১৯৭৪ সালের আগস্টে সৌদি আরবের জেদ্দায় অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে সম্মেলনে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) চার্টার গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সরকারও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সেই চার্টারে স্বাক্ষর করে। সে সময়ের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। যদিও তখন পর্যন্ত সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সেই সম্মেলনে তাজউদ্দীন আহমদের প্রতিনিধি হিসেবে মিসরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আতাউর রহমান, সে সময়ের অর্থ সচিব কফিল উদ্দিন মাহমুদ, সে সময় ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সিলর (পরে অর্থমন্ত্রী) আবুল মাল আব্দুল মুহিতও সেখানে উপস্থিত হন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নাম প্রস্তাব করে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে। পাকিস্তান এ প্রস্তাব সমর্থন করে। ২৬টি দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর করে। তারা প্রতিশ্রুতি দেয় যে নিজ নিজ দেশে পর্যায়ক্রমে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর করবে।
এটি স্বাক্ষর হওয়ার পর ১৯৭৬ সালে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো জন্ম হয়। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের মাধ্যমে। সে সময় বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের চেয়ারম্যান ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম। আমিও এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ট্রাস্টি ছিলাম। তখন আমি দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার। প্রতি রোববার ইসলামিক অর্থনীতি নিয়ে একটা বৈঠক হতো। সেই বৈঠকে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা আসতেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাও ছিলেন। পূবালী ব্যাংকের রশিদ চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। আজিজুল হক সাহেব (পূবালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান) সোনালী ব্যাংক ময়মনসিংহ অথবা সিলেট শাখার ম্যানেজার ছিলেন। সেখান থেকে এসে তিনি সোনালী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব নেন। অফিস ছিল শান্তিনগরের কাছে। ফলে তিনি নিয়মিত রোববার এসে অর্থনৈতিক বৈঠকে অংশ নিতেন।
আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। আমার একটা আগ্রহ ছিল, সেই আগ্রহ থেকেই আমি নিয়মিত বৈঠকে আসতাম। ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরোর সেই স্টাডি সার্কেল থেকে বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে আইডিবি চালু হলো। এরপর দুবাই ইসলামী ব্যাংক হলো, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ হলো। এর আগে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইসলামী ব্যাংক হয়েছে। সেগুলোর প্রভাব সেভাবে ছিল না। যেমন মিসরে কয়েকটি ব্যাংক ছিল এমন। মালয়েশিয়া হাজিদের সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। এগুলো ছিল বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ। আইডিবির যাত্রা হওয়ার পরই পদ্ধতিগতভাবে কিছু কিছু ইসলামী ব্যাংকের কাজ শুরু হয়। দুবাই ইসলামী ব্যাংক যখন চালু হলো তখন দুবাই থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সরকারকে একট চিঠি লিখলেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশে একই পদ্ধতিতে একটি ইসলামী ব্যাংক চালু করার বিষয়ে অবহিত করেন। পদ্ধতিগত সব তথ্য সেখানে তিনি সরকারকে দেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে সেই চিঠি গেল বাংলাদেশ ব্যাংকে। তখন এএসএম ফখরুল আহসান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি কয়েকটি দেশে চালু হওয়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করলেন। সেই সময়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাও ছিল ইসলামী ব্যাংকগুলোর। যেটির নাম ছিল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইসলামিক ব্যাংক। তিনি সেই সমিতির দপ্তর এবং আইডিবির অফিস দেখতে গেলেন। দেখে এসে প্রতিবেদন দিলেন এ রকম একটা ব্যাংক আমাদের দেশে হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন মো. নূরুল ইসলাম। সে সময় বাংলাদেশে আটটি ব্যাংক ছিল। ছয়টি বাণিজ্যিক ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেয়া হলো সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের উইন্ডো খোলার জন্য। সম্ভবত এটি ১৯৭৯ সাল। প্রথম মিটিংয়ে এ সিদ্ধান্ত হলো। দ্বিতীয় মিটিংয়ে (এমডিদের মিটিং) হলো পর্যালোচনা। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো আমরা এটা করব। কিন্তু সেখানে বলা হলো ইসলামী ব্যাংকিং চালু করার জন্য প্রশিক্ষিত জনশক্তি আমাদের নেই। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি জেলা সদর ও মেট্রোপলিটন সিটিতে সব ব্যাংকের একটি করে ইসলামী ব্যাংকিং শাখা খোলা ও পর্যায়ক্রমে বিস্তৃতির সিদ্ধান্ত হয়।
