দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বর্তমানে শতাধিক। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। এদের মধ্যে প্রথম ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান, পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও তারা বেশ এগিয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষকরা রয়েছেন এবং তারা যথাযথ দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীও তৈরি করছেন। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তারা মধ্যমমানের। তারাও চেষ্টা করছেন শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার। তারা হয়তো ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে। কিন্তু তৃতীয় ক্যাটাগরিতে যারা রয়েছেন তাদের শিক্ষার মান একেবারেই আশানুরূপ নয়। এ ক্যাটাগরিতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তাদের নিয়েই আমরা চিন্তিত এবং তাদের মানোন্নয়নে কী করা যায় সেসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টিকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?
প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই উপযুক্ত দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে, এটি অস্বীকারের উপায় নেই। এর অন্যতম কারণ শিক্ষকদের কম বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। বিশেষত আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন খুবই কম। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায় আসতে চান না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেতন-ভাতার সমস্যাটা কিছুটা কম। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা মেধাবী শিক্ষকও পাচ্ছি। কিন্তু এ স্তরে আবার গবেষণাসহ সুযোগ-সুবিধার কিছু স্বল্পতা আছে। এ স্বল্পতার কারণে আমরা তাদের মেধার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছি না। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যেটি একেবারেই কাম্য নয়। এ বিষয়গুলোও উপযুক্ত দক্ষ শিক্ষকের সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এ সংকট নিরসনে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হয়। এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়াও এমন হতে হবে যাতে মেধাবীরাই শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়। শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের মতো বিষয়গুলো পরিহার করতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে ইউজিসির পদক্ষেপ কী?
সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার মান নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সচেষ্ট। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু নিজস্ব আইনে চলে তাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির কাজের পরিধি তুলনামূলক বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য আইনের অধীনে বিভিন্ন শর্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত যথাযথভাবে পালন করছে কিনা সে বিষয়ে আমরা সর্বদাই মনিটরিং করি। কোথাও কোনো অভিযোগ এলে বা অনিয়ম ঘটলে সেসব বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বৃদ্ধি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করি। যেমন সম্প্রতি আমরা হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি। এ প্রকল্পে শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও যুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের কতটা পরিচিত করতে পেরেছে বলে মনে করেন?
আমাদের বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তদের সাফল্য আছে। র্যাংকিংগুলোতে ক্রমশ অগ্রগতি হচ্ছে। তাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং সর্বত্র তাদের একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। সার্বিকভাবে যদি আমরা দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের অবস্থান প্রায় একই রকম এবং মেধাবীরা যে প্রতিষ্ঠানেরই হোক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা ভালো করছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে করণীয় কী?
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সুপরিচিত করার জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্ব-উদ্যোগেই খুব সচেষ্ট। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গবেষণাসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। অনেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণ করছেন, যা বিশ্বব্যাপী তাদের ডিগ্রির মানের নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে। এছাড়া আমাদের দেশেও অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল রয়েছে। এ অ্যাক্রেডিটেশনও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যোগ্য, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক জোরদার করে, গবেষণায় গুরুত্ব দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ স্থাপনে আরো মনোযোগী হয় তবে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। কারণ আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা যদি পর্যাপ্ত সুযোগ ও সহযোগিতা পায় যেকোনো জায়গায়ই সফলতা অর্জনে সক্ষম হবে। আর শিক্ষার্থীরা যখন সফল হয় তখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মাধ্যমে সুপরিচিত হয় ও সামনে এগিয়ে যায়।





