মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কাছাকাছি সময়েই ইসলামী ব্যাংকিং শুরু হয়। তারা অনেক উন্নতি করেছে এ খাতে। সে তুলনায় আমাদের মানুষ বেশি, চাহিদা বেশি, কিন্তু সে অনুপাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রসার না ঘটার কারণ কী বলে মনে করছেন?

আমি যেভাবে চিন্তা করি সেটি হচ্ছে, একটি দেশের যেকোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে সেটি নির্ভর করে সে দেশের আইনপ্রণেতাদের নিয়মনীতির ওপর। মালয়েশিয়ায় নিশ্চয়ই সেভাবে নিয়মনীতি করেছে, সেগুলো ফলোআপ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করেছে। আমরা হয়তো সেভাবে করিনি। করলে হবে না কেন? আমি যতটুকু জানি, ১৯৮০-৮২ সালের দিকে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। কিন্তু মালয়েশিয়া সেখান থেকে কোথায় উঠে গেছে। নিয়মনীতি, সরকারের পক্ষ থেকে সে ধরনের সমর্থন, রুলস রেগুলেশন এ দেশে ছিল না। ফলে আমরা করতে পারিনি। কারণ তারাও মানুষ আমরাও মানুষ, তারাও মুসলমান, আমরাও মুসলমান।

এক্সিম ব্যাংকের কার্যক্রম এখন কেমন চলছে? সার্বিকভাবে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম এখন কেমন চলছে?

গত বছরের আগস্টের পর ১২-১৪টি ব্যাংক খুবই সমস্যার মধ্যে ছিল। কী কী কারণে এ সমস্যাগুলো হয়েছে তা সবারই জানা। এগুলো বারবার বলাও ঠিক নয়। সে জায়গা থেকে ধীরে ধীরে এখন সব ব্যাংকই ভালো করছে। আমরা প্রতি সপ্তাহে মিটিং করছি। সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে যারা ব্যবসা করেন তাদের মোটিভেট করার মাধ্যমে আমরা একটা ভালো জায়গায় চলে এসেছি। এখন আমাদের কোনো সমস্যা নেই। প্রতি মাসে আমাদের প্রচুর ভালো ডিপোজিট আসছে। রিকভারিটাও ভালো হচ্ছে। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, ভালো অবস্থায় আছি।

আপনি যদি ২০০৫ থেকে ২০০৮ সময়কালটা লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের চার-পাঁচটা হাতে গোনা ভালো ব্যাংকের মধ্যে একটা ছিল। কালের পরিক্রমায় আমাদের কিছু সমস্যা হয়ে গিয়েছিল। সেটি আপনারাও জানেন, দেশবাসী সবাই জানেন। আগস্টের পর আমরা একটা মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়ে যাই। তারপর অক্টোবর-নভেম্বর থেকে একটু একটু করে উন্নতি শুরু হয় এবং ডিসেম্বর থেকে খুব ভালো করছি। জানুয়ারিতে এসে আমরা খুবই খুশি, কারণ এক্সিম ব্যাংক এখন খুবই ভালো করছে।

দ্বিতীয়ত ইসলামী ব্যাংকিং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং। ইসলামী ব্যাংকিং এ দেশে প্রথম চালু করে ইসলামী ব্যাংক। সেটা ১৯৮০ সালের দিকে। তখন পদ্ধতিটা ছিল—আপনি ব্যবসায়ী, আপনি ব্যবসা করবেন। আমি ব্যাংক থেকে ৬০, ৫০, ৪০ বা ৩০ শতাংশ দিলাম। আপনি ৫০, ৬০, ৪০ শতাংশ দিলেন। ব্যবসায় যে লাভ হবে, খরচের পর সে লাভ থেকে আপনার অংশ অনুযায়ী আপনি পাবেন, আমার অংশ অনুযায়ী আমি পাব। এটাকে মুদারাবা পদ্ধতি বলে। কিন্তু দেখা গেল, সে সময় ইসলামী ব্যাংকের ৮০-৯০ শতাংশই লস হচ্ছে। অভ্যাসগত কারণে ব্যবসায়ীরা এটি করেছেন। ফলে দুই বছর পর ইসলামী ব্যাংক মুদারাবা পদ্ধতি থেকে সরে এসে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অন্যান্য পদ্ধতিতে জোর দেয় এবং আল্লাহর রহমতে সে ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংক ভালো করতে থাকে।

ইসলামী ব্যাংকের সাফল্য দেখে অন্যান্য অনেক ব্যাংক তখন ইসলামী শরিয়াহ ব্যবস্থায় চলে আসতে থাকে। এক্সিম ব্যাংকও শুরুতে ইসলামী শরিয়াহ ব্যাংক হিসেবে ছিল না। কিন্তু প্রতিষ্ঠার দুই বা তিন বছর পর ইসলামী শরিয়াহতে চলে এসেছে। আমাদের দেশের অনেক মানুষ চায় ইসলামী শরিয়াহর ভিত্তিতে ব্যবসা করতে। অনেকেই ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে টাকা রাখে, কিন্তু প্রফিট নেন না। ধার্মিক অনেক মানুষ এভাবে চিন্তা করেন। এরপর ২০০৯-১০ সালের পর থেকেই কেন যেন (বুঝতেই পারছেন) ব্যবস্থাটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেছে।

এক্সিম ব্যাংক নিয়ে আপনাদের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?

একটা বিষয় তো সত্যিই ঘটেছে, প্রচুর টাকা বিভিন্নভাবে চলে গেছে। শুধু আমাদের ব্যাংক নয়, প্রত্যেক ব্যাংক থেকেই গেছে। কারো বেশি, কারো কম। আমরা এটি উতরাতে পেরেছি। আমরা এখন বিভিন্ন সেল করে দিয়েছি। এসব সেলের মাধ্যমে মনিটরিং করে রিকভার করছি। আমি আশা করি, ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা খুব ভালো জায়গায় চলে যাব। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের দিকে আমরা হয়তো আমাদের আগের অবস্থা, যেটি ২০০৬-০৭ সালের দিকে ছিল, সেখানে চলে যাব। আমাদের নির্বাহী ও কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আপনি তো ব্যাংক ছাড়াও পোশাক খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। এ খাতটি দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। আপনার দৃষ্টিতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন যাচ্ছে?

আগেই বলেছি সবকিছু নিয়মনীতির মধ্যে চলে আসছে, দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। তখন তৈরি পোশাকসহ সব শিল্প ভালো অবস্থানে চলে আসবে। যখনই বিভিন্ন নিয়মনীতি হঠাৎ করে পরিবর্তন হয় তখন অসুবিধা হয়। আর আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও এ ব্যাপারে আরো সক্রিয় হওয়া উচিত। রফতানি কীভাবে সহজ হয়, কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দেয়া উচিত। আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে হংকং যেতে ভিসা লাগত না। আর ভিসার জন্য দিলেও পরদিন হয়ে যেত। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ভারত কিন্তু তারটা চালু করে ফেলেছে এক মাসের মধ্যে। আমরা এখনো ভিসা করতে পারি না। দুই মাস, আড়াই মাস লেগে যায়। চায়নার ভিসা পেতে আমাদের কষ্ট হয়।

অন্তত যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তাদের ভিসা সহজে করার সুবিধা প্রয়োজন, এটি ব্যবসার একটা অংশ হয়ে গেছে। এ সমস্যা তো আমরা সমাধান করতে পারি না। এটি করতে হবে সরকারকে। আমাদের বেশির ভাগ ক্রেতা হংকং বা চায়নায় দেখা করতে চায়, তখন আমাদের তো যেতেই হয়। ফলে ভিসা নিয়ে একটা বড় সমস্যা হয়ে যায়। যেমন আমার একজন ক্রেতা আমাকে যাওয়ার জন্য বললেন। আমি বললাম, আমার তো ভিসা পেতেই দুই-আড়াই মাস লেগে যাবে। তখন তার সঙ্গে অনলাইনে অনেকগুলো মিটিং করতে হয়েছে। এখন সেখানে গেলে হয়তো বিষয়গুলো আরো অনেক সহজ হতো। এ সমস্যাগুলোর সমাধান করলে আমাদের জন্য ভালো হবে।

তার মধ্যে এখন ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ বা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। এটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি দেখেন, ১০ কোটি টাকা ঋণ নিলে দেড় কোটি টাকা দিতে হবে বছর শেষে। এর সঙ্গে কোম্পানির খরচ আছে আরো দেড়-দুই কোটি টাকা। তাহলে ৩৫-৪০ শতাংশ একটি ব্যবসায় লাভ করতে হবে। এটা কি সম্ভব?

এটি শুধু তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে নয়, বরং আপনি যে ব্যবসাই করেন না কেন, কোন ব্যবসায় ৩৫-৪০ শতাংশ লাভ করতে পারবেন? ডলারের দাম বাড়ার কারণে তৈরি পোশাক খাত এখনো টিকে আছে, না হলে সব কারখানা এত দিনে বন্ধ হয়ে যেত। ক্রেতারা আমাকে বলেন, তোমার তো ডলারের দাম বেড়েছে। ফলে তুমি অ্যাডজাস্ট করে নাও। তারা সেটার সুযোগ নিয়েছে। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এরই মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে গেছে। এত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা সহজ নয়।

বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কারণে অনেক ব্যবসা বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর হচ্ছে। বাংলাদেশ কি সেই সুযোগ নিতে পারবে?

স্থানান্তর হতে পারে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে। এগুলো সবই অনুমাননির্ভর এখনো। কিন্তু যদি হয়ও, দাম তো রাতারাতি বেড়ে যাবে না। ইউটিলিটি বিল বাড়ছে, জ্বালানির দাম বাড়ছে। বহু ফ্যাক্টরির ব্যাংকের লোন শুধু বাড়ছে। প্রতিটি ব্যাংকে খোঁজ নেন ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবসায়ীর লোন বাড়ছে শুধু। ব্যাংক কত দিন এটি সহ্য করবে? তারা কত লস দেবে? কার টাকা লস দেবে? এসব তো আমানতকারীদের টাকা। তারা তো কাউকে ছাড়বে না।