কান্তি কুমার সাহা। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আসছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি করপোরেট ব্যাংকিং, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্স কোম্পানিতে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। করপোরেট ব্যাংকিং হেড হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিটি ব্যাংক এনএতে এবং করপোরেট ব্যাংকিং ইউনিট হেড হিসাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে চিফ বিজনেস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসিতে। এছাড়া তিনি বিদেশী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এনডিবি ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন বাংলাদেশ লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) দায়িত্বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা এ ব্যাংকার যুক্তরাজ্যের নটিংহাম ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কর্মরত
আবাসন খাতে বর্তমানে আপনাদের কী কী পণ্য চালু রয়েছে এবং এসব ঋণের সুদহার কেমন?
আবাসন খাতে অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের তিন ধরনের প্রডাক্ট আছে। ফ্ল্যাট ক্রয় ঋণ, বাড়ি নির্মাণ ঋণ এবং বাড়ি সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঋণ। গ্রাহকের আয়, চাকরির ধরন, ক্রেডিট হিস্ট্রি এবং সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী ঋণের শর্ত নির্ধারণ করা হয়। আবাসন খাতে অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের ঋণ সুদহার বাজার পরিস্থিতি, তহবিল সংগ্রহ ব্যয় ও গ্রাহকের প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে। এ খাতে বর্তমানে আমাদের ঋণের সুদহার ১৩-১৪ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। যোগ্য ও নিয়মিত আয়ের গ্রাহকরা তুলনামূলকভাবে কম সুদে এবং দীর্ঘ মেয়াদে এ ঋণ সুবিধা পান।
এ প্রডাক্টগুলোর ঋণ সুবিধা কেমন? সর্বোচ্চ কত টাকা ও কতদিন মেয়াদে এ ঋণ দেন আপনারা? এক্ষেত্রে সুদহার স্থির থাকে নাকি ভাসমান?
আমাদের আবাসন ঋণের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। ৬৫ বছর পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ আমাদের ঋণের জন্য আবেদন করতে পারে। গ্রাহকের বয়স, আয়, চাকরির স্থায়িত্ব, ব্যবসায়িক আয় এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিই আমরা। টাকার অংক নির্ভর করে ফ্ল্যাটের অবস্থান, ডেভেলপার, বাজারমূল্য, গ্রাহকের আয় ও ক্রেডিট প্রোফাইলের ওপর। সাধারণভাবে আমাদের আবাসন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ১০ কোটি টাকা (বাণিজ্যিক) পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা গ্রাহকের যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। এ ধরনের ঋণে সুদহার ভাসমান হলেও তা বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণই হয়। মাঝেমধ্যে হয়তো তহবিল সংগ্রহ ব্যয় পরিবর্তনের কারণেও সুদহার ওঠানামা করতে পারে। তবে আমরা সুদহার সমন্বয়টি যৌক্তিক, ধাপে ধাপে এবং গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য কিস্তি পুনর্গঠন, মেয়াদ বাড়ানো অথবা গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে থাকি, যাতে তারা হঠাৎ বাড়তি চাপের মুখে না পড়েন। শুধু ঋণ আদায় নয়, গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্ক বজায় রাখাও আমাদের লক্ষ্য।
ঋণ আবেদন করার পর অর্থ ছাড় করতে কত সময় প্রয়োজন হয় আপনাদের?
গ্রাহকের সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে পাওয়া গেলে এবং সম্পত্তি যাচাই সম্পন্ন হলে সাধারণত ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ আবেদন জমা দেয়ার ১৫-৩০ কর্মদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদন ও অর্থছাড় সম্পন্ন করা হয়। তবে যদি সম্পত্তির কাগজ যাচাই, ভ্যালুয়েশন বা আইনগত ক্লিয়ারেন্সে অতিরিক্ত সময় লাগে, তাহলে সময় কিছুটা বাড়তে পারে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি যাতে গ্রাহক দ্রুততম সময়ে এবং ঝামেলাহীনভাবে ঋণের অর্থ পেতে পারেন।
পর্যাপ্ত জামানত থাকায় গৃহঋণ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। এর পরও দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহবোধ করছে না কেন?
এটা সত্য যে, জামানতভিত্তিক হওয়ায় গৃহঋণ তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ। তবে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত বাস্তবতায় এ খাতে কিছু কাঠামোগত ঝুঁকিও রয়েছে। ভূমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা ও টাইটেল যাচাই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় আইনি ঝুঁকি ও জালিয়াতির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রিকভারি ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আবার এ খাতের ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় প্রায় ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। কারণ, অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল কাঠামো মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি। আবার খেলাপি হলে মর্টগেজকৃত সম্পত্তি দখল ও বিক্রয়ের আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। এতে জামানত থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি রয়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়েল এস্টেট বাজারের মূল্য ওঠানামাও ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক করেছে। এসব কারণেই দেশে গৃহঋণের ভালো একটি বাজার তৈরি হয়নি। তবে ভূমি রেজিস্ট্রেশন, টাইটেল ইন্স্যুরেন্স ও দ্রুত ফোরক্লোজার-সংক্রান্ত নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে এবং তা ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা গেলে এ খাতে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
আবাসন খাতে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের প্রডাক্টগুলো বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিপরীতমুখী অবস্থান কেন?
ব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা পিছিয়ে থাকার কারণ হলো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে। আবার ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্ক বেশি হওয়ায় গ্রাহকরা ব্যাংকের প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখায়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গৃহঋণ সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ব্যাংকের জন্য ইতিবাচক হলেও ফাইন্যান্স কোম্পানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এরপরও দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গৃহঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে ডিবিএইচ পিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসির মতো অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা শুধু আবাসন খাতেই ঋণ দিয়ে থাকে। তাদের পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গৃহঋণ চালু করেছে।
গৃহঋণে অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের খেলাপির হার কেমন? কোন শ্রেণীর গ্রাহক বেশি খেলাপি হচ্ছেন?
সামগ্রিকভাবে আমাদের আবাসন খাতের ঋণের পোর্টফোলিওর খেলাপির হার অন্যান্য ভোক্তা ঋণের তুলনায় কম। এ খাতে আমাদের খেলাপি ঋণের হার দশমিক ৬২ শতাংশ। সম্পদের জামানতের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের কারণে এ খাতে খেলাপি হার তুলনামূলক কম। এরপরও আয়ের ওঠানামা আছে এমন নতুন উদ্যোক্তা ও শুধু রিয়েল এস্টেটনির্ভর আয়ের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কিছুটা খেলাপি দেখা যায়।
আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?
গৃহঋণের বাজার সম্প্রসারণে শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপই নয়, বরং আবাসন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম ও নীতিমালাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডেভেলপার কোম্পানিগুলো যদি সম্পদের মালিকানা ও নথিপত্রে কোনো ঝুঁকি না রাখে, তাহলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ দিতে পারবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফ্ল্যাট বা বাড়ি হস্তান্তর করলে ও প্রকল্পের গুণমান নিশ্চিত হলে গ্রাহক ও ঋণদাতার আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া গ্রাহক ও ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকি কমাতে স্পষ্ট বিক্রয় ও ক্রয় চুক্তি রাখা জরুরি। সবচেয়ে বড় বিষয়, তারল্যের সমস্যা কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন করার কোনো বিকল্প নেই।