আর ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হলো বেসরকারি ব্যাংকের জন্য দরখাস্ত করতে হবে। ফেব্রুয়ারিতে ২৪টি দরখাস্ত এল। তখন ২১টি আবেদন আসে কনভেনশনাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার। আর তিনটি আবেদন আসে ইসলামী ধারার ব্যাংকের জন্য। এর একটা ছিল ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ব্যাংক ঢাকা লিমিটেড। এটার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক লস্কর। রাজ্জাক সাহেব ছিলেন বাংলাদেশে আধুনিক ছাপাখানার স্থপতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পরবর্তী সময়ে কেবল এ ব্যাংকটি চালুর অনুমতি দেয়া হয়। তবে ব্যাংকটি কাজ শুরুর আগে নাম পরিবর্তন করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয় ব্যাংকটির কাজ এগিয়ে নিতে। তখন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে ৮ কোটি টাকা মূলধন প্রয়োজন হতো। পুরো পদ্ধতিটাই যেহেতু নতুন ফলে এটার জন্য মূলধন সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বড় কোনো ব্যবসায়ী ছিলেন না। সাধারণত যেসব ধনী লোকেরা ব্যাংকের মালিক হন, সে রকম কেউ ছিলেন না। ছিলেন নিম্ন মধ্যবিক্তরা। প্রিন্টিং হাউজের মালিক চেয়ারম্যান। টঙ্গীতে তার একটা কারখানা ছিল। তারপর বিনিময় প্যাট্রোল হাউজের মালিক মফিজুর রহমান ছিলেন প্রজেক্ট ডিরেক্টর। কোল্ড স্টোরেজ ছিল মোহাম্মদ হোসেনের। এরপর ছোট ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন। শুধু জাকি উদ্দিন আহমদ ও ফেনীর মোশাররফ হোসেনের কিছু গার্মেন্টস ব্যবসা ছিল। তাদের জাকি-মোশাররফ গ্রুপ ছিল। তারাও অনেক বড় কোনো গ্রুপ ছিল না। মোশাররফ হোসেন পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। আরেকজন সংসদ সদস্য হয়েছেন পরবর্তী সময়ে চাঁদপুরের আব্দুল্লাহ সাহেব। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সবাই মিলে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার তখন নিয়ম অনুযায়ী ৫ শতাংশ মানে ৪০ লাখ টাকা দেয়। পরবর্তী সময়ে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। আইডিবি তাদের সহায়তা করে। দুবাই ইসলামী ব্যাংক, বাহরাইন ইসলামী ব্যাংক, কাতার ইসলামী ব্যাংক এগিয়ে আসে। সেটির সঙ্গে আল-রাজি গ্রুপের সোলাইমান আল-রাজি (সৌদি আরবের ব্যবসায়ী) ৩০ শতাংশ মূলধন দেন। যার ফলে ৭০ শতাংশ মূলধন মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে আর বাকিটা দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। যার মধ্যে ৫ শতাংশ সরকারের দেয়া।
১৯৭৯ সালের দিকে সোনালী ব্যাংকের ৩৭ জন ব্যাংকারকে নিয়ে একটা ট্রেনিং প্রোগ্রাম করা হয়। সেই প্রশিক্ষণ নেয়া কর্মকর্তারা ওয়ার্কিং গ্রুপ অব ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নামে একটা টিম হলো। তারা পরবর্তী সময়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে সময়ের ডেপুটি গভর্নর এম খালেদ ছিলেন এ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি আর আজিজুল হক ছিলেন সেক্রেটারি। ফখরুল আহসান, শাহ আব্দুল হান্নান এ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। কয়েকদিন পর এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিবা)। স্লোগান হলো ‘বিবা ফাইট টু রিবা’। তারা বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৩০০ লোককে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক যখন চালু হলো তখন এখান থেকে লোকদের নিয়েই শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ইউনিভার্সিটি ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে কার্যক্রম চলতে থাকে।
তবে একটি ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য অন্তত জেনারেল ম্যানেজার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রয়োজন ছিল। তখন কোনো ব্যাংকার এখানে আসতে রাজি ছিলেন না। তাদের প্রশ্ন ছিল, সুদ ছাড়া ব্যাংক চলবে কীভাবে? তাই ঝুঁকি নিতে কেউ রাজি হননি। তখন আজিজুল হক সাহেব সোনালী ব্যাংকে তার ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ করেছিলেন। তিনি সেই চাকরি ছেড়ে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে যোগদান করেন। এমএ করিম শিল্প ব্যাংকের এমডি ছিলেন। তিনি বললেন তার অবসর যেদিন থেকে শুরু হবে সেদিন থেকে যোগদান করবেন।
