্যাক্টরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি সূচক সমাবেশ আয়োজনের কথাও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলো। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মস্কোতে ইন্দিরা গান্ধীর সফরকালে মুখোমুখি আলোচনায় সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন, বাংলাদেশের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উপাদান রয়েছে।’ সে সফরের ওপর এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে ইজভেস্তিয়া পত্রিকায় প্রভাবশালী সোভিয়েত ভাষ্যকার ভালেন্তিন কুদ্রিয়ােসফ ব্রেজনেভের সে কথার প্রতিধ্বনি করে মন্তব্য করেন, (পূর্ব পাকিস্তানে) যা ঘটছে, তা আসলে একজাতীয় মুক্তি আন্দোলন।
এর পরবর্তী ঘটনা সুবিদিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের শুরু ৩ ডিসেম্বর। মস্কো ভারতের পাশে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি সত্ত্বেও চীন এ যুদ্ধে সরাসরি নাক গলায়নি। নভেম্বরে চীন সফরে এসে জুলফিকার আলী ভুট্টো চীনের কাছে সে আবদার করেছিলেন, কিন্তু চীন সরাসরি সামরিক সাহায্যের ব্যাপারে তার অনাগ্রহের কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। এ অনাগ্রহের একটা কারণ সে সময় চীন-সোভিয়েত সীমান্ত বরাবর ব্যাপক সোভিয়েত সৈন্য সমাবেশ। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির অংশ হিসেবেই এ সৈন্য সমাবেশ ঘটেছিল। মার্কিন গবেষক শেলডন সাইমন জানিয়েছেন, এ সময় কম করে হলেও ৪৪ ডিভিশন সোভিয়েত সেনা দুই দেশের সীমান্ত বরাবর মোতায়েন ছিল।
নিজের সীমান্ত রক্ষার বদলে ভারতের বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খোলার কোনো আগ্রহ চীনের ছিল না। মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৬৯ সালে উসুরি নদী বরাবর সাত মাস স্থায়ী সীমান্ত সংঘর্ষে সোভিয়েত সৈন্যদের হাতে বেদম প্রহারের স্মৃতি তাদের মনে তখনো জাগরূক।
হাসান ফেরদৌস: গবেষক ও প্রাবন্ধিক





