বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন ব্যবসাগুলো ভালো করছে আর কোনগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন?

নির্দিষ্ট করে বললে পোশাক শিল্প ভালো করছে এবং এর ভবিষ্যৎ ভালো আছে। আবাসন খাতের ব্যবসা কিছুটা নিম্নমুখী। তবে এটা কেটে যাবে। এ খাতে মানুষ এখনো পরিস্থিতি কোনদিকে যায় সে অপেক্ষায় আছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিমেন্ট, স্টিল এগুলোর ব্যবসাও মন্দা যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা রয়েছে। চাল-ডালের আমদানি বেড়েছে। আবার কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সারও কিন্তু আমদানি হচ্ছে। গত দুই-তিন বছরে আমরা সারও আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলেছি। জ্বালানি খাতেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান দুটি উৎসের একটা রেমিট্যান্স। এ রেমিট্যান্সের বড় একটা অংশ অবৈধপথে আসছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে আমি মনে করি সরকার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এগোলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি রফতানির দিকেও নজর দিতে হবে।

ঢাকা ব্যাংকের বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।

আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই গ্রাহককে। তাদের আমানত আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে আমানত যাতে ঠিকঠাক জায়গায় বিনিয়োগ হয়ে ফেরত আসে, সে দিকটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি। সেজন্য আমরা নতুন ব্যবসা শুরু করার চেয়ে বর্তমান ব্যবসাকে সুন্দরভাব চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিই। পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর মানুষের আস্থার জায়গায়ও পরিবর্তন হয়েছে। তারা ভালো ও খারাপ ব্যাংক চিহ্নিত করতে পেরেছে। মানুষ আগে কোন ব্যাংক থেকে কত বেশি সুদ পাবে, সেটা ভাবত। এখন ভাবে কোন ব্যাংকে টাকাটা নিরাপদ। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব করছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ অবস্থা কোন দিকে গড়ায় সেটি পর্যবেক্ষণ করে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের পর পুরো পরিস্থিতিই বদলে যাবে।

রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে ঢাকা ব্যাংক কী উদ্যোগ নিয়েছে?

সম্প্রতি আমাদের একটা দল মধ্যপ্রাচ্যে গেছে। ওখানকার মানি এক্সচেঞ্জারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে। সম্প্রতি আমরা লক্ষ করেছি যে রেমিট্যান্স আসা বড় বড় যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই, সেখানে আমরা সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছি। আমরা প্রবাসীদের নিয়ে মিটিং করার চেষ্টা করছি। সামনে আবার যাব। একটা মেলা করার চেষ্টা করছি। দূতাবাসের সহায়তা নিয়ে আমরা প্রবাসীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি যেন তারা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠায়। গত ছয় মাসে আমাদের কয়েকটা দল দেশের বাইরে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আনা একটা এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে আমাদের সভা হয়েছে। তারাও ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

রেমিট্যান্স আহরণকারী শীর্ষ ব্যাংক হওয়ার কোনো লক্ষ্য আছে কি?

শীর্ষস্থানে তো রাতারাতি যাওয়া সম্ভব হবে না, এটা একটু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু আমরা শুধু রেমিট্যান্স না, আগামী বছরের মধ্যে আমরা সব সূচকেই শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে থাকার লক্ষ্যে কাজ করছি।

কোন খাতে আপনাদের ঋণ সবচেয়ে বেশি?

আমরা মূলত শিল্প খাতে বেশি ঋণ দিয়েছি। শুধু আমাদের না, পুরো ব্যাংক খাতেরই ৬০-৭০ শতাংশ বিনিয়োগ শিল্প খাতে। বর্তমানে শিল্প খাতে আমাদের ৭০ শতাংশ ঋণ রয়েছে। আমরা এ খাতে আর ঋণ বাড়াতে চাই না। বরং কৃষি, এসএমই, ব্যক্তিগত কিংবা রিটেইল ঋণের দিকে বাড়তি নজর দেয়ার চেষ্টা করছি। নির্দিষ্ট কোনো একটা খাতের ওপর ৮০ বা ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল হতে চাই না। তাহলে ঋণঝুঁকি কিছুটা কমানো যাবে।

ব্যাংকগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করে থাকে। এ বিষয়টি ঢাকা ব্যাংক কীভাবে ব্যবস্থাপনা করছে?

এটা নির্ভর করে মূলত ব্যবসার ওপর। সরকারি ব্যাংক ২০ বছর পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। আমরা কিন্তু ২০ বছর আমানতই রাখতে পারি না। আমাদের ‘‌বাস্কেট টু বাস্কেট’ মেলাতে হয়। আমি যখন তিন মাসের জন্য আমানত নিচ্ছি, তখন আমাকে ভাবতে হবে যে এ আমানতটা আমি তিন মাসের জন্য কোন খাতে বিনিয়োগ করব। যেসব আমানত দীর্ঘমেয়াদে হচ্ছে সেগুলো আমরা শিল্পে বিনিয়োগ করছি। স্বল্পমেয়াদিগুলো ট্রেডিং ফার্মগুলোতে দিচ্ছি। এ কারণে আমাদের ‘‌বাস্কেট টু বাস্কেট’ আলাদা করা হয়। অনেকে এত কিছু না ভেবেই কয়েক বছর মেয়াদে শিল্পে বিনিয়োগ করে ফেলে, তখন স্বল্পমেয়াদে আমানতকারীর টাকা নিয়ে সমস্যা হয়ে যায়। এ বিষয়ে ঢাকা ব্যাংকের নির্দিষ্ট সময় পরপর সভা হয়। সেখানে আমরা বাস্কেট নিয়ে আলোচনা করি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে একটা নির্দেশিকা আছে। আমরা সেটা অনুসরণ করি।

আপনাদের শাখাভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম আছে। সে বিষয়ে একটু জানতে চাই।

আমরা মূলত প্রচলিত ব্যাংকিং পরিচালনা করি। তবে প্রতিটি শাখায় ইসলামী ব্যাংকিং উইং আছে। সেখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সেবাগুলো সরবরাহ করা হয়। অনেকে এটাকে পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিং করার কথা বলছে। আমি মনে করি, যদি প্রচলিত ও ইসলামী ব্যাংকিং দুইটাই রাখা যায়, তাহলে প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহজ হয়। আমাদের ইসলামিক পোর্টফেলিও যে একদমই নেই, তা নয়। ইসলামিক ডিপোজিটের বিপরীতে ইসলামিক ফাইন্যান্সিংও আছে। ওই জায়গাটা বাড়ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, আমাদের দুইটা থাকাই ভালো। তাহলে গ্রাহকের পছন্দ করার সুযোগ থাকে। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে এ বছর আমরা আরো বড় পরিসরে চিন্তা করছি।

বৈদেশিক বাণিজ্যে আপনাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই।

গত এক বছরে আমরা প্রায় ৫ বিলিয়নের মতো আমদানি-রফতানির ব্যবসা করেছি। মাঝখানে ডলার সংকটের কারণে এটি কিছুটা কমে গিয়েছিল। এ বছর আমরা ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যাওয়ার প্রত্যাশা করছি।

সম্প্রতি ব্যাংক খাতে নানা পরিবর্তন আসছে। এক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা যাচ্ছে। সামনের বছরগুলোয় দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

বর্তমান সরকার ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রটা দেখতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত চিত্র উঠে এলে খেলাপি ঋণ আরো বাড়বে। এটার কিন্তু একটা বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। তবে সরকার যদি খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য কিছু সুযোগ করে দেয় তাহলে এর পরিমাণ অনেক কমে আসবে। সরকারও হয়তো এভাবে ভাবছে।