বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের অনবদ্য অবদান নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির চেতনা বিকাশের এক গৌরবোজ্জ্বল
অধ্যায়।
তত্কালীন পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের অভ্যন্তরে তার বলিষ্ঠ ভূমিকার মধ্য দিয়েই মাতৃভাষা আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে।
মাতৃভাষার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মাওলানা তর্কবাগীশের সেদিনকার অবদান চিরস্মরণীয়।
উপমহাদেশের ভাষা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ১৯৪৭-এর
পাকিস্তান সৃষ্টিরও অনেক আগে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার সেই অগণতান্ত্রিক প্রস্তাবের পূর্ব সূত্র ছিল সরাসরি উপমহাদেশ বিভক্তিপূর্ব আলীগড় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
হিন্দি ভাষার আগ্রাসন প্রতিরোধের বিকল্প হিসেবে ঠিক তখন থেকেই একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য কাজ করছিল।
মুসলিম লীগ গঠনের সঙ্গে এবং পূর্বাঞ্চলে এর ব্যাপক
প্রসারের ফলে উর্দুর প্রতি এক ধরনের
সহনশীলতা বেড়েছিল।
মোটকথা পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত
উর্দু ভাষাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের কোনো ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়নি।
কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর দেশটির
পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্যের ব্যাপক রদবদল শুরু হয়।
মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি
পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ব্যবস্থাপক পরিষদের মাওলানা তর্কবাগীশের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভূমিকার মধ্যে ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে।
তার সেদিনকার অপরিমেয় বলিষ্ঠতার মধ্যে কেঁপে ওঠে ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশন কক্ষ।
তার সোচ্চার কণ্ঠ প্রতিবাদের মুখে এক পর্যায়ে
অধিবেশন স্থগিত হয় না। তবে
পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে তার প্রস্তাব গৃহীত না হলেও
তিনি দমে যাননি।
প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে একাকীই পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে তিনি আন্দোলনরত ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান।
সেই সঙ্গে আন্দোলনের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন জানান।
ভাষা আন্দোলনে তার এই সক্রিয়
অংশগ্রহণ ছাত্র আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রচ্ছায়া লাভ করে।
২২ ফেব্রুয়ারি
মাওলানা তর্কবাগীশ ব্যবস্থাপক পরিষদের নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সেই সঙ্গে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে পরিষদে গঠন করেন বিরোধী দল।
শাসক গোষ্ঠীর পতন ঠেকাতে ২৩ ফেব্রুয়ারি
মাওলানা তর্কবাগীশকে গ্রেফতার করা হয়।
পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৪ সালের ২ আগস্ট
তিনি প্রথম বাংলায় বক্তৃতা করেন।
তার অনমনীয় দৃঢ়তার ফলে ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি
পার্লামেন্টে অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি লাভ করে।
একই সময়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেন।
১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করারও তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি।
তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, রাজধানী যেখানে
থাকে সেখানকার মানুষ অনিবার্যভাবেই অধিক সুবিধাভোগী হবে।
তাই অসীম সাহসিকতার সাথে করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের অকাট্য যুক্তি উত্থাপন করেন।
মাওলানা
তর্কবাগীশের জীবন ও
ঐতিহাসিক
ঘটনাবলি
মাওলানা ছৈয়দ আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর,
১৯০৭ বাংলা বর্ষের ১১ অগ্রহায়ণ
সিরাজগঞ্জের তারুটিয়া (রশিদাবাদ) গ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতা ছিলেন স্বনামধন্য পীর হজরত মাওলানা ছৈয়দ আবু ইসহাক (রহ.)।
মায়ের নাম আজিমুন্নেসা।
মাওলানা তর্কবাগীশের পূর্বপুরুষ ছিলেন বড়পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর
বংশধর হজরত শাহ দরবেশ মাহমুদ বাগদাদী (রহ.), যিনি
বাংলায় এসেছিলেন সেই বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজির আমলে পবিত্র ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর বাগদাদ থেকে।
মাওলানা তর্কবাগীশ ১২ বছর
বয়য়ে পিতৃহারা হন।
অভিভাবকহীন হয়েও তিনি লেখাপড়ায় কখনো অমনোযোগী হননি।
বরং লেখাপড়ার সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
১৯১৪ সালে মাত্র ১৪ বছর
বয়সে তিনি গরিব কৃষক ও দুধবিক্রেতাদের
সংগঠিত করে স্থানীয় জমিদারের অন্যায়-অত্যাচারের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তার সংগ্রামী জীবন শুরু করেন।
মুসলিম পুনর্জাগরণের নকীব, অনল প্রবাহের
কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সহযোগী হিসেবে তিনি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান খাদেমুল ইসলাম সংগঠনে যোগ দেন।
অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে তর্কবাগীশ দীর্ঘদিন কারাদণ্ড ভোগের পর ১৯২৩
সালে মুক্তিলাভ করেন।
তারপর তিনি ধর্মীয় শিক্ষালাভের জন্য বিদেশ গমন করেন।
পরে এশিয়ার বৃহত্তম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায়ে দেওবন্দে ভর্তি হন।
দেওবন্দ মাদ্রাসার অর্ধেক ছাত্রই ছিল বাঙালি।
কিন্তু তাদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মানসিকতা ছাত্রদের প্রতি ছিল বিরূপ।
এর প্রতিকারে
তিনি ‘আজাদ
সমিতি’ নামে
একটি সমিতি গঠন করেন।
এই সমিতির
মাধ্যমে বাঙালি ছাত্রদের অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং দেওবন্দে সাড়া জাগায়।
মাওলানা তর্কবাগীশ দেওবন্দে শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য মিসরের জামে উল আজহার
মাদ্রাসার উদ্দেশে দেওবন্দ ত্যাগ করেন।
তিনি হেঁটে অনেক দুঃখ-কষ্ট
সহ্য করে ইচ্ছাশক্তির জোরে দিল্লি, আগ্রা, কানিয়ার,
বরোদা, ভোপাল তথা
মধ্য ভারতের সব শহর-বন্দর এবং দক্ষিণ ভারতসহ উত্তর ভারতের সব অঞ্চল
ভ্রমণ করেন।
অতঃপর তিনি লাহোরের ইশাতুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হন।
এখানে বিশেষভাবে তর্কশাস্ত্র শিক্ষা দেয়া হতো।
তিনি তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এখান থেকেই ‘তর্কবাগীশ’ উপাধি লাভ করেন।
তিনি দেশে ফিরে অজ্ঞানতার অন্ধকার ও আর্থিক
দুরবস্থায় নিপতিত জাতিকে শিক্ষা, সামাজিক ও
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ‘আঞ্জুমানে
তারিক্কিয়ে ইসলাম’ নামের
একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং এর মাধ্যমে
গ্রামে গ্রামে প্রাইমারি স্কুল স্থাপন, কো-অপারেটিভ
ব্যাংক স্থাপন, সুদ না
দেয়া, জমিদারকে বর্ধিত
খাজনাদি, নজরানা না
দেয়া, জোতদারের বীজ
ও ফসল
বহন করতে বাধ্য করা, অল্প পুঁজিতে
দোকান ও ব্যবসা
করা, কামার, সুতারের
কাজে উৎসাহিত করা এবং ঝগড়া-বিবাদ
বিচারের জন্য জমিদার কাছারিতে না গিয়ে
নিজেরাই নিষ্পত্তি করার কাজে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
এ আন্দোলন
প্রকট আকার ধারণ করল।
জমিদার-জোতদার
মহাজন একযোগে এ আন্দোলনকে
নস্যাৎ করতে এবং মাওলানা সাহেবকে বিপদগ্রস্ত করার জন্য লাঠিয়াল বাহিনীসহ কিছুসংখ্যক প্রজাখাতক ও বর্গাদারকে
লেলিয়ে দেয়।
কিন্তু বহু বাধা-বিপদ
সত্ত্বেও ঘাতক বর্গাদার ও বঞ্চিত
চাষীদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল এবং জনসাধারণের মধ্যে জাগরণের এক প্রবল
জোয়ারের চাপে পরবর্তী সময়ে মাওলানা সাহেবের ‘আঞ্জুমানে
তারাক্কিয়ে ইসলাম’-এর
অধিকাংশ দাবি ও প্রস্তাব
সরকার কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত
হয়।
সবিশেষ উল্লেখযোগ্য যে আজও
মাওলানা তর্কবাগীশের প্রবর্তিত বর্গা প্রথা চালু আছে, গ্রামে গ্রামে
প্রতিষ্ঠিত মাওলানা সাহেবের প্রাইমারি স্কুল যেমন শিক্ষার আলোকবর্তিকারূপে জাতিকে পুনরুত্থান পথ দেখিয়েছে। আজও
তেমনি কোনোটা প্রাথমিক, কোনোটা হাইস্কুলরূপে
পরিচালিত হয়ে আলো বিকিরণ করে চলছে।
মহাজনদের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার বিকল্প হিসেবে মাওলানা সাহেবের কো-অপারেটিভ
ব্যাংক প্রতিষ্ঠান শিকড় যে সুদূরপ্রসারী
দূরদর্শিতায় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত এবং অপ্রতিহত, তার স্বাক্ষর
গ্রামবাংলায় আজ অনস্বীকার্য।
মাওলানা তর্কবাগীশ পাবনা জেলার চলনবিলের জমিদার মৌলভি দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরীর কন্যাকে বিয়ে করেন।
১৯৩৯ সালে মাওলানা তর্কবাগীশ মুসলিম লীগের অন্যতম সংগঠক হয়ে ভারত বিভাগকাল পর্যন্ত পাকিস্তান আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন পান এবং তার বিরুদ্ধের আটজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।
১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি
যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারি পার্টির সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় শেরেবাংলার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে নতুন নেতা নির্বাচন করাই ছিল প্রধান বিষয়।
সে এক
অগ্নিপরীক্ষা, পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা হিসেবে সভাপতিত্ব করবেন শেরেবাংলা।
তিনি সভাপতিত্ব না করলে
পরবর্তী ব্যক্তি হচ্ছেন আতাউর রহমান খান।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের জহির উদ্দিন পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক আসন থেকে দাঁড়িয়ে সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাব সমর্থন করলেন।
অতঃপর মাওলানা তর্কবাগীশ সভা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে সভা শুরু করেন।
১৯৫৫ সালে ২১ থেকে
২৩ অক্টোবর
তিন দিনব্যাপী ঢাকার সদরঘাটে রূপমহল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন হয়।
এ অধিবেশনে
একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বিষয়টি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িকীকরণ সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব ‘আওয়ামী
মুসলিম লীগ’-এর
মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ রাখার সিদ্ধান্ত।
‘মুসলিম’ শব্দটি পরিহার করে একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের জাতি-ধর্ম
নির্বিশেষে সবার জন্য অবারিত দ্বার রাখার এক সুদূরপ্রসারী
গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৫৫ সালের ১০ মে
পাকিস্তান ফেডারেশন কোর্ট কনস্টিটিউশন কনভেশন হয়।
কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি অর্থাৎ গণপরিষদ গঠনের নির্দেশ দিলে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ১৯৫৫ সালের ২৮ মে
৮০ সদস্যবিশিষ্ট
গণপরিষদ গঠনের আদেশ জারি করেন।
কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম
পাকিস্তান থেকে সমানসংখ্যক সদস্যই নির্বাচিত করার বিধান রাখা হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের ৪০ জনের
মধ্যে মাত্র ১২ জন
আওয়ামী লীগ থেকে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মাওলানা তর্কবাগীশ এই ১২
জনের একজন ছিলেন।
পাকিস্তান গণপরিষদে সুদক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দল হিসেবে
আওয়ামী লীগের মাত্র ১২ সদস্য
ক্ষমতাসীন দলকে সর্বদাই বিব্রতকর অবস্থায় রাখত।
এর মধ্যে
সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন মাওলানা তর্কবাগীশ, আবুল মনসুর
আহমদ, আতাউর রহমান
খান, শেখ মুজিবুর
রহমান, জহির উদ্দিন,
দেলদার আহমদ প্রমুখ।
মাওলানা তর্কবাগীশ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রধান শহর ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
এক সংকটময়
মুহূর্তে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী
লীগের মওলানা ভাসানী ও অন্যদের
দল ত্যাগের
ফলে সৃষ্ট শূন্যতা ও সংকট
মোচনে এবং সর্ববৃহৎ দলটি সঠিক নেতৃত্ব প্রদানের জন্য যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মাওলানা তর্কবাগীশই ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা।
১৯৫৭ সালের ৩০ আগস্ট
পাকিস্তান গণপরিষদে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে গমনকারী যাত্রীদের বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্তৃক মালপত্র ও দেহ
তল্লাশির ঘৃণ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাওলানা তর্কবাগীশ তীব্র প্রতিবাদ জানান।
পূর্ব ও পশ্চিম
পাকিস্তান নিয়েই পাকিস্তান।
অথচ দুই অঞ্চলে স্বর্ণের মূল্য দুই রকম।
পশ্চিমে কম পূর্বে
বেশি।
আর পশ্চিম
পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে স্বর্ণ নেয়া নিষিদ্ধ।
তদুপরি কাস্টমস সাধারণ নাগরিক তো বটেই,
গণপরিষদ সদস্যদেরও তল্লাশি করত।
অথচ কেউ এ সম্পর্কে
টুঁ শব্দটি করতেন না এবং
অবমাননাকর বলেও উপলব্ধি করতেন না।
কিন্তু এ ঘৃণিত
ও আশ্চর্য
বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাটি বাতিল করার জন্য মাওলানা তর্কবাগীশ একটি প্রস্তাব পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে উত্থাপন করেন এবং সরকারের উদ্দেশে ঘোষণা দেন, এ বৈষম্যমূলক
ব্যবস্থা যদি আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার আগে উঠিয়ে নেয়া না হয়,
তাহলে এ ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে প্রথম আমিই আইন অমান্য করব।
মাওলানা তর্কবাগীশের এ বক্তৃতার
পরই সঙ্গে সঙ্গে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করে যে এখন
থেকে এ ব্যাপারে
আর কাউকেই
তল্লাশি করা হবে না।
অতঃপর এ অপমানজনক
ব্যবস্থাটি রহিত হয়।
১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ধার্য হয়।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পূর্ব ও পশ্চিম
পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সর্বদলীয় নেতারা প্রস্তাব দিলে তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, এ ব্যাপারে
আওয়ামী লীগের কী মতামত?
তখন মাওলানা তর্কবাগীশ ও বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান জানান, আমরাও আপনাকেই
প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
অতঃপর ফাতেমা জিন্নাহ প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে সম্মত হন।
এরপর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ফাতেমা জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে আসেন।
ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রায় ৮-১০
লাখ লোকের সমাগমে এক বিরাট
জনসভা হয়।
সভামঞ্চে পূর্ব ও পশ্চিমের
শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত হন।
স্মরণকালের এ ঐতিহাসিক
জনসভায় সবার ইচ্ছা ও প্রস্তাবে
মাওলানা তর্কবাগীশ সভাপতিত্ব করেন।
মাওলানা তর্কবাগীশ দীর্ঘ রোগভোগের কারণে সংগ্রামী জীবনের এক পর্যায়ে
স্বাস্থ্য ভেঙে যায় এবং তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন।
এ পরিপ্রেক্ষিতে
তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা সমীচীন হবে না বলে
মনে করেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে।
অধিবেশনের আগে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা মাওলানা সাহেবের মনোভাব বুঝতে পেরে তাকে প্রেসিডেন্ট পদে থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।
কিন্তু রুগ্ণ স্বাস্থ্য নিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা সম্ভব নয় বলে
মাওলানা সাহেব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করেন।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের
ফলে আইয়ুব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক
পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়।
জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মাওলানা তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান এবং নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ
রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পরই মাওলানা তর্কবাগীশ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
মুক্তিপাগল জনসমুদ্র সেই মোনাজাতে শরিক হয়।
২৫ মার্চের
মধ্যরাত থেকে পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্যতম
নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে সংগঠিত হয়।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি জাতির ওপর এক অঘোষিত
যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ
অপরাহ্নে মাওলানা তর্কবাগীশ ঢাকার বনগ্রামের বাসা ত্যাগ করেন।
যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে মাওলানা তর্কবাগীশ তিন পুত্রসহ বাড়িঘর ত্যাগ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকার বাসভবন লুটতরাজ ও বেদখল
হয়ে যায়।
পল্লী ভবন সিরাজগঞ্জের তারুটিয়ার বিরাট দ্বিতল বাড়িটি পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়।
অমূল্য সম্পদরাজি এই বাড়িটিতে
সযত্নে রক্ষিত ছিল।
মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য
গ্রন্থ, দুর্লভ ছবি,
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া পবিত্র কোরআন শরিফ এবং মূল্যবান উপহারসামগ্রী এ বাড়িতেই
রক্ষিত ছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সুদীর্ঘ নয়টি মাস দুঃসহ জীবনযাপনের পর মাওলানা
সাহেব ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি
রাত সাড়ে ৮টায় স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা।
স্বপ্নের সেই স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রেখে
এক পরম
মুক্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে মাওলানা তর্কবাগীশ সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পালন করেন।
তার সভাপতিত্বেই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার
ইত্যাদি নির্বাচিত হন।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি সংসদের সব কাজ
বাংলা ভাষায় পরিচালনা করার নির্দেশ দেন এবং সংসদ পরিচালনা পদ্ধতি তার উপদেশ ও নির্দেশেই
রচিত হয়।
আজও তার প্রবর্তিত ধারা অব্যাহত রয়েছে।
স্বাধীনতার পর গঠিত
হয় বাংলাদেশ
মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি।
এ সমিতির
প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা
তর্কবাগীশ এবং সাধারণ সম্পাদক হন মাওলানা
খোন্দকার নাসির উদ্দিন।
অতঃপর মাওলানা সাহেব বাংলাদেশ ইসলামী শিক্ষা সংস্কার ও মাদ্রাসা
শিক্ষক শীর্ষক এক সম্মেলন
করেন।
এ সম্মেলনে
ইসলাম শিক্ষা সংস্কার সংস্থা নামে একটি সংস্থা গঠন করে নিজে সংস্কার সভাপতি, মাওলানা আলাউদ্দিন
আল আজহারীকে
সাধারণ সম্পাদক এবং সাতজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করেন।
পরে ড. কুদরাত-এ-খুদার শিক্ষা কমিশনের একটি উপকমিটি হিসেবে সংযুক্ত হয় এ
সংস্থা।
উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে
মাওলানা তর্কবাগীশ মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যম করেন বাংলা।
১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর
সোভিয়েত রাশিয়ার আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে প্রথম প্রেরিত মাওলানা তর্কবাগীশের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রাশিয়া
গমন করে।
রাশিয়ার রিলিজিয়াস কাউন্সিল কর্তৃক ‘ইসলাম’ শীর্ষক বক্তৃতায় অংশগ্রহণের জন্য মাওলানা তর্কবাগীশ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হন।
কাউন্সিলের অধ্যক্ষের সভাপতিত্বে মাওলানা সাহেব দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা
ইসলাম সম্পর্কে বক্তৃতা করেন।
তার এ বক্তৃতা
উচ্চপ্রশংসিত হয়।
তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন এবং রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে সোভিয়েত রাশিয়ার জনসাধারণ, বিশেষ করে
মুসলমানদের কাছে মহান ব্যক্তি ও মহান
দেশ হিসেবে তিনি এবং বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি অপপ্রচারের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা মুসলিম বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে এবং মুসলিম জাহানের ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য মাওলানা তর্কবাগীশকে হজযাত্রীদের দলনেতা হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
মাওলানা সাহেব এটাকে জাতীয় কর্তব্য বলে মনে করে সৌদি আরবে যেতে রাজি হন।
১৯৭২ সালের ২ ডিসেম্বর
হজ প্রতিনিধি
দলের নেতা হিসেবে তিনি সৌদি আরবে গমন করেন এবং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে পাকিস্তানি প্রচারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দেশ ও জাতির
খেদমতে এক মহান
ঐতিহাসিক অবদান রাখেন।
এ প্রেক্ষাপটে
আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, তখন কূটনৈতিক
ক্ষেত্রে পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে, যাতে বাংলাদেশ
সরকার মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি না পায়। বাংলাদেশ
সরকার, বিশেষ করে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সমস্যা
সমাধানে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে মাওলানা তর্কবাগীশকে স্বীকৃতি আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেন।
অতঃপর মাওলানা সাহেবে মুসিলম দেশগুলো সফর করেন এবং মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্ববরেণ্য হাদিসবেত্তা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বোখারীর
১২০০তম জন্মবার্ষিকী (খোশরোজ) উদযাপনের জন্য
সোভিয়েত রাশিয়ার সমরখন্দে ১৯৭৪ সালের ২০ থেকে
২৩ আগস্ট
পর্যন্ত এক মহাসম্মেলন
অনুষ্ঠিত হয়।
এ মহাসম্মেলনে
৪০টি মুসলিম দেশের খ্যাতনামা আলেম-উলেমা,
জ্ঞানী-গুণী
ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে মাওলানা তর্কবাগীশ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হন।
মাওলানা সাহেব মহাসম্মেলনে ইমাম বোখারীর ওপর যে জ্ঞানগর্ভ
অভিভাষণ দেন, তা সব
বিশ্বধর্মীয় নেতা কর্তৃক উচ্চপ্রশংসিত হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে এ
বিশ্ব মুসলিম মহাসম্মেলনে ৪০টি দেশের সম্মানিত প্রতিনিধিরা মাওলানা সাহেবকে ‘নুরুল
মোনাওয়ার’ অর্থাৎ
সম্মেলনের আলোকবর্তিকা উপাধিতে ভূষিত করেন।
২০ আগস্ট
১৯৮৬ ভোর পৌনে ৪টায় গণতন্ত্রের মহানায়ক ভাষা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ সুফি সাধক মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ইন্তেকাল করেন।
(সংক্ষেপিত পুনর্মুদ্রণ)
মাওলানা নজরুল ইসলাম আশরাফী মাইজভাণ্ডারী: কেন্দ্রীয় পরিষদের সহসভাপতি, বাংলাদেশ গণআজাদী লীগ





