বাংলাদেশের বিশাল মানচিত্র। এর মাঝে সুবিশাল ক্যানভাসজুড়ে বঙ্গবন্ধু। বাংলার মুক্তির অনন্য দিশারি। কালক্রমে হয়ে উঠেছে এ বাংলার হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের শুভ জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি তার অমর স্মৃতির প্রতি।

আমি তখন আট বছরের। ১৯৭০ সালের ৫ জানুয়ারি সোমবার দুপুরে আমাদের তিন বোনের পর ভাই সোহেলের জন্ম। শীতকাল, বেশ ঠাণ্ডা পড়ত সে সময়। দুপুর পার হওয়ার আগেই বড় বড় টুকরি ভরা মিষ্টি নিয়ে আনন্দে উত্ফুল্ল বঙ্গবন্ধু চলে এলেন আমাদের বাসায়। আনন্দ আলো যেনো ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে।

স্কুলের পর আমরা নানা রকম খেলায় ব্যস্ত থাকতাম। দেখতাম মাঝেমধ্যে বঙ্গবন্ধু এবং বাবা একান্তে বসে কথা বলতেন অথবা কথা বলতে বলতে হাঁটতেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখলেই কাছে ডেকে নিতেন। তার আদর-স্নেহ, শিশুর সঙ্গে শিশুর মতো সহজ আচরণ আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি। ’৭০ সাল আয়ুববিরোধী আন্দোলন, ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতায় আগমন এবং নির্বাচনের বছর। আমার বাবা কখন বাসায় আসেন, কখন বাইরে যান বোঝাই যায় না। নির্বাচনী প্রচার চলাকালে সভারের কাছে কোথাও বাবাসহ তিনজন সড়ক দুর্ঘটনায় আঘাত পান। বাবা পায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। সেই রাতের কথা ভোলার নয়। বঙ্গবন্ধুও নির্বাচনী প্রচারণায় ঢাকার বাইরে ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনার কথা শুনে ছুটে এসেছিলেন বাবার কাছে। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন অসীম মমতায়। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন এ দুজনের বন্ধন যেনো ছিল পরম আত্মায়। একইভাবে আমাদের এ দুই পরিবারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। 

বিভিন্ন জনের কাছে শুনেছি, ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদ যে অফিসঘরে বসে কাজ করতেন, তার চেয়ারের সঙ্গেই রাখা ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি চেয়ার। বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি ছিল সে চেয়ারে রাখা। তাজউদ্দীনের এই আবেগ ছিল হূদয়স্পর্শী। তার নেতা, তার প্রাণপ্রিয় মুজিব ভাই বিশ্বস্ত অনুজ তাজউদ্দীনের সঙ্গেই আছেন তিনি শুধু তার হয়ে কাজ করেছেন। এমন অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা, ভালোবাসা জগতে বিরল। সেই সময়ের ক্যাবিনেট সচিব এইচটি ইমাম, সংস্থাপন সচিব নূরুল কাদের খান বলতেন, তাজউদ্দীন সাহেব এমনভাবে কাজ করতেন যেনো প্রতি মুহূর্তে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আদিষ্ট হয়ে কাজ করছেন।

৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দান করে ভারত। এর পরদিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা চলে আসেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলতে। একপর্যায়ে তারা প্রশ্ন করেন, বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশের স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ, তাজউদ্দীন আহমদের অনুভূতি কি? তাজউদ্দীন বলে ওঠেন, আমি তো শুধু ধাত্রীর কাজ করেছি। বাংলাদেশ নামে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আমি তার পিতাকে (বঙ্গবন্ধু মুজিব) সন্তান জন্মের খবর দিতে পারিনি, এ বলে একাত্তরের নীলকণ্ঠ সাহসী যোদ্ধা তাজউদ্দীন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত, মানুষের মন কানায় কানায় পূর্ণতার মগ্নতায় আচ্ছন্ন। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তার স্বাধীন বাংলায়। তাজউদ্দীনের আবেগ, ভালোবাসা, একাকিত্ব, জীবনের পূর্ণতা, শ্রদ্ধা ঝরে পরল বঙ্গবন্ধুর বুকজুড়ে। ক্যামেরায় বন্দি হলেন আজন্ম সহযাত্রী দুজনে।

একবার বঙ্গবন্ধু চার বছরের সোহেলকে জিজ্ঞাসা করছিলেন ওর কি পছন্দ। সোহেল বলেছিল খরগোশ। বঙ্গবন্ধু ’৭৫-এর শুরুর দিকে আম্মাকে ফোন করে বলেছিলেন সোহেলের জন্য খরগোশ পাঠাচ্ছেন। ধবধবে সাদা অপূর্ব দুটি খরগোশ পাঠালেন বঙ্গবন্ধু। সোহেল ঘুর ঘুর করে সারাক্ষণ খরগোশের সঙ্গে। যত্নের কোনো শেষ নেই। কিন্তু অদ্ভুত  ব্যাপার ছিল আমার বাবার। তার প্রিয় মুজিব ভাইয়ের দেয়া উপহার একা একা চুপি চুপি অনেকটা সবার অলক্ষ্যেই বসে থাকতেন খরগোশের সঙ্গে। পরম যত্নে খাবার দিতেন।

১৯৭৫, ১৫ আগস্ট পৃথিবীটাই যেনো মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরই তাজউদ্দীন আহমদকে পরিবারসহ গৃহবন্দি করা হয়। তারপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। কত রকম হেনস্থা বাসাতে যেমন, জেলখানাতেও তেমন। অক্টোবরের ২৩/২৪  জেলখানায় বাবার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। জেলখানায় যেখানে বসে আমাদেরকে কথা বলতে দেয়া হতো, ঠিক সামনেই গোয়েন্দা সংস্থার লোক বসা থাকত। বাবা একমুখ ভরা হাসি নিয়ে সেখানে ঢুকে জোরে বলে উঠলেন, আমি মুজিব ভাইকে স্বপ্ন দেখেছি। মুজিব ভাই আমাকে বলছেন, তাজউদ্দীন সেই ১৯৪৪ সাল থেকে তোমার সাথে আমার পরিচয়। তুমি আমার কাছে চলে আসো। তোমাকে ছাড়া আমার ভালো লাগে না। সেদিনের মতো এত বছর পর আজো আমি ভাবি, কী প্রশান্তির হাসি ছিল তার মুখে। তিনি যেনো তার মুজিব ভাইয়ের কাছে চলে যাবেন সে প্রস্তুতি তার হূদয়জুড়ে।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ৯২-৯৩ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদের শত শত ছাত্রকর্মীর অংশগ্রহণ, পিকেটিং, পুলিশের লাঠিচার্জ, অত্যাচার, বঙ্গবন্ধুসহ অনেকের গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন তাজউদ্দীন আহমদের কথা। লিখেছেন, ‘তাজউদ্দীন, তোয়াহা ও অনেককে গ্রেফতার করতে পারে নাই। আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তর জনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়। ফলে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। ঢাকার জনগণের সমর্থনও আমরা পেলাম।  

তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে ১১ মার্চ ’৪৮ বৃহস্পতিবার লিখেছেন, ‘সকাল ৭টায় সাধারণ ধর্মঘটের পক্ষে কাজ করতে বেরিয়ে প্রথমে গেলাম ফজলুল হক মুসলিম হলে।  রমনা পোস্ট অফিসের কাছে তোয়াহা সাহেব ও অন্য কয়েকজন পুলিশ কর্তৃক আটক হলেন। আমি গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হলাম। একটু পরে তোয়াহা সাহেবকে পুলিশ ছেড়ে দিল। ১২টায় পিকেটিং বন্ধ হলে ১টায় নাইমুদ্দিন সাহেবের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা হলো। বেলা ২টায় সচিবালয় অভিমুখে মিছিল শুরু হলে পুলিশ হাইকোর্ট গেটের কাছে বাধা দিল। আমরা উত্তর গেটের দিকে রওনা হলাম। তখনই পুলিশ লাঠিচার্জ করল। ...শেখ মুজিব, শামসুল হক, মাহবুব, অলি আহাদ, শওকত, আনসার ও অন্যান্য ৬৯ জনকে আটক করে জেলহাজতে রাখা হয়েছে। ১৪ জন আহত হয়ে হাসপাতালে। সেন্ট্রাল জেল, কোতোয়ালি ও সূত্রাপুর থানা এবং হাসপাতালে তাদের সঙ্গে দেখা করলাম, ... পুলিশের নির্যাতন ও ভাড়াটে গুণ্ডাদের গুণ্ডামি সত্ত্বেও আজকের ধর্মঘট চমত্কার সফল হলো।’

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১১৭ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছাত্র প্রতিনিধিদের ধারণা, আমি গ্রেফতার হলে আন্দোলন চলবে, কারণ আন্দোলন ঝিমিয়ে আসছিল। একে চাঙ্গা করতে হলে, আমার গ্রেফতার হওয়া দরকার। আমি তাদের কথা মেনে নিলাম। পাঁচ মিনিট পরে এসে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের গ্রেফতারের হুকুম দিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ (এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) আটকা পড়েছে। তাকে নিষেধ করা হয়েছে গ্রেফতার না হতে। তাজউদ্দীন বুদ্ধিমানের মতো কাজ করল। বলে দিল, “আমি প্রেস রিপোর্টার”। একটা কাগজ বের করে কে কে গ্রেফতার হল, তাদের নাম লিখতে শুরু করল। আমি তাকে চোখ টিপ মারলাম। আমাদের গাড়িতে তুলে একদম জেলগেটে নিয়ে আসল।’

তরুণ বয়সের পরিচয় সখ্য থেকে উদ্যমী যুবক। কর্মে কর্মে পারস্পরিক  গভীরতা। এগিয়ে চলেন বঙ্গবন্ধুর পাশে বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী  হয়ে তাজউদ্দীন। বাংলা ভাষার অধিকার এবং মর্যাদার দাবি এগিয়ে চলে মানুষের ন্যায্যতার সংগ্রামে সব নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে বাংলার মানুষ। ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ফল বাংলার মানুষের গণরায়ের চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু। মুসলীম লীগের ভরাডুবি হয় যুক্তফ্রন্টের কাছে। যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীদের জয়জয়কার। তরুণ তাজউদ্দীন তত্কালীন মুসলীম লীগের প্রাদেশিক সাধারণ সম্পাদককে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর অনন্য নেতৃত্বে জেল-জুলুম-নির্যাতন উপেক্ষা করে চলতে থাকে ন্যায্যতা আদায়ের আন্দোলন। সেই থেকে স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাংলার মানুষের একাত্ম হয়ে এগিয়ে চলা। এ দীর্ঘ পথচলায় বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্টত, নির্ভরযোগ্য সহকর্মী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

বঙ্গবন্ধুর অপার স্নেহের দেখা পাওয়া যায় তাজউদ্দীনকে লেখা ছোট্ট একটি চিঠিতে। তাজউদ্দীন আহমদও তখন ময়মনসিংহ জেলে বন্দি। বঙ্গবন্ধু লেখেন—

 

স্নেহের তাজউদ্দীন           ঢাকা জেল

                ১৯/৮/৬৬

 

আমার স্নেহ ও ভালোবাসা নিও।

কেমন আছ? খবর জানি না। আমাকে খবর দিও। চিন্তা করিও না। সকলকে ছালাম দিও। শরীরটা বেশি ভাল না, তবে কেটে যাচ্ছে। তোমার শরীরের যত্ন নিও।

ইতি

তোমার মুজিব ভাই।

 

সূত্র: পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন,৬০৬-৪৮ পিএফ, খণ্ড ২৬

 

সিমিন হোসেন রিমি: জাতীয় সংসদ সদস্য, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, লেখক ও সমাজকর্মী