রুনা লায়লা, শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত-পাকিস্তানসহ পুরো উপমহাদেশে যার নামের সঙ্গে কোনো বিশেষণ লাগে না। বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ ১৮টি ভাষায় তার গাওয়া গানের সংখ্যা ১০ হাজারের অধিক। কিংবদন্তি এ শিল্পী সংগীত, ঈদ স্মৃতি ও নানা বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
একটি রিয়েলিটি শোয় আপনি,
আবিদা পারভীন, আশা ভোঁসলে ও আতিফ
আসলাম একত্রে ‘দমাদম মাস্ত
কালান্দার’ গানটা গেয়েছিলেন। এখনো দেখি
গানটি সামাজিক মাধ্যমে ভেসে
বেড়াচ্ছে। মুগ্ধতার কথা জানিয়ে শেয়ার করছে
এ প্রজন্মের শ্রোতারা। এতে
বোঝা যায়
আপনি বর্তমান প্রজন্মের কাছেও
কতটা জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। এই যে
প্রজন্ম থেকে
প্রজন্ম শ্রোতাদের ভালোবাসায় সিক্ত
একটা জীবন
পেলেন, কেমন
লাগে?
এটা অবশ্যই
আনন্দ লাগার
মতো বিষয়।
এখনো মানুষ
আমার গান
শুনছে, দেখছে,
পছন্দ করছে।
এটা একদিনে
হয়নি। অনেক
বছরের শ্রম
ও সাধনা
এর পেছনে
আছে। আল্লাহর
রহমত আর
আমার শ্রোতাদের
দোয়া-আশীর্বাদে
এখনো গান
করছি।
দমাদম মাস্ত
কালান্দার গাওয়ার সে মুহূর্তটা আপনার বা
আপনাদের মনোজগতে কী চলছিল?
কী ভাবছিলেন? কেমন ছিল
সে পরিবেশ?
ওটা একটা
এপিক মোমেন্ট।
আমাদের কোনো
পরিকল্পনা ছিল
না। স্ক্রিপ্ট
ছিল না।
রিহার্সেল করাও
ছিল না।
হঠাৎ পরিস্থিতিটা
সৃষ্টি হলো।
একজন প্রতিযোগী
গানটা করল।
আমি বললাম,
এ গানের
আরেকটা ভার্সন
আছে। সে
ভার্সনের আবেদন
আরো বেশি।
তখন অনুষ্ঠানের
উপস্থাপক আমাকে
গানটা ধরতে
বললেন। আমি
শুরু করলাম।
তারপর আবিদা
পারভীন যোগ
দিলেন। আশাদিও
যোগ দিলেন।
আতিফ আসলাম
এক পর্যায়ে
উঠে এসে
ধরল। চারজনের
পরিবেশনা মিলিয়ে
অদ্ভুত সুন্দর
একটা মুহূর্ত
তৈরি হলো।
পরিবেশটা যে
এত সুন্দর
হয়ে উঠবে
আমরা কেউ
ভাবিনি।
আমার মনে
হয়, সংগীতের যে নিজস্ব ভাষা আছে,
সেই ভাষাভাষীর মানুষ কতটা
আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন
তা প্রকাশ পায় ওই
পরিবেশনার মধ্য
দিয়ে।
আসলেই ওই
মুহূর্তে এত
সুন্দরভাবে হয়ে
যাবে আমরা
কেউ ভাবিনি।
সবাই এত
সুন্দরভাবে ইনভলভ
হয়ে গেলাম,
দারুণ একটা
পরিবেশ সৃষ্টি
হলো। আমরা
গানটা যখন
শেষ করি,
অনেকক্ষণ কোনো
আওয়াজ ছিল
না। সবাই
নিশ্চুপ। নিস্তব্ধ
এক জগৎ
যেন। এরপর
সবাই দাঁড়িয়ে
তালি দেয়া
শুরু করল।
কখনো ভেবেছেন সমগ্র উপমহাদেশের মানুষ আপনাকে এতটা ভালোবাসবে, শ্রদ্ধা করবে,
শুনবে?
