১৩ জুলাই, ১৯৭৩। চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণের সময় বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সোভিয়েত মেরিন ইউরি রেদকিন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের বন্দর থেকে মাইন অপসরণের জন্য সোভিয়েত নেভির স্পেশাল এক্সপিডিশন-১২ নামে ৮০০ সদস্যের উদ্ধারকারী যে দলটি এসেছিল রেদকিন তাদের একজন। বাংলাদেশ ও রাশিয়া সরকারের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রামেই সমাহিত করা হয় তাকে। রেদকিনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে তার সমাধিকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ, যা রেদকিনের সমাধি নামেই পরিচিত। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিতে গেলেই এর দেখা মেলে। 

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। বাংলার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলী লড়াইয়ের বিপরীতে অবসম্ভাবী হয়ে উঠেছে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়। অনিবার্য পরাজয় এড়াতে বিষয়টিকে তখন আন্তর্জাতিক সংঘর্ষে রূপান্তর করার উদ্দেশ্যে ভারতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। ডিসেম্বর ৩ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে ভারত। এর ধারাবাহিকতায় ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও পাকিস্তানি নৌবাহিনীর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় নৌযুদ্ধ শুরু হয়। তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা না থাকায় এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ভারতীয় নৌবাহিনীর সম্ভাব্য প্রবেশ রুখতে পাকিস্তানি সেনারা বন্দর দুটির প্রবেশপথে অসংখ্য মাইন ছড়িয়ে দেয়। 

লাখ প্রাণ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে পুনরায় সচল করার কাজটা ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু ছড়িয়ে থাকা অগণিত মাইন আর পানির নিচে থাকা নৌজাহাজের অবশিষ্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত আবর্জনা সরানোর কাজগুলো ছিল ভীষণ রকম ঝুঁকিপূর্ণ। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৌবাহিনীর পক্ষে এককভাবে বন্দর দুটিকে নৌযান চলাচলের উপযোগী করে তোলার কাজটি ছিল প্রায় অসম্ভব। এদিকে বন্দরগুলোকে ব্যবহারোপযোগী করতে কমপক্ষে দু-তিন বছর সময় লাগার শঙ্কার কথাও জানাচ্ছেন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা। এমন একটা অবস্থায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণে ভারতীয় নৌবাহিনী কাজ শুরু করলেও তাদের এ-বিষয়ক অভিজ্ঞতা কম থাকার পাশাপাশি মাইন অপসারণকারী জাহাজের সংখ্যাও ছিল অপ্রতুল। সব মিলিয়ে মাইনক্ষেত্রের সম্পূর্ণ অংশ পরিষ্কার কিংবা নিমজ্জিত নৌযানগুলোর ধ্বংসাবশেষ এককভাবে উদ্ধার বা অপসারণ করার মতো সক্ষমতা তখন ভারতীয় নৌবাহিনীর ছিল না। তাছাড়া মাইন অপসারণের সময় চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন বিস্ফোরিত হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় হতাহত হন বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাবিক। 

এদিকে ১৯৭২ সালের মার্চ নাগাদ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার অংশ হিসেবে ভারতীয় নৌবাহিনীকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে সরিয়ে নেয়া হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহারোপযোগী করে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রার্থনা করে বাংলাদেশ। সাড়া দেয় জাতিসংঘ ও তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। জাতিসংঘ চাইছিল কোনো একটি অভিজ্ঞ কোম্পানিকে মাইন অপসারণের কাজ দিতে। তাদের কিছু সময়ের প্রয়োজন ছিল। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

১৯৭২ সালের মার্চের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গেলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে ব্যবহারোপযোগী করার কাজে বাংলাদেশকে সহায়তার প্রস্তাব দিলে বাংলাদেশ প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। মার্চেই সোভিয়েত প্রতিনিধি দল ঢাকায় এলে বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মাইন অপসারণবিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর আর খুব বেশি কালক্ষেপণের প্রয়োজন পড়েনি। এপ্রিলেই সোভিয়েত নেভির স্পেশাল এক্সপিডিশন-১২ দলটি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছে। শুরু হয় দুই বছরব্যাপী মাইন অপসারণ কার্যক্রমের। বাংলাদেশে এসে পৌঁছে ২২টি সোভিয়েত জাহাজ, সঙ্গে ৮০০ নাবিক। এর মধ্যে ছিল সহযোগী নৌযান, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও উদ্ধারকারী জাহাজ। শুরু হয় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন অপসারণে সোভিয়েত নাবিকদের পরিশ্রমী ও আত্মত্যাগী মিশন।

চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এলাকা ও তার আশপাশে থাকা ৪০টি নৌযানের অধিকাংশই হামলায় নিমজ্জিত হয়েছিল, আর বাকিগুলো পাকিস্তানিরা নিজেরাই ডুবিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য বন্দরগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী করা। তাই সোভিয়েত নাবিকরা যখন কাজ শুরু করে, তখন বন্দরগুলোর চারপাশ ছিল জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ও মাইন দিয়ে ঘেরা। এমনকি বন্দরে যাওয়ার রাস্তায়ও মাইন পুঁতে রাখা হয়েছিল। নোঙর করার ১৮টি স্থানের মধ্যে ১২টি যুদ্ধের সময়ই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে মাইন অপসারণ ও ডুবন্ত জাহাজ উদ্ধার করার কাজগুলো স্বাভাবিকভাবেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিশ্রমসাধ্য। এর সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর লবণাক্ত ও ঘোলাটে পানি, তীব্র স্রোত সোভিয়েত নাবিকদের উদ্ধার কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে কঠিন করে তুলেছিল। লবণাক্ত পানির কারণে ডুবুরিরা তেমন কিছুই দেখতে পেতেন না। সোভিয়েত ডুবুরিরা দিনে চারবারের বেশি নদীতে নামতে পারতেন না। বেশি সময় পানির নিচে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিল না। বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার পাশাপাশি ঝড়, গরম আর বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছিল তাদের। ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের জন্য সোভিয়েত নাবিকদের কাছে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী পদ্ধতি হিসেবে জনপ্রিয় ছিল পানির নিচে বিস্ফোরণ ঘটানো। কিন্তু চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দুটির নিকটবর্তী নদীগুলো সরু হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। পাশাপাশি পানির নিচে বিস্ফোরণ ঘটালে বন্দরে থাকা জাহাজগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। নদীগুলোর জীব বৈচিত্র্য ও জলজ সম্পদে প্রভাব পড়ার ঝুঁকিও ছিল। সবকিছু বিবেচনা করে সোভিয়েত নাবিকরা নিমজ্জিত নৌযানগুলো উদ্ধারে ‘ডুবন্ত পন্টুন’ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। পদ্ধতিটি অপেক্ষাকৃত পুরনো। একই সঙ্গে কঠিন, সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমসাধ্য।

তবে পেশাদার সোভিয়েত নাবিকরা কঠিন এ কাজকে গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছিলেন। মাইন সরানোর কাজ শুরু করার মাত্র তিন মাসের মধ্যে সোভিয়েত নাবিকরা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচলের উপযোগী একটি প্রণালি পরিষ্কার করতে সক্ষম হন। অবশ্য বন্দর দুটিতে তখনো অনেক নিমজ্জিত নৌযান ও মাইন অবশিষ্ট ছিল। তা সত্ত্বেও বন্দর দুটি জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে। কিছু কার্যক্রমও শুরু হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেছিলেন, বাংলাদেশে এ বন্দর দুটি ব্যবহারোপযোগী হয়ে উঠতে দু-তিন বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু তাদের সেসব নেতিবাচক আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বসবাসের প্রতিকূল পরিবেশ আর বৈরী আবহাওয়ার বিরুদ্ধে সোভিয়েত নৌবাহিনীর পরিশ্রম ও কর্মতত্পরতা জয়ী হয়।

