দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যয়ন জানতে চাই।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম এখনো বেশ জনপ্রিয়। দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং পছন্দ করে শরিয়াহ বিশ্বাস ও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে এ ব্যাংক ব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্যাংকিং অঙ্গনে গৌরবময় অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের নজিরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, দখলদারি, লুটপাট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দেশের আর্থিক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সব ইসলামী ব্যাংক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানত, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অংশীদারত্ব রয়েছে। ব্যাংক খাতে মোট আমানতের প্রায় ৩০ শতাংশ ও বিনিয়োগের ২৮ শতাংশ শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা নির্ভর। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এ ধারার ব্যাংকিংয়ের অংশীদারিত্ব অনুরূপ। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবদান কনভেনশনাল ব্যাংকের তুলনায় বেশি।
গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইউনিয়ন ব্যাংক পর্ষদের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?
ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা ইসলামী শরিয়াহ্র পূর্ণ পরিপালন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে ইসলামী ধারার ব্যাংকিং তার পূর্ব গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারবে। গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রতিটি শাখায় গ্রাহক সমাবেশ করা হয়েছে। লুটপাটের কারণে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল তা এরই মধ্যে কটিয়ে উঠতে পেরেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা, খেলাপি বিনিয়োগ আদায় ও নতুন আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে গ্রাহকদের চাহিদা পুরণ করা হচ্ছে। এ কারণে ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এছাড়া নতুন নতুন আমানত ও সঞ্চয় প্রকল্প চালুকরণ, নতুন বিনিয়োগ প্রদান, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি বিনিয়োগ আদায়, বৈদেশিক বাণিজ্য চালুর মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
অতীতে সংঘটিত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
এ মুহূর্তে গোটা ব্যাংক খাতের সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল। এ সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো পরিপূর্ণভাবে শরিয়াহ পরিপালনের ব্যাপারে নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। জনগণের আমানত মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আমরা তা ঘুরিয়ে দিতে চাই। এরই মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ দেশের জনমানুষের কল্যাণে প্রবাহিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের বিতরণকৃত বিনিয়োগ আদায় ও খেলাপির হার কমিয়ে আনার বিষয়ে আপনাদের গৃহীত উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাই।
খেলাপি বিনিয়োগ আদায়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি বিনিয়োগ আদায় হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় খেলাপি গ্রাহকদের জামানতকৃত সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। আশা করি অদূরভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি বিনিয়োগ আদায় হবে, ইনশা আল্লাহ। তাছাড়া সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে খেলাপি গ্রাহকদের সম্পদ জব্দ, শেয়ার জব্দসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করি এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে ইউনিয়ন ব্যাংকসহ ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো খেলাপি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে আসবে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন পরিস্থিতির উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক দুরবস্থার জন্য সুশাসনের ঘাটতি অন্যতম কারণ। এর জন্য ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখা পর্যায়ের সর্বস্তরে যেন সুশাসন নিশ্চিত করা যায় সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিপূর্ণভাবে পালনের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বেশ চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে আপনাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই?
সুদমুক্ত ও কল্যাণমুখী আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আপামর জনসাধারণের আন্তরিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর বিগত ৪২ বছরে দেশের ব্যাংক সেক্টরে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সঙ্গে ১১টি কনভেনশনাল ব্যাংক তাদের ইসলামী ব্যাংকের শাখা স্থাপন করে ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করছে। পাশাপাশি আরো ১৪-১৫টি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটিয়েছে।
ভবিষ্যতে ইউনিয়ন ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের চাহিদা মাথায় রেখে আমানত, বিনিয়োগ তথা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সব পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে শরিয়াহ পরিপালনের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এরই মধ্যে শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক আমানত প্রকল্প, এমএমই কৃষি খাতসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের বিনিয়োগ বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রবাহ খুবই কম। এটি বাড়াতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
অর্থনৈতিক দুরবস্থায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। প্রবাসীদের অতি কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ মজবুত হয়েছে অর্থনীতির ভিত। প্রবাসীরা যাতে সহজে ঝামেলা ছাড়াই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে পারেন, তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা জরুরি। যদিও বিগত সরকার পতনের পর গত কয়েক মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আহরণ বেড়েছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে ব্যাংকের শাখাগুলো নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হুন্ডিকে নিরুৎসাহী করতে শাখা ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।





