দেশের জনসংখ্যা নিয়মিত বাড়ছে। সে অনুযায়ী আবাসন খাত সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এ খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলো কীভাবে এগিয়ে আসতে পারে?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে আবাসন খাতের তুলনামূলক সম্প্রসারণ না হওয়ায় বাজার ব্যর্থতা ও নীতিগত জড়তাও আছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবাসনকে শুধু বিলাসী রিয়েল এস্টেট হিসেবে না দেখে সামাজিক ও উৎপাদনশীল খাত হিসেবেও দেখা জরুরি। এ খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলোও নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছে। তবে শুধু ব্যাংক খাতের একার পক্ষে আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। এছাড়া শহর ও শহরতলিগুলোয় জনসংখ্যার চাপ কমাতে নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

আবাসন খাতে প্রাইম ব্যাংক কী ধরনের বিনিয়োগ করছে? গ্রাহকরা প্রাইম ব্যাংক থেকে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন?

প্রাইম ব্যাংক গ্রাহকদের গৃহের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কনভেনশনাল ও শরিয়াহভিত্তিক উভয় ধারায় বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা দিয়ে আসছে। ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয়, নির্মাণ, সংস্কার বা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ প্রদান করার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যমান ঋণ বা বিনিয়োগ স্থানান্তরের (টেকওভার) সুবিধাও প্রদান করে প্রাইম ব্যাংক। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ সম্পত্তির মূল্য ও গ্রাহকের আয়ের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির সুবিধা থাকায় মাসিক পরিশোধ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। সুদ বা মুনাফার হার বাজারভিত্তিক; যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, তহবিল সংগ্রহ ব্যয় ও গ্রাহকের ক্রেডিট প্রোফাইল অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। প্রাইম ব্যাংক সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক হারেই আবাসন খাতে ঋণ বিতরণ করে থাকে।

প্রাইম ব্যাংকের ঋণ প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হয় কীভাবে?

ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণ ঋণের জন্য প্রাইম ব্যাংকে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে জমা হওয়ার পরই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের আয় যাচাই, সম্পত্তির মূল্যায়ন, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং ক্রেডিট হিস্ট্রি বিবেচনায় নেয়া হয়। সম্পূর্ণ ও সঠিক কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দেয়ার পর থেকে সাধারণত ৭-১৪ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ বা বিনিয়োগ অনুমোদন প্রদান করা সম্ভব হয়। এ ঋণগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ৩-২৫ বছর পর্যন্ত পরিশোধ সীমা নির্ধারণ করা হতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রাহকের বয়স, আয় সক্ষমতা ও ঋণ প্রকৃতি বিবেচনা করা হয়।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অবস্থা খুবই নাজুক। তুলনামূলক কম খেলাপি দেখা যায় আবাসন খাতে। এর পরও এ খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের হার নিম্নমুখী। কেন এ পরিস্থিতি?

পর্যাপ্ত জামানত থাকায় গৃহঋণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অর্থায়ন হিসেবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবতায় কিছু কাঠামোগত, নীতিগত ও বাজার-সংক্রান্ত কারণে দেশের ব্যাংকগুলো এ খাতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। গৃহঋণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হয়। জমির দলিল যাচাই, রেজিস্ট্রেশন জটিলতা, মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময়সূত্রতার কারণে আইনি ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। এছাড়া বাজারভিত্তিক সুদহার ওঠানামা করায় অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের কিস্তি পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় আবাসন বাজারে মূল্য ওঠানামার কারণে জামানতের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণেও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এসব দিক বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রেখে যোগ্য গ্রাহক নির্বাচন, যথাযথ মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করে দায়িত্বশীলভাবে গৃহঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহী হলেও অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে।

ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেয় প্রাইম ব্যাংক?

প্রাইম ব্যাংক ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আয়, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বাজারমূল্যের ভিত্তিতে অর্থায়ন করে থাকে। সাধারণত সম্পত্তির নিরূপিত মূল্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত গ্রাহকের যোগ্যতা ও পরিশোধের সক্ষমতা অনুযায়ী অর্থায়ন প্রদান করা হয়। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রাইম ব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীকে বাদ না দিয়ে সব যোগ্য গ্রাহককেই বিবেচনায় আনে। তবে নিয়মিত ও স্থিতিশীল আয় রয়েছে এমন চাকরিজীবী, পেশাজীবী, বাড়ির মালিক, মেরিনার ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। পাশাপাশি ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি ও স্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন থাকা গ্রাহকরাও তুলনামূলকভাবে দ্রুত সেবা পান।

গৃহঋণের সীমা ৪ কোটি টাকায় উন্নীতকরণ আবাসন খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন আপনি?

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নির্মাণ ব্যয়, জমির মূল্য এবং নগর এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত ২ কোটি টাকার সীমা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না। নতুন সীমা কার্যকর হওয়ায় মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রকৃত আবাসন চাহিদা আরো বাস্তবসম্মতভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকদের নিজস্ব মূলধনের চাপ কমবে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আবাসন খাতে অর্থায়ন বাড়বে। পাশাপাশি রিয়েল এস্টেট, নির্মাণসামগ্রী এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোয়ও ইতিবাচক গতি সঞ্চার হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সহায়ক। তবে একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং সম্পত্তির যথাযথ মূল্যায়নের ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন হবে; যাতে বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে টেকসই ও দায়িত্বশীল হোম লোন কার্যক্রম নিশ্চিত করা যায়।

হোম লোনের বাজারে আবাসন কোম্পানিগুলোরও ভূমিকা অনেক। এ খাতের সম্প্রসারণে কোম্পানিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মনে করেন আপনি?

আবাসন খাতের বাজার সম্প্রসারণকে টেকসই ও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে নিতে আবাসন কোম্পানিগুলোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন। ব্যাংক ও গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধির জন্য কোম্পানিগুলোকে প্রকল্পের জমির দলিল, মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য আইনগত নথি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত রাখা দরকার। আবাসন খাতের প্রধান গ্রাহক মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটের। বাজারের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য সাশ্রয়ী ও মধ্যম দামের আবাসন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প হস্তান্তর এবং নির্মাণমান বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ অর্থায়ন স্কিম, সহজ কিস্তি পরিকল্পনা ও তথ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো হলে গ্রাহকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, প্রকল্প-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রদান এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা নিশ্চিত করলে হোম লোন অনুমোদনের সময় কমবে। এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।