এ অঞ্চলে ইসলামী ব্যাংকিং চালু করার বিষয়ে অনেক আগেও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। যেমন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী চট্টগ্রামে ১৯০৫ সালের কাছাকাছি সময়ে ইসলামী ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেন। তখন পর্যন্ত ব্যাংক সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। কাঠামো কী হবে সেটি তখনো ছিল না। তার একটি ‘আত্মকথা’ বই আছে, সেখানে উল্লেখ রয়েছে—আমি ১৯৮৯ সালে যশোরে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হিসাবে গেলাম। তখন সেখানে ওয়াহেদ আলী আনসারি নামে একজনকে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন এখানে একটা ইসলামী ব্যাংক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেটি মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে মারা যাওয়ার আগে তিনি এটি চালু করেন। তবে পরবর্তী সময়ে সেটি আর প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এ ধরনের বিক্ষিপ্তভাবে যিনি যতটুকু বুঝেছেন ততটুকু দিয়ে সুদমুক্ত লেনদেনের একটা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছেন। কারণ এটি জনগণের দাবি ছিল।
ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আগে একটি জরিপ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় অনেকেই টাকা জমা দেয়ার সময় লিখিত দিতেন যে উনার লেনদেনের সঙ্গে যেন সুদ যুক্ত করা না হয়। এ ধরনের অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। তখনকার দিনে এ টাকা অনেক বড় অংক। এতে স্পষ্ট হয় যে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে জনগণের মাঝে প্রবল দাবি ছিল। ইসলামী ব্যাংকের যারা উদ্যোক্তা হয়েছিলেন তাদের মধ্যে লভ্যাংশ নেয়ার তাড়না ছিল না। বরং সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের একটা রোল মডেল তৈরির জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা এটি চ্যারিটি হিসেবে নিয়েছিলেন।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দুটি দিক রয়েছে। একটি উদ্দেশ্যগত দিক, আরেকটি পদ্ধতিগত। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং লিটারেসি এখনো প্রবল হয়নি। একাডেমিশিয়ান, শরিয়াহ স্কলারসহ আমাদের সবার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং লিটারেসির যথেষ্ট ঘাটতি আছে। আমরা অতিসম্প্রতি উদ্দেশ্যগত বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করছি। ২০০৭ সালে আমি ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ বিভাগের দায়িত্বে এলাম। তখন আমার মধ্যে প্রবলভাবে বিষয়টি আসছে যে আমাদের উদ্দেশ্যগত দিক দেখতে হবে। তখন পর্যন্ত আমরা দেখছি এখানে সুদমুক্ত হলো কিনা, সুদের উপাদান কোনোভাবে প্রবেশ করল কিনা, সেটি শরিয়াহ বোর্ড থেকেও বলা হচ্ছে, আমরা ব্যাংকাররাও সচেতন থাকছি। আমাদের বলা হলো, দুনিয়ার অনেক ইসলামী ব্যাংকের তুলনায় বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকটা ভালোভাবে চলছে। কিন্তু আমি দেখলাম, উদ্দেশ্য মহৎ হলেও বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের অন্তত ৯৩ শতাংশ সম্পদ মাত্র ৭০০ মানুষের কাছে। আমাদের আমানতকারী ছিল প্রায় ৪০ লাখ। কিন্তু এত বিপুল জনগোষ্ঠীর আমানতের ৯৩ শতাংশ ৭০০ লোকের কাছে বিনিয়োগ হিসেবে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। পদ্ধতি যদি শতভাগ সুদমুক্তও হয় উদ্দেশ্যগত কারণে সেটি ইসলামী ব্যাংক নাও হতে পারে। উদ্দেশ্যগতভাবে ইসলামী ব্যাংকিংটা হচ্ছে ডিস্ট্রিবিউটিভ জাস্টিসমুখী।
আমরা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও ইসলামী ব্যাংকিং শিখতে পারছি না। আমাদের আলাদা করে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণা করতে হচ্ছে। আমরা সবকিছু পদ্ধতিগতভাবে ঠিক রাখলাম। সুদ প্রবেশ করতে দিচ্ছি না। এটিই যথেষ্ট নয়। কারণ উদ্দেশ্যগতভাবে কোন জায়গা থেকে কোথায় যাচ্ছি সেটিও দেখা দরকার। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আরো বেশি গবেষণা করে, পড়াশোনা করে উদ্দেশ্যগত দিকটির আরো উন্নতি ঘটাতে হবে। শরিয়াহর লোকেরা শুধু ইসলামী ব্যাংক বুঝলে হবে না, আবার শরিয়াহর লোকদের এনে ইসলামী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বানিয়ে দিলেও হবে না। গুণগতভাবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জনকল্যাণ করতে হবে।
যদি এক হাজার বছরের ইসলামী পণ্ডিতদের দেখেন। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে সবাই। তারা সবসময় সবকিছুতে সর্বজনীন কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। এখন সুদমুক্ত হলেই ইসলামী ব্যাংক হয়ে যাবে না। কারণ সেটি সর্বজনীন কল্যাণের পথে কতটা অগ্রসর সেটিও দেখতে হবে। সব সুদমুক্ত ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক নয়। ইসলামী ব্যাংক হতে হলে সুদমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি শরিয়াহর যে ইনক্লুসিভিটি বা সর্বজনীন কল্যাণ সেটিও থাকতে হবে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আমি দেখলাম, মