সত্তর দশকের শেষদিকের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের ভোকাল ও বেজিস্ট ছিলেন শাফিন আহমেদ। মাইলসের ভাঙনের পর নতুন লাইনআপ নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘ভয়েস অব মাইলস’। তার লেখা, সুর করা ও গাওয়া অনেক গানই শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। বর্তমানে তিনি নিজের গানের পাশাপাশি অন্য শিল্পীদের গানও নিজস্ব মিউজিক লেবেল ডবল বেজ প্রডাকশনস থেকে বের করছেন। ভয়েস অব মাইলসের লাইনআপ, বর্তমান ব্যান্ড জগৎ, শ্রোতাদের পরিবর্তন ও ঈদের কাজ নিয়ে কথা বললেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈয়দ মেহরাজ কবির

আপনার নতুন লাইনআপের নাম ভয়েস অব মাইলস। নতুন লাইনআপ নিয়ে কতটা আশাবাদী?

চমৎকার কিছু মিউজিশিয়ানের সঙ্গে কাজ করছি। ক্রমাগত সবাই ভালো করছে। নতুন লাইনআপে গিটার, ড্রামস, কি-বোর্ড যারা বাজাচ্ছে তারা সবাই খুব দক্ষ মিউজিশিয়ান। আমার ফেসবুক পেজ এবং আমার ইউটিউব চ্যানেলে অনেকগুলো ভিডিও শেয়ার করেছি। সেগুলো দেখলেও বোঝা যাবে যে লাইভ কনসার্টগুলো খুবই ভালো হচ্ছে। রোজার আগের মাসে অনেকগুলো বড় বড় শো করলাম। হাজার হাজার দর্শক ছিল। আমার ভালো লেগেছে, দর্শকদেরও ভালো লেগেছে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আগামীর দিনগুলো নিশ্চয়ই ভালো যাবে বলে আশা করি।

কনসার্ট নিয়ে কেমন ব্যস্ততা যাচ্ছে? অস্ট্রেলিয়ায় কনসার্টের কথা শুনলাম? 

ঈদের পর পরই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি শো করতে। ৭ মে সাউথ এশিয়ান ফেস্টিভ্যালে পারফর্ম করতে যাচ্ছি। মেলবোর্নে। এছাড়া আমেরিকার বিভিন্ন শহরে কথা চলছে। সেখানেও হয়তো যাব। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসতে আসতে ঈদ শেষ হয়ে যাবে। তখন আবারো কনসার্টের চাপ থাকবে।

দেশে ও দেশের বাইরের কনসার্টের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য ধরা দেয় আপনার কাছে?

নিশ্চয়ই। দেশের বাইরে যেটা হয়, যারা দেশে ছিল একসময় তারা দেশকে খুব মিস করে। তাদের ছাত্রাবস্থায় আমার গাওয়া, সুর করা অনেক গান নিয়ে রোমাঞ্চকর স্মৃতি রয়েছে। এই স্মৃতিগুলো ফিরে ফিরে আসে তাদের মাঝে। তারা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। এই টানটা অন্য রকম। বাংলাদেশ থেকে যখন শিল্পীরা যায় বাইরে, তখন আমাদের সঙ্গে তাদের খুব ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তারা আমার সঙ্গে তাদের সেই স্মৃতিগুলো শেয়ার করে। হয়তো কলেজে পড়াকালীন আমার কনসার্টে গিয়েছিল। এই স্মৃতিগুলো শেয়ার করতে করতে একটা সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সঙ্গে খুব ভালো যোগাযোগ থাকে।

আর বাংলাদেশে কনসার্ট করতে গিয়েও তরুণ শ্রোতাদের মাঝে একই ধরনের উদ্দীপনা দেখি। তবে আজকালকার কনসার্টে একটি নতুন জিনিস দেখি। সবাই মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত থাকে। আগে দর্শকরা নিজের চোখে কনসার্ট দেখত। এখন ক্যামেরার চোখে কনসার্ট দেখে। স্টেজে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে দেখি শত শত মানুষ ভিডিও করে যাচ্ছে। এসবই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবদান। তারা ভিডিও শেয়ার করে বন্ধুদের দেখাবে। এটাই এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এটা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমার মনে হয় সরাসরি তাকিয়ে যদি শো দেখা যায়, তাহলে উত্তেজনাটা আরো বেশি। কিন্তু ভিডিও করতেই যদি ব্যস্ত থাকে, তাহলে হয়তো ভালো কিছু মিস করে যাবেন।

বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের কয়েক প্রজন্ম আপনি দেখেছেন। ব্যান্ড সংগীতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?

সন্তুষ্ট সবসময়ই ছিলাম, এখনো আছি। আমি খেয়াল করে দেখি, প্রচণ্ড আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের শ্রোতারা নতুন নতুন গান পাচ্ছে। প্রতিটা ব্যান্ডেরই নিজস্ব একটা সাউন্ড থাকে, নিজস্ব একটা স্টাইল থাকে। সেগুলোর যথেষ্ট বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। অনেকেই শ্রোতাপ্রিয়তা পাচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক। দর্শকদের মধ্যে একই রকমের আগ্রহ রয়েছে।

ক্যাসেট থেকে সিডি। সিডি থেকে ইউটিউবমুখী হয়েছে শ্রোতারা। এতে কি শ্রোতাদের মনোযোগ কমে গেছে বলে আপনি মনে করেন?

পুরোটুকুই তো দেখলাম। ক্যাসেট যুগে অনেক কিছু করলাম। ক্যাসেটের পর সিডি এল। এখন পুরোপুরি ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম। এখানে শ্রোতাদের গান শোনার মধ্যে একটা বিশাল বড় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ গান সংগ্রহ করা বন্ধ করে দিয়েছে। লং প্লের সময় মানুষ রেকর্ড কিনে গানের কালেকশন করত। পরবর্তী সময়ে ক্যাসেটের যুগ অসাধারণ একটা সময় ছিল। মানুষ মানুষকে ঈদে উপহার দিত ক্যাসেট অ্যালবাম। ক্যাসেট বা সিডি সংগ্রহের সে অভ্যাসটা এখন সম্পূর্ণ উধাও। আবার ডিজিটাল প্লাটফর্ম থেকে ডাউনলোড করে সেভও করে রাখছে না। ডাউনলোডও প্রায় থেমে গেছে বললে চলে। এখন শুধু রইল স্ট্রিমিং। যতগুলো ডিজিটাল প্লাটফর্ম আছে, সব জায়গায় শ্রোতারা শুনছে বা ভিডিওর ক্ষেত্রে দেখছে। এখানে যে জিনিসটা মিসিং, তা হলো এখানে মালিকানাটা নেই। আমি গান শুনি, কিন্তু আমার কাছে ক্যাসেট বা সিডির মতো সেই মালিকানাটা নেই। এটা হলো সব থেকে বড় পরিবর্তন। ইউটিউবের কথাই যদি ধরি, এতে শ্রোতার কোনো টাকা দিতে হচ্ছে না। গান সংগ্রহেরও প্রয়োজন হচ্ছে না। লাইব্রেরিটা হয়ে গেছে ইন্টারনেটভিত্তিক।

শিল্পীদের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল শুরুর সময়টা? এই পরিবর্তন থেকে উত্তরণের উপায় কী?

এ পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লেগেছিল আমাদের দেশের শিল্পীদের। আমার পরিষ্কার মনে আছে যখন অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে গেল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, তখন কিছুদিন একটা থমথমে ভাব ছিল। কাজ থামিয়ে শিল্পীরা বোঝার চেষ্টা করছিল কী হচ্ছে। কিসের মাধ্যমে গান বানাব, সেটা কী করে ভক্তদের কাছে পৌঁছবে এটা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছিল। শিল্পীদের আগেই ব্যবসায়িক মহলে মিউজিক লেবেলগুলো এটা বুঝেছে। সুতরাং আমরা যখন বুঝলাম বিষয়টা, গান আবার প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিলাম, তার অনেক আগেই মিউজিক লেবেলগুলো বিভিন্ন প্লাটফর্মে তাদের অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলেছে। তখন দেখা গেল, শিল্পীরা নিজেদের পুরনো গান নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করতে পারছে না। কারণ কপিরাইট ক্লেইম এসে যাচ্ছে। ওই মিউজিক লেবেলগুলো শিল্পীদের না জানিয়েই আরো আগেই সেই গানগুলো বের করে ফেলেছে নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে। তারা নিজেরা ব্যবসা করতে শুরু করেছে, কিন্তু শিল্পীদের বাদ দিয়ে। এসব ব্যাপারে শিল্পীরা অনেক ধাক্কা খেয়েছে। এখন অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে শিল্পীরা। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে যা যা করতে হবে, সেটা এখন মোটামুটি সবাই করতে শিখে গেছে।

ঈদের প্রসঙ্গে আসি। সামনে ঈদ আসছে। ঈদে ব্যস্ত থাকবেন কী নিয়ে? আপনার ভক্তরা নতুন গান কবে পাচ্ছে?

আমার মিউজিক লেবেল হচ্ছে ডবল বেজ প্রডাকশনস। এখান থেকে আমরা নিজের গানসহ অন্যদের গানও বের করে থাকি। আমি পহেলা বৈশাখে গান বের করলাম ‘নাচো বাংলাদেশ’। এটা মেলা উপলক্ষে একটা গান। গত ২১ এপ্রিল ডবল বেজ প্রডাকশনস থেকে বের হলো নতুন একজন শিল্পী বেনজির জিলানির গান। খুবই মেধাবী মেয়ে। এ রকম কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে চুক্তি আছে। তাদের গান আমার মিউজিক লেবেল থেকে বের হয়ে আসছে, আগামীতেও হবে। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি গান ‘রাতের আকাশ’, ‘তোমার পরশ’ প্রকাশ হলো। এভাবেই কনসার্টের পাশাপাশি নতুন গানের কাজও চলছে। শিগগিরই আমার ফিচারিং পড়শীর কণ্ঠে আর একটা গান বের হবে। খুব সম্ভবত এই ঈদেই। গানটার নাম ‘এই স্বপ্ন’। গানটার কথা ও সুর আমার করা। 

ঈদে কেনাকাটা কি নিজেই করে থাকেন?

পরিবারের জন্য কেনাকাটা করি। নিজের জন্য কেনার কিছু নেই।

ঈদের দিন সাধারণত কী করা হয়?

আম্মা যতদিন জীবিত ছিলেন, তখন ঈদের দিন নামাজ পড়ার পরে প্রথমে মায়ের সঙ্গে দেখা করতাম। সকালে নাশতাটা ওখানে খেয়ে দিনটা শুরু করতাম। তারপরে আত্মীয়দের বাসায় যেতাম। ২০১৪ সালে আম্মা মারা যাওয়ার পরে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে আমার ঈদ উদযাপন। পরিবারের মূল ব্যক্তিই তো এখন আর নেই। এখন খুব একটা আনন্দ স্ফূর্তি করা হয় না। প্রথম দিনটা সাধারণত পরিবারের সঙ্গেই থাকি। দ্বিতীয় দিনটা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো হয়। এবারো ব্যতিক্রম কিছু হবে না। এছাড়া কিছু অনুষ্ঠান রয়েছে। গ্রামীণফোন আয়োজিত একটি গেম শো আছে। আর এবার ঈদের পর পরই তো দেশের বাইরে যাচ্ছি। আমি মূলত সেটার প্রস্তুতি নিয়েই ব্যস্ত থাকব।

ঈদের দিন কারো কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে?

আমার মায়ের কথাই সব থেকে বেশি মনে পড়ে। সেটাই বড় ব্যাপার।

শৈশবের ঈদ আর এখনকার ঈদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী বলে আপনার মনে হয়?

শৈশবের ঈদ কোনো দায়িত্ববিহীন ঈদ। খালি আনন্দ করার জন্যই। এখন আনন্দের থেকে দায়িত্বটাই বেশি। অনেক পরিকল্পনা করতে হয়। এখন ভূমিকাটা বদলে গেছে। এখন অনেকেই তাকিয়ে থাকে আমি কী আয়োজন করব সেদিকে। শৈশবে তাকিয়ে থাকতাম বড়রা কী আয়োজন করছে।

ঈদের স্মরণীয় কোনো মুহূর্ত আছে?

স্মৃতিতে আছে প্রায় প্রতি ঈদেই আমরা নানা বাড়ি ফরিদপুর যেতাম। ফরিদপুরের স্মৃতিটা খুব স্পষ্ট। প্রায় ৪০-৫০ জনের মতো সব আত্মীয়স্বজন একসঙ্গে মিলে যেতাম। তিন-চারটা প্রজন্ম একসঙ্গে। সেখানে বড় জায়গা আছে। খেলাধুলা হতো। মাছ ধরতাম, পুকুরে সাঁতার কাটতাম। অনেক স্মৃতি আছে। এগুলো এখনো মনে পড়ে।