সম্ভাবনার তুলনায় দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কতটুকু এগিয়েছে বলে মনে করছেন?
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে ইসলামিক ব্যাংকিং এরই মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। ইসলামিক ব্যাংকিং যাত্রা শুরুর কাল থেকে দেশের উন্নয়নে বিশেষভাবে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে এ খাতে সম্ভাবনা বিশাল, তবে তা পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং সুদমুক্ত আর্থিক লেনদেনের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি। এছাড়া ইসলামিক ব্যাংকিং শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয় বরং ন্যায়সংগত মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সত্তরের দশকে ইসলামিক ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হতে শুরু করলে বাংলাদেশেও এ ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়। এর পর থেকে খাতটি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে এবং বর্তমানে মোট ব্যাংক খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় এসেছে। প্রায় সব বড় ব্যাংকই এখন ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো বা সম্পূর্ণ ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে, যা এর সম্ভাবনার দিকটি স্পষ্ট করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন ও পণ্য বৈচিত্র্যের অভাব ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার পথে বাধার সৃষ্টি করছে। তবে যদি সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, শরিয়াহ পরিপালন কঠোরভাবে করা হয় এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে ইসলামিক ব্যাংকিং তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
দেশের ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামিক ব্যাংকিং খাত বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং গ্রাহকদের কাছে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব বড় ব্যাংকই ইসলামী ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে এবং ইসলামী ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংকে প্রায় তিন দশক ধরেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। ১৯৯৫ সালে ব্যাংকটির ইসলামী পরিষেবা শুরু। বর্তমানে ব্যাংকের পাঁচটি শাখার মাধ্যমে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘হাসানাহ’-এর কার্যক্রম চলছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রাইম ব্যাংকের ডুয়েল ব্যাংকিং মডেল অন্যান্য অনেক ব্যাংকই এখন অনুসরণ করছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইসলামী ব্যাংকগুলোর সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে করপোরেট গভর্ন্যান্স, তারল্য সংকট এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব কারণে কিছুটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তা আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতি বিনির্মাণে ইসলামিক ব্যাংকিং আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
গত বছরের শেষের দিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের আমানত তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি?
গত বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশের কিছু ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে তারল্য সংকট দেখা দেয়, যা গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং অনেকে তাদের আমানত তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখান। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংকট মোকাবেলায় বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে তারল্য সহায়তা প্রদান, ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা এবং তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা। ফলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
আপনার ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি কেমন?
প্রাইম ব্যাংক শুরু থেকেই টেকসই তারল্য ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আসছে। যার ধারাবিহকতায় প্রাইম ব্যাংক সবসময় তারল্য ব্যবস্থাপনায় সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বিভিন্ন তারল্য ব্যবস্থাপনা সূচক এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তারল্য নির্দেশক সূচকে প্রাইম ব্যাংক শক্তিশালী অবস্থানে আছে।
উল্লেখ্য, দক্ষ ও যথাযথ তারল্য ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে প্রাইম ব্যাংক নিরাপদ এবং শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রাহকদের কাছে সর্বোচ্চ আস্থার জায়গা করে নিতে পেরেছে।
বর্তমানে কোন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে?
বর্তমানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে করপোরেট বিনিয়োগ, এসএমই (ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ) বিনিয়োগ এবং রিটেইল (খুচরা) বিনিয়োগের ওপর। প্রাইম ব্যাংক এ তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর পাশাপাশি প্রাইম ব্যাংক তাদের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সাপ্লাই চেইন ইনভেস্টমেন্ট এবং পেরোল কাস্টমারদের ক্ষুদ্র বিনিয়োগের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে তারা ইসলামিক ব্যাংকিং সেগমেন্টের অধীনে হাসানাহ ইসলামিক ব্যাংকিং পেরোল এবং হাসানাহ ইসলামিক ব্যাংকিং সাপ্লাই চেইন ইনভেস্টমেন্ট নামক বিশেষ বিনিয়োগ পণ্য ও সেবা চালু করেছে।
এ উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে প্রাইম ব্যাংক ব্যক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করছে। বিশেষ করে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় থাকা গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে, যা অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আপনার ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই?
বাংলাদেশে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার বিস্তারে প্রাইম ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামিক ব্যাংকিং প্রচার ও প্রসারে প্রাইম ব্যাংক শুরু থেকে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। শরিয়াহ পরিপালন ও ক্রমাগত প্রশিক্ষণ দ্বারা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। ইসলামিক ব্যাংকিংকে কীভাবে আরো ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা সম্প্রতি ইসলামিক পেরোল ব্যাংকিং সেবা চালু করেছি, যা এসএমই ও করপোরেট গ্রাহকদের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার চাহিদা পূরণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আশা করা যায়, অচিরেই ইসলামিক ব্যাংকিং সেক্টরে প্রাইম ব্যাংক নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করবে।