আমি তো
১২ বছর
বয়সে গান
গাওয়া শুরু
করেছি। তখন
অতটা ভাবিনি।
এটা ধীরে
ধীরে হয়েছে।
১৯৭৪ সালের
জানুয়ারিতে আমি
বাংলাদেশে আসি।
৭৪ সালের
নভেম্বরে ইন্ডিয়ান
কালচারাল সেন্টার
ফর রিলেশন্সের
(আইসিসিআর) আমন্ত্রণে
ভারতে যাই।
সেখানে তিনটি
অনুষ্ঠান করেছিলাম।
দিল্লি, মুম্বাইতে
অনেক শিল্পী,
সংগীত পরিচালকদের
সঙ্গে দেখা
হলো। সবাই
একটাই কথা
বললেন, আমরা
আপনার গান
আগে শুনেছি।
যখন আপনি
পাকিস্তানে সিনেমায়,
রেডিওতে গান
করেছেন আমরা
সেসব গান
শুনেছি। আপনার
গলা আমাদের
পরিচিত। ধীরে
ধীরে ভারতে
গাইতে শুরু
করলাম। এভাবেই
পরিচিতি বাড়ল।
গান ছড়িয়ে
গেল। আমার
সবকিছু খুব
সুন্দরভাবে এগিয়েছে।
ভারত বলুন,
পাকিস্তান বলুন
কিংবা বাংলাদেশ,
কানাডা, আমেরিকা,
লন্ডন যেখানেই
গিয়েছি শ্রোতাদের
অঢেল ভালোবাসা
পেয়েছি। যে
ধরনের সম্মান
ও ভালোবাসা
পেয়েছি, তার
জন্য আমি
আল্লাহর শোকর
আদায় করি।
এটাই আমার
জীবনের সেরা
পাওয়া।
আপনাকে নিয়ে
বায়োপিক নির্মাণ কিংবা বায়োগ্রাফি লেখার কথা
কেউ বলেছে?
অনেকজনই বলেছেন।
কথা খুব
বেশি এগোয়নি।
এটা নিয়ে
সিরিয়াসলি এখনো
চিন্তা করিনি।
তবে লতা
মঙ্গেশকরের ভাতিজা
বৈজনাথ মঙ্গেশকর
বলেছিলেন, আপনার
বায়োগ্রাফিটা আমি
লিখে দেব।
আমি বলেছিলাম,
ঠিক আছে।
কিন্তু সময়
হয়ে ওঠেনি।
আপনার সমগ্র
ক্যারিয়ারে টার্নিং পয়েন্ট মনে
করেন কোন
ঘটনাকে?
প্রথম গান
গাওয়াটাই ছিল
আমার টার্নিং
পয়েন্ট। পাকিস্তানি
সিনেমায় গাওয়া
প্রথম গানের
কথা ছিল
এমন, ‘মারনা
ভি নেহি
আসান, জিনা
ভি কায়ামত
হ্যায়’।
গানটা পর্দায়
দেখানো হয়েছিল
একটা বাচ্চা
ছেলের লিপে।
এরপর একের
পর এক
গানের প্রস্তাব
আসে। ১২
বছর বয়সে
আমার গান
নায়িকাদের লিপে
বাজানো হয়েছে।
কখনো কি
মনে হয়
বাংলাদেশে না
থেকে অন্য
কোনো দেশে
থাকলে আরো
কদর পেতেন,
আরো সম্মান পেতেন?
না। আমার
মনে হয়
আমি এখান
থেকেই যথেষ্ট
পেয়েছি। সবচেয়ে
বড় কথা
শ্রোতাদের থেকে
যে ভালোবাসা
ও সম্মান
পেয়েছি সেটাই
আমার বড়
পাওয়া। এর
থেকে বেশি
কিছু চাওয়ার
নেই আমার।
বাংলা গান
কি কোনো
সংকটের মধ্য
দিয়ে যাচ্ছে?
উপমহাদেশজুড়েই গান
ও সিনেমার
ধরন পুরো
বদলে গিয়েছে।
আগের মতো
কিছুই নেই।
এখন ভালো
কাজ হচ্ছে
না, তা
বলব না।
তবে সংখ্যায়
খুবই কম।
যার কারণে
পুরনো কাজগুলোই
মানুষ খুঁজে
খুঁজে দেখে,
পুরনো গানগুলোই
শোনে। একসময়
অনেক বড়
বড় প্রযোজক,
নির্মাতা ছিলেন।
তারা সুন্দর
সুন্দর সিনেমা
বানিয়েছেন। সেসব
সিনেমায় সুন্দর
সুন্দর গান
থাকত। এখন
এসব খুব
একটা হচ্ছে
না।
তখন হতো,
এখন হয়
না। কেন
বলে মনে
হয়?
তখন সময়
নিয়ে কাজ
করা হতো।
আমরা একটা
গানের জন্য
দুদিন রিহার্সেল
করতাম। তারপর
মিউজিকের সঙ্গে
রিহার্সেল করে
লাইভে রেকর্ড
হতো। অনেক
সময় দেখা
গিয়েছে বিকালে
রেকর্ড শুরু
হয়ে পরের
দিন সকালে
গিয়ে শেষ
হচ্ছে। লাইভ
রেকর্ডিং হতো।
কেউ একটু
ভুল করলে
আবার প্রথম
থেকে শুরু
হতো। ফলে
পুরো গানটায়
আবেগের একটা
ফ্লো থাকত।
এখন এক
লাইন দুই
লাইন করে
রেকর্ড হয়।
ওইটাই কাট
পেস্ট করে
লাগিয়ে দেয়।
এখন গাওয়ার
প্রতি ফিলিংস,
ইমোশন ও
ইনভলভমেন্টটা কমে
গিয়েছে। তার
পরও কিছু
তরুণ ভালো
কাজ করছে।
এ সংকট
থেকে উত্তরণের উপায় কী?
প্রডিউসার, ডিরেক্টররা
যদি ভালো
গান করার
সুযোগ করে
দেয়, সেভাবে
সময় দেয়,
ভালো পারিশ্রমিক
দেয়, তাহলে
নিশ্চয় হবে।
আমাদের দেশে
প্রচুর মেধাবী
শিল্পী আছে।
কিন্তু তারা
নিজেকে মেলে
ধরার সুযোগটা
পাচ্ছে না।
তাদের সুযোগ
করে দিতে
হবে।
অতিসম্প্রতি উপমহাদেশের আরেক সংগীত
কিংবদন্তি লতা
মঙ্গেশকরের প্রয়াণ ঘটেছে। তার
সঙ্গে আপনার
দারুণ সম্পর্ক ছিল। লতাজিকে শেষ দেখার
স্মৃতিটা যদি
বলতেন।
করোনাভাইরাস আসার আগে দেখা হয়েছিল। লিজেন্ডস ফর এভার নামে একটা অ্যালবামের কাজ করলাম। যেখানে আমি পাঁচটা গানের সুর করেছিলাম। সে অ্যালবামে রাহাত ফতেহ আলী খান, হরিহরণ, আদনান সামী ও আশাজি বাংলা গান গেয়েছিলেন। তখন দেখা হয়েছিল। এছাড়া রোজ আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হতো। প্রায় প্রতিদিন আমি ছবিসহ এটা ওটা পাঠাতাম। তিনি ছবি পাঠাতেন। আমার গান পাঠাতেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা শুনতাম। তাকে জানতে-শুনতে ভালো লাগত। এত বড় একজন শিল্পীর অভিজ্ঞতাগুলো জানতে ইচ্ছে করত। সে সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। এজন্য দেখা হয়নি। তবে কথা হতো প্রতিনিয়ত। গত বছর নভেম্বরে লন্ডন গেলাম। লন্ডন যাওয়ার আগে শেষবারের মতো কথা হলো। প্রতি বছর আমার জন্মদিনে তিনি আমাকে শাড়ি উপহার দিতেন। তিনি বললেন, সামনের ১৭ তারিখ তো আপনার জন্মদিন। এবারের উপহারটা কি পাঠিয়ে দেব? বললাম, আমি তো থাকছি না। লন্ডন যাচ্ছি। তিনি বললেন, ঠিক আছে আপনি ঘুরে আসেন। তারপর পাঠাব। তা আর হলো না। আমি লন্ডনে থাকতেই খবর পেলাম, তিনি আমাদের মাঝে নেই। সর্বশেষ তিনি আমাকে দুটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। আমি খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ভয়েসটা যখনই শুনি আমার ভেতর কেমন যেন হয়। মনে হয়, এমন একজন শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার মতো শিল্পী তো আর হবে না। আমার প্রতি তার কী যে ভালোবাসা, কী স্নেহ। যে ভালোবাসা তিনি আমাকে দিয়েছেন তা বলার মতো না। আমি এখনো চিন্তা করলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। যে মানুষটা আমার স্বপ্নের মানুষ ছিলেন, সে আমার এত কাছের মানুষ হয়ে গেল। শেষবার বললেন, আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি মনে হয় আপনজনের সঙ্গে, আমার নিজের মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। আপনি আমার বন্ধুর মতো, বোনের মতো। আমরা কথা শুরু করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। তাকে মনে হতো খুব সিরিয়াস। কিন্তু খুব মজার মানুষ ছিলেন। অনেক মজার গল্প শোনাতেন। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সংগীত জগত্টা খালি হয়ে গেল। বিরাট একটা ক্ষতি হয়ে গেল।
দুই বছর
পর একটা
ভয়মুক্ত ঈদ
পাওয়া গেল।
কীভাবে উদযাপন করবেন?
ঈদ খুব
সাধারণভাবেই উদযাপন
করি। আমরা
কোথাও যাই
না। আত্মীয়স্বজন,
কাছের মানুষ
আসেন। দুই
ঈদে তো
কেউ আসেনি।
আমরাও একটা
দূরত্ব রেখে
চলেছি। এবারো
দেখা যাবে
আগের ঈদের
মতোই বাচ্চারা
আসবে। আলমগীর
সাহেবের ভাই,
ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা
আসবে। আমরাই
ঈদটা কাটিয়ে
দেব। বড়
করে ঈদ
উদযাপন করা
হয় না।
ঈদের দিন
কারো কথা
কিংবা কোনো
ঘটনার কথা
মনে পড়ে?
যাদের হারিয়েছি—আমার
বাবা-মা,
বড় বোন
তাদের কথা
মনে পড়ে।
আমরা কত
ঈদ একসঙ্গে
কাটিয়েছি। কত
আনন্দ, কত
ফুর্তির সঙ্গে
সেসব কথা
মনে পড়ে।
ঈদের কেনাকাটা করা হয়?
কয়েক বছর
ধরে কোনো
কেনাকাটাই করি
না।
আপনার জন্য
কেউ কেনাকাটা করেন?
আগে অনেক
শপিং করতাম।
এখন একদমই
করি না।
ছোট থাকতে
মা-ই
সব কেনাকাটা
করে দিতেন।
এখন যেটা
পাই আলমগীর
সাহেবের কাছ
থেকে। তিনিই
আমার জন্য
কেনেন।
ঈদে কোন
জিনিসটা উপহার
পেতে ভালো
লাগে বা
ছোটবেলায় ভালো
লাগত?
ছোটবেলায় তো সবকিছুই ভালো লাগত। নতুন জামা, নতুন জুতা, চুলের ক্লিপ। এসব ঈদের আগেই পেয়ে যেতাম। রোজ খুলে দেখতাম। কবে ঈদ আসবে, কবে পরব এ উত্তেজনা কাজ করত। খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করতাম যেন ভাঁজ না ভাঙে। যেন পুরনো হয়ে না যায়। এখন বাচ্চাদের নিয়েই আনন্দ করি। সেটাই ভালো লাগে।