১৯৭২ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সমুদ্রবন্দর দুটি বড় জাহাজ চলাচলের জন্যও উপযোগী হয়ে ওঠে। শুধু মাইন অপসারণ নয়, ডুবিয়ে দেয়া বিধ্বস্ত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের পাশাপাশি পাকিস্তানিদের ডুবিয়ে দেয়া সম্পদও উদ্ধার করেন সোভিয়েত নাবিকরা। লড়াইরত অবস্থায় সরে যেতে হবে বলে পাকিস্তানি বাহিনী স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাসহ জাহাজে থাকা সম্পদ পানিতে ফেলে দিয়েছিল। 

অবশেষে বাংলাদেশের এ বাণিজ্য বন্দর দুটি সম্পূর্ণভাবে মাইনমুক্ত হয় ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে। এদিকে বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী সোভিয়েত নৌবহর ১৯৭৪ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে আরো কিছু নৌযান উদ্ধার ও বন্দর পুনর্নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করতেও সম্মত হয়। এ পর্যায়ে সক্ষমতার পরিচয় দেয় তারা। ১৯৭৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সোভিয়েত জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে। নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই বাংলাদেশে সোভিয়েত নৌবহরের উপস্থিতির সমাপ্তি ঘটে। ১৯৭৪ সালের জুন নাগাদ সোভিয়েত নৌবহরের অবশিষ্ট কর্মীরা সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমানে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর ভ্লাদিভস্তকের উদ্দেশে যাত্রা করেন। দুই বছরব্যাপী এ অভিযানে সোভিয়েত নৌবহর চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে ২৬টি নিমজ্জিত জাহাজ উদ্ধার করেছিল। পাশাপাশি সমুদ্রবক্ষ থেকে ১ হাজার ৯০০ টন ধাতব বর্জ্য অপসারণ করে। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকী উদযাপন উৎসবে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে মাইন অপসারণ এবং তা ব্যবহারোপযোগী করে তোলার সঙ্গে জড়িত সোভিয়েত নেভির স্পেশাল এক্সপিডিশন-১২ দলকে সম্মাননা জানানোর আমন্ত্রণ জানায় বাংলাদেশ সরকার। ২০১৬ সালে সরকারের আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অংশ নেয়া সোভিয়েত উদ্ধারকারী দলের চার সদস্য সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরে আসেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। উপস্থিত সোভিয়েত নেভির সাবেক সদস্যরা সেদিন স্মৃতিচারণ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানির নিচে মাইন অপসারণের ওই দুঃসাহসী ঘটনার। পাশাপাশি নেভাল একাডেমিতে গিয়ে রেদকিনের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনও করেন তারা। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সে সময় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে মাইন অপসারণের ওই অভিযানে জড়িত ছিলেন ভিক্তর কঝুরিন (ক্যাপ্টেন সেকেন্ড র্যাংক)। তিনি সোভিয়েত নেভির স্পেশাল এক্সপিডিশন-১২ দলে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন মাইন অপসারণকারী দলের জ্যেষ্ঠ সহকারী ভ্লাদিমির করামিশেভ (ক্যাপ্টেন থার্ড র্যাংক), আলেকজান্ডার চুকানিন (ক্যাপ্টেন ফার্স্ট র্যাংক), প্রয়াত ভ্লাদিমির মলচানভের (মাইন অপসারণ অভিযানের প্রধান প্রকৌশলী) সহধর্মিণী আনা মলচানভ।

৮০০ সদস্যের উদ্ধারকারী দলটির অনেকেই আর বেঁচে নেই। এ দলের সদস্য ভ্লাদিমির মলচানভ ও ভিক্তর কঝুরিন চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ কার্যক্রমের ওপর ‘The Fireway is Clean Again’ নামে একটি বই লিখেছেন। স্বাধীনতার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসে ভিক্টর কঝুরিন সেদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তার লেখা গ্রন্থটি তুলে দিয়েছিলেন। লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে মাইন অপসারণের সময় বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো নাবিক ইউরি রেডকিনের কথা। উল্লেখ্য, ১৮ ডিসেম্বর ইউরি রেদকিনের জন্মদিন। প্রতি বছর এই দিনে চট্টগ্রামে অবস্থিত রুশ কনস্যুলেট জেনারেল, বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির সদস্যরা তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক