ব্রিটিশ শাসনের শেষাশেষি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বপ্ন দেখেছিলেন ‘বৃহৎ বাংলা’ নামে ভারতের পূর্বাঞ্চলে এক নতুন দেশের। যার অংশ ছিল সেদিনের অবিভক্ত বঙ্গ তথা পুরো বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও পূর্ণিয়া জেলা। পূর্ব ভারতে হোসেন শহীদের দেখা সেদিনের স্বপ্ন যে মোটেই অবাস্তব ও কল্পনাবিশেষ ছিল না তা প্রমাণ হয়েছে দেশভাগের সিকি শতাব্দের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনায়। দীক্ষাগুরু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়িত হয়েছে যোগ্য শিষ্যের নেতৃত্বে। গুরু হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এখানে যেমন অনন্য ও অদ্বিতীয় এক রাজনীতিক তেমনই উনার পরবর্তী প্রজন্মের তুলনারহিত এক রাজনীতিক প্রতিভা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পূর্ব ভারতে একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা গুরুর ইচ্ছা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হয়েছেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি।

গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের কথা বললেই আমাদের সবার মাঝে এসে হাজির হয় শিষ্য অর্জুন আর গুরু দ্রোণাচার্যের কথা। মাতা কুন্তী আর পিতা ভীষ্মর মতো যদি কেউ অর্জুনকে ভালোবেসে থাকেন, তাহলে তিনি আর কেউ নন, গুরু দ্রোণাচার্য। অর্জুনের সম্ভাবনাকে চিনতে পেরেছিলেন তিনি। বিশ্বাস করেছিলেন সে-ই হবে জগতের শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ, এমনকি ছাড়িয়ে যাবে গুরুকেও। এ কারণে দ্রোণাচার্য অর্জুনকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কমতি বা খামতি রাখেননি। বাস্তবিকই অর্জুন জগতের শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ বা যোদ্ধা হয়েছিলেন। এ কারণে যোদ্ধার কথা বললে কেবল, ভারতীবর্ষে নয়, প্রাচ্যে নয় কেবল, পাশ্চাত্যেও স্মরণ করা হয় অর্জুনের নাম, সেই সঙ্গে উচ্চকিত হয়ে ওঠে গুরু দ্রোণাচার্যের কথা। যেমনভাবে গ্রিক শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও দর্শনে উচ্চারিত হয় সক্রেটিস ও প্লেটোর কথা।

গুরু-শিষ্যের এ তালিকা অপ্রতুল নয় মোটেই। কিন্তু সকল গুরু ও শিষ্যকে ছাড়িয়ে গেছেন অর্জুন ও দ্রোণাচার্য। বিংশ শতাব্দীর ভারত উপমহাদেশের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের গল্প যেন সংস্কৃত শাস্ত্রের দ্রোণাচার্য ও অর্জুনের গল্পের মতোই। একজন গণতন্ত্রের মানসপুত্র। আরেকজন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। বাঙালি জাতির কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় নন্দিত উনাদের পরিচয়ও নাটকীয়তায় ভরা। শেখ মুজিব তখন স্কুলের ছাত্র। এ কে ফজলুল হক, যার উষ্ণীষে শোভাবর্ধন করেছে ‘শেরেবাংলা’ উপাধি, তিনি তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। উনার কেবিনেটের শ্রমমন্ত্রী তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আজকের গোপালগঞ্জে সেদিনের স্কুল ছাত্র শেখ মুজিবুরের স্কুল পরিদর্শনে এসে পরিচয় হয় উনাদের। তার পর সেই সম্পর্ক যতদিন গেছে গভীর হয়েছে পিতা-পুত্রের বন্ধনের মতো করে। সময় পরিক্রমায় সেখানে নানা নাটকীয়তা যোগ হলেও দূরত্ব তৈরি হয়নি কখনো।

বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদের অবদানকে নানাভাবে হাজির করেছেন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। তিনি লিখেছেন:

এক. একদিন সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে জমাদার সাহেব চলে গেলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কীভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-০১)

দুই. শহীদ সাহেব আমাকে হঠাৎ বলে বসলেন, ‘Who are you? You are nobody.’ আমি বললাম, ‘If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you Sir. I will never come to you again.’ এ কথা বলে চিত্কার করতে করতে বৈঠক ছেড়ে বের হয়ে এলাম। আমি যখন বিখ্যাত ৪০ নম্বর থিয়েটার রোড থেকে রাগ হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম শহীদ সাহেব হুদা ভাইকে (পরবর্তীতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী-বাফার সেক্রেটারি মাহমুদ নূরুল হুদা) বললেন, ‘ওকে ধরে আনো।’ রাগে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। হুদা ভাই দৌড়ে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। শহীদ সাহেবও দোতালা থেকে আমাকে ডাকছেন ফিরে আসতে। আমাকে হুদা ভাই ধরে আনলেন। বন্ধুবান্ধবরা বলল, ‘শহীদ সাহেব ডাকছেন, বেয়াদবি কর না, ফিরে এস।’ উপরে এলাম। শহীদ সাহেব বললেন, ‘যাও তোমরা ইলেকশন কর, দেখ নিজেদের মধ্যে গোলমাল কর না।’ আমাকে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘তুমি বোকা, আমি তো আর কাউকেই একথা বলি নাই, তোমাকে বেশি আদর ও স্নেহ করি বলে তোমাকেই বলেছি।’ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি যে সত্যিই আমাকে ভালোবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত। যখনই তাঁর কথা এই কারাগারে বসে ভাবি, সে কথা আজও মনে পড়ে। দীর্ঘ ২০ বছর পরেও একটুও এদিক ওদিক হয় নাই। সেইদিন থেকে আমার জীবনে প্রত্যেকটা দিনই তাঁর স্নেহ পেয়েছি। এই দীর্ঘদিন আমাকে তাঁর কাছ থেকে কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে নাই এবং তাঁর স্নেহ থেকে কেউই আমাকে বঞ্চিত করতে পারে নাই। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-২৯)

বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তার পরিপার্শ্ব দেখে উপলব্ধি করা অনেকাংশে দুরূহ যে কতখানি আদর্শিক জায়গা থেকে গুরু শিষ্যের অনুপম এক উদাহরণ হাজির করেছেন হোসেন শহীদ ও শেখ মুজিব। পিতা যেমন সন্তানকে স্নেহ-সোহাগ শাসনে আগামীর জন্য তৈরি করেন, হোসেন শহীদ সেই কাজটিই করেছিলেন। সন্তানের জন্য সদর্থক অর্থে শুভাকাঙ্ক্ষী পিতা যেমন তর্কে জড়ান এবং নিজের ত্রুটিযুক্ত সিদ্ধান্তকে সংশোধন করে দিলে গর্বিত হন, ঠিক তেমন উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন উনারা। দুটো উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।

এক. শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে। মুসলিম লীগ দলের পক্ষে কলকাতায় একটা প্রেস কেনা হয়েছিল। দেশভাগের পর এই প্রেস কী করা হবে তাই নিয়ে আবুল হাশিমের সঙ্গে মতান্তর ও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় তরুণ শেখ মুজিবুরের। তখন হোসেন শহীদের সঙ্গে আবুল হাশিমের সম্পর্ক কিছুটা শীতল। এরূপ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত বিষয় উনাকে জানানো হলে তিনি আহত হন এবং কাজটা ঠিক হয়নি বলেই ইতি টানেননি, দুঃখ প্রকাশ করা উচিত বলেও মতামত দেন এবং শেখ মুজিব সেই নির্দেশ মেনে আবুল হাশিমের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন।

দুই. এই ঘটনাও উল্লেখিত হয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ করার সময়ে এর পক্ষে ছিলেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। হোসেন শহীদের যুক্তি ছিল এ মুহূর্তে এরূপ সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ভোটের রাজনীতিতে তার জন্য খেসারত দিতে হতে পারে। শেষাবধি অবশ্য প্রথম পক্ষের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়। এ ঘটনায় অনেকেই আশ্চর্য হয়েছিলেন এমনকি আবদুল হামিদ খান ভাসানী পর্যন্ত। অথচ এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কিন্তু হোসেন শহীদ ও শেখ মুজিবুরের সম্পর্কে কোনো ফাটল বা দূরত্ব তৈরি হয়নি। এতেই স্পষ্ট হয়, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক কেবল আবেগের জায়গায় ছিল না, যুক্তির নিরিখে ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতেও তা ছিল দৃঢ়তার বন্ধনে আবদ্ধ।

হোসেন শহীদ কিন্তু বিভক্ত হওয়ার আগের যুক্ত বঙ্গের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তারপরও সেদিন ক্ষমতার পাশে থাকা নয়, জনগণের পাশে থাকাকেই তিনি সর্বৈবরূপে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সব পরিস্থিতিতে জনগণকে কেন্দ্র রাখায়, গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দেয়ায় তিনি আজও তুলনারহিত এক নাম। হোসেন শহীদের এই বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে জারি ছিল শেখ মুজিবুরের মধ্যেও। ততদিনে শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় মান্যতা পেয়েছেন সবার তরফে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ফলের মধ্য দিয়ে পরিণত হয়েছেন অবিসংবাদিত নেতায়। কেবল পূর্ব বাংলায় নয়, পুরো পাকিস্তানে উনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী এলিট শ্রেণী, রাজনীতির কুশীলব ও সামরিক জান্তারা মিলে ক্ষমতা দিতে করছেন নানা রকমের টালবাহানা ও গড়িমসি। বঙ্গবন্ধু তবুও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সবকিছু করে গেছেন। জনগণকে সবকিছুর কেন্দ্রে রেখে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে একজন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত তার অনুপম সাক্ষ্য সেদিন হাজির করেছিলেন তিনি, যা আমরা দেখেছি ৭ মার্চের ভাষণে। নিউজউইক এ কারণে সেদিন উনাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘পোয়েট অব পলিটিকস’।

বঙ্গবন্ধুও উনার রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েনে হোসেন শহীদের রেখে যাওয়া এই কর্মাভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত নানান জনকে রাজনৈতিক দাবার চাল দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকতা পুঁজি করে ন্যায্যতার পথে থেকে দেশ ও জাতিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম যে নিয়মতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করে চূড়ান্ত যুদ্ধের দিকে এগিয়ে গেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থেই বিরল।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনের স্বর্ণালী অধ্যায়ের সঙ্গে ১৯৪৬-এর ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’য়ের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করে কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে কোনো গবেষণা কিংবা তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই উনাকে অভিযুক্ত করে কথিত এক ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়েছে অথচ ঘটনাটা ঠিক তেমন নয়। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ও উঠে এসেছে এ সম্পর্কিত ঘটনার সত্য বয়ান।

দেশভাগের ঠিক এক বছর আগে রাজধানী কলকাতায় সংঘটিত হয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এক দাঙ্গা। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট এবং তার কয়েকদিন পর সংঘটিত হয় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামের মর্মন্তুদ এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৪৬ সালের ২৮ জুলাই মুসলিম লীগের অধিবেশনে দলীয় সভাপতি জিন্না ১৬ আগস্টে ভারতজুড়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়। ১৫ আগস্টে বঙ্গ প্রদেশের মুসলিম লীগ সরকার ১৬ আগস্ট বন্ধ ঘোষণা করে। এসব ঘটনাপ্রবাহের কারণে কোনো কোনো ঐতিহাসিকসহ গরিষ্ঠ সংখ্যার একদল মানুষ গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকে অভিযোগ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। অথচ ইতিহাসের সত্য বলছে, হিন্দুদের জানমাল ও সম্পদ বিনষ্টি রোধে তিনি কতটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বয়ানে লেখক-গবেষক আলিমুজ্জামান জানাচ্ছেন, ‘১৯৪৬ সালের সেই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী কখনো একজন রক্ষী নিয়ে, কখনো বা একা কলকাতার অলিগলিতে বিপন্নকে রক্ষার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তখন দুর্বৃত্তের ছোরা উদ্যত; কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী অকুতোভয়। নিরস্ত্র জননেতাকে দেখে সশস্ত্র গুন্ডারা পালিয়ে গেছে। তার অঙ্গ স্পর্শ করার সাহস পায়নি।’ হোসেন শহীদের কন্যাও ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। আখতার জাহান সোহরাওয়ার্দীর এই ভূমিকায় বলে দেয় সোহরাওয়ার্দী পরিবার মানবতার সেবায় কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ ছিলেন।

হোসেন শহীদ ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বের দীক্ষাগুরু। তিনি আমৃত্যু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে উত্সর্গীকৃত একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। উনাকে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও পক্ষপাত ছিল প্রশ্নহীন। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষ ও দেশের মুক্তি-উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও এর নেপথ্যে থেকে যারা এই জন্ম প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর থেকে,  হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের অন্যতম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া বিভিন্ন সময়ের ভাষণ পাঠ করলে এই সত্যতার একটা মান্য রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তায়ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদের দূরবর্তী প্রভাব ছিল। এক্ষণে আমাদের জানা দরকার, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার স্বরূপ, যার অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে যায়, ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত ‘News Week’ পত্রিকার সংবাদ ভাষ্যে, যেখানে উল্লিখিত হয়েছে : ‘Mujib does not pretend to be an original thinker. He is a poet of politics; not an engineer, but the Bengalis temd to be more artistic than technical, any how, and so this style may be just what was needed to unite all the classes and ideologies of the region.’

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তাকে সম্যক উপলব্ধি করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে তার দেয়া একটা সাক্ষাত্কারে। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘কতিপয় প্রশ্নের জবাবে’ ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
‘ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম কতিপয় চিন্তাধারার ওপর গড়ে উঠেছে। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী তথা সকল মেহনতি মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে কৃষক, শোষিত হয়েছে শ্রমিক, শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সকল মেহনতি মানুষ। এ দেশের জমিদার, জোতদার, মহাজন ও তাদের আমলা-টাউটদের চলে শোষণ। শোষণ চলে ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কী? এই প্রশ্ন আমাকেও দিশেহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই। আমার কোনো কোনো সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলেন শ্রেণী সংগ্রামের কথা। কিন্তু আমি বলি জাতীয়তাবাদের কথা। জিন্নাবাদ এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিষবাষ্প। তার জবাবে আমি বলি, যার যার ধর্ম তার তার—এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়, গণতান্ত্রিক পন্থায়, সংসদীয় বিধিবিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আমার এই মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোস্লাভিয়া প্রত্যেকে নিজ নিজ পথে, নিজ নিজ অবস্থা মোতাবেক গড়ে তুলছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি, বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র—এই চারটি মূল সূত্র ধরে; বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে।’

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটি প্রাবন্ধিক-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সবাইকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। বঙ্গবন্ধু এই দিকটি অন্বেষণ করেছেন, দিল্লির সুলতানি আমলের আত্মশ্লঘায়, যেখানে তারা নিজেদের বাঙালি বলে ঘোষণা করেছিলেন। এ কথা সর্বৈব সত্য যে বঙ্গবন্ধু ধর্মকে দেখেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিতে, জিন্নাহর মতো নয়। গান্ধীর হিন্দুইজম ছিল ব্যক্তিগত, সর্বলোকের কল্যাণ সাধনের পন্থায়। অন্যদিকে, জিন্নাহর কাছে ইসলাম ছিল রাজনৈতিক অভিলাষের শক্তিবিশেষ। বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে উদার নৈতিকতার চর্চা ও সর্বমতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রগতি পন্থায় সমর্পিত থাকার বীজমন্ত্র তরুণ বয়সেই পেয়েছিলেন হোসেন শহীদের কাছে।

জওহরলাল নেহরু সম্পর্কে ঐতিহাসিক রোমেলা থাপারের অভিমত: ‘একদিক থেকে অতীতের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, বর্তমান মুহূর্তগুলোর মূল্যায়ন করে, আর এক ফালি ভবিষ্যতের আস্বাদ দিয়ে জওহরলাল নেহরু ছিলেন প্রবেশদ্বারের ভাস্কর। বর্তমানের প্রেক্ষিতে...এটা কল্পনাই মনে হবে যে আমাদের এক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যিনি ঐতিহাসিক না হয়েও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের যুক্তিসম্মত কাঠামোগুলো ধরতে পারতেন, যিনি এই বোধের প্রয়োগে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথে চালিত করেছিলেন; আর, যিনি ভারতীয় সমাজে রাজনৈতিক চেতনার মূল্য বুঝতে পেরে, এই আদর্শ স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে যদি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলিকে প্রশংসার যোগ্য করে তুলতে হয় তাহলে তার মধ্যে নৈতিকতার ছাপ রাখতে হবে।’ রোমেলা থাপারের এই অভিমত বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত। জওহরলাল নেহরু, শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের সেই বিরলপ্রজ মহানায়কদের অন্যতম যারা ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নিজেই ইতিহাস নির্মাণ করেন। রোমেলা থাপার যথার্থই বলেছেন, ইতিহাসের এই নির্মাতাদের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোতে সততার ছাপ থাকা জরুরি। যে পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধু উত্তীর্ণ হয়েছেন সফলভাবে তো বটেই অন্যদের ছাড়িয়েও গেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, নেহরু যেমন মহাত্মা গান্ধীর জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে অতীতের আলোয় ভারতকে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুও হোসেন শহীদের গণতান্ত্রিক প্রত্যয়, জন অধিকার ও সকলের মাঝে সাম্যাবস্থা নিশ্চিত করার অভিপ্রায় থেকে দীক্ষা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনের দীক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তেই বঙ্গবন্ধু উনার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘বাংলাদেশ’ নামটি তত্ত্ব পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন। যাকে আমরা বলতে পারি বঙ্গবন্ধুর ‘বাংলাদেশ তত্ত্ব’ উন্মোচনের ঐতিহাসিক ক্ষণ। দিনটা ছিল ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম হবে বাংলাদেশ।’ আলোচনায় অবশ্য স্বাধীন পূর্ব বাংলা, বাংলা, বেঙ্গল, ইস্ট বেঙ্গল, বঙ্গ, বঙ্গ দেশ নামগুলোও আসে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল ‘বাংলাদেশ’ নামটার পক্ষে।

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ‘বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, একসময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে “বাংলা” কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র “বঙ্গোপসাগর” ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম “পূর্ব পাকিস্তান”-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ।’

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম যে সংবিধান প্রণীত ও গৃহীত হয় সেখানে দেশটির সাংবিধানিক নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ। আর এর মধ্যে দিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নামটির দালিলিক স্বীকৃতি মেলে এবং সত্য হয় বঙ্গবন্ধুর ‘বাংলাদেশ তত্ত্ব’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সম্পর্ক ছিল কেবলই আদর্শিক, জনকল্যাণ ও দেশপ্রেম থেকে উত্সারিত। হোসেন শহীদ একেবারে তরুণ বয়স থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হন, ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জীবনের নানা পর্যায়ে। কিন্তু কখনো কোনো স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেননি। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এ এক বিরল ব্যতিক্রম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনি যুক্ত বঙ্গে মুসলিম লীগ গঠনে রেখেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১২১টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ১১৪টি আসনে জিতেছিল, যার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন হোসেন শহীদ। মুসলিম লীগের এই ভূমিধস বিজয়কে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলমানদের রায় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করেন। সে কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে জিন্নার পাশাপাশি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম নেয়া ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিযুক্ত। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিস্ময়কর বিজয়েরও নেপথ্য নায়ক ছিলেন হোসেন শহীদ। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ প্রাদেশিক পরিষদের ওই নির্বাচনে ৩০৯ আসনের মধ্যে মাত্র ৯ আসন পেয়েছিলেন। হোসেন শহীদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন মুসলিম লীগ ওই কটা আসন পাবে, বাস্তবিকই তেমনটাই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এসব উল্লেখিত হয়েছে।

হোসেন শহীদ পূর্ববঙ্গের জনপদ, রাস্তা, মাঠ, ঘাট জনসংস্কৃতি আক্ষরিক অর্থে তেমনটা জানতেন না। এসবই তিনি জেনেছিলেন বুঝেছিলেন তরুণ মুজিবুরের কাছ থেকে। উনার চোখ দিয়েই দেখেছিলেন পূর্ব বাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশকে। আর হোসেন শহীদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠন পরিচালনার শক্তি, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা, গণতন্ত্রমনস্কতা, জাতীয়তাবাদী মন থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন তরুণ মুজিব। যা উনাকে পরবর্তী সময়ে করে তোলে অবিসংবাদী, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক নেতায়। যে নেতৃত্বের স্বর্ণালী ফসলের নাম স্বাধীন বাংলাদেশ।

কাজল রশীদ শাহীন: লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক
kazal123rashid@gmail.com