সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে বেশ চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন?

ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। ধীরে ধীরে আমরা স্বাভাবিক অবস্থার দিকেই যাচ্ছি। আগামী এক মাসের মধ্যে আমাদের তারল্য সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে এবং আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাব। শুধু এসআইবিএলে না, ব্যাংক খাতে রাষ্ট্রীয় মদদে যা ক্ষতি হয়েছে, এটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। এ ধরনের ঘটনা অন্যান্য যেসব ব্যাংকে ঘটেছে, আমরা তাদের চেয়ে অনেক ভালো আছি। শিল্প খাতে আমাদের খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম। এস আলম ও তার সহযোগীদের কাছে আমাদের ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার মতো ঋণ আছে। তারা সহযোগিতা না করলেও আমাদের কাছে তাদের যেসব শেয়ার আছে সেগুলোর থেকে টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। আমাদের আরেকটা দিক হচ্ছে ‘আনট্রেসড’ কোনো ঋণ নেই। ফলে কেউ সহযোগিতা না করলে তাদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। আমরা ব্যাংকে সুশাসন ও অন্যান্য নিয়মনীতি সক্রিয়ভাবে কার্যকর করা শুরু করেছি।

খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি?

আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর (২৮ আগস্ট, ২০২৪) ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মন্দ ও শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে এস আলমের কাছ থেকে ৩৮১ কোটি টাকার বেশি আদায় করা হয়েছে। আমাদের ঋণ আদায়ে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনে আমরা আইনের সহায়তা নিচ্ছি। একটা মামলা হওয়ার পর রায় পেতে যদি ৮-১০ বছর চলে যায়, সেক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকরের দিকগুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও আমাদের এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।

গ্রাহকের আস্থা অর্জনে আপনারা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

গ্রাহকের আস্থা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশাসন। কিন্তু ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলেই তা সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না। এজন্য আমরা গ্রাহক সমাবেশ করছি। ব্যাংক কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের আস্থাহীনতা দূর করার চেষ্টা করছেন এবং আমরা ভালো আমানত পাচ্ছি সাম্প্রতিক সময়ে। রেমিট্যান্স আসা মাঝখানে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সত্য। কিন্তু এখন আবার রেমিট্যান্স আসা শুরু করেছে। আশা করছি অচিরেই আমরা গ্রাহকদের আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে পারব।

অনিয়ম বন্ধ করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

অনিয়ম বন্ধ করার জন্য প্রতিটা পদক্ষেপেই আমরা কাজ করছি। অনেক সময় ভুল হয়ে যেতে পারে যে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় হয়তো কিছু খেয়াল করা সম্ভব হয়নি, এমন হতে পারে। কিন্তু আমরা চাপের মুখে কোনো কাজ করি না। আমরা সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য বলেছি। তাদের প্রয়োজনে ঋণ শ্রেণী পুনঃতফসিল করার জন্য বলছি। কিন্তু আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করছি না।

ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থা ছিল, যা বিগত সময়ের অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় কী?

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্স একসময় প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর চেয়ে ভালো ছিল। এ অবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। গ্রাহকদের আস্থা ছিল সে সময়। গত কয়েক বছরে যখন ব্যাংকগুলো দখল করে অনিয়ম করা হয়েছে, তখন গ্রাহকের এ আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপরই ব্যাংকগুলোয় অদক্ষতা বাড়ে। এখন বলতে হয় যে ক্ষতিটা হয়েছে, সেটা নিঃসন্দেহে বিশাল। এটা কাটিয়ে উঠে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে। এক-দুই বছরে হয়ে যাবে না। কিন্তু এটা সম্ভব। আমাদের আইনকানুন ও মনিটরিং যদি বদলায়, আশা করি একটা সময়ে আমরা আগের অবস্থানে ফিরে যাব। বর্তমান গভর্নর খুবই আন্তরিক। তিনিও এ বিষয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। আশা করি ভবিষ্যতেও সহযোগিতা পাব।

আপনারা দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে অগ্রগতি কী?

এটা শেষ হয়েছে। আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে এ মুহূর্তে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না। কারণ এটা অভ্যন্তরীণ। আপাতত অভ্যন্তরেই থাকুক। তবে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা বার্তা দিচ্ছি যে অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি এবং অন্য কেউ যাতে অনিয়ম করার সাহস না পায়, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি আমরা।

এসআইবিএল নিয়ে বর্তমান পর্ষদের পরিকল্পনা কী?

আমাদের কয়েকটা উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত কমপ্লায়েন্স ঠিক করা। কমপ্লায়েন্সে আবার দুটা বিষয় আছে। সবগুলো (ইসলামী) ব্যাংকই শরিয়াহভিত্তিক। কিন্তু সেখানে শরিয়াহ কতটুকু অনুসরণ করা হয়, সেটা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে। সেজন্য আমরা শরিয়াহ বোর্ড পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে করেছি। ২০১৭ সালের পরে শরিয়াহ বোর্ডকে কাজ করতে দেয়া হয়নি। সেজন্য শরিয়াহ বিষয়ে পড়াশোনা করা ও ডিগ্রিধারী লোকদের নিয়ে আমরা নতুন বোর্ড গঠন করেছি। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য পুরোপুরি সমর্থন দেয়া হচ্ছে। যাতে আমরা এ ব্যাংককে পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে ব্যাংকিং রেগুলেশন। নিয়মনীতি যাতে কোনোভাবে ভঙ্গ না হয়, সে বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সচেষ্ট। হ্যাঁ, অজ্ঞাতসারে কোনো তথ্য জানার ঘাটতি বা প্রতিবেদনে ভুল হতে পারে। কিন্তু শতভাগ কমপ্লায়েন্স ও সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।

সামনের দিনগুলোয় দেশের ব্যাংক খাত কেমন যাবে বলে মনে করছেন?

গত বছর পর্যন্ত ব্যাংককে যে অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটার একটা প্রতিফলন হয়তো থাকবে। এটা সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই হবে। তবে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের জন্য এ সময়টা টার্নিং পয়েন্ট। আমরা একটা তলানিতে চলে গিয়েছিলাম। এখন সেখান থেকে আমরা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাব। ২০২৪ সালের পারফরম্যান্স তলানিতে ছিল। কিন্তু আমরা খেলাপি ঋণ কমিয়ে একটা সন্তোষজনক অবস্থায় নিয়ে আসতে পারব, ইনশা আল্লাহ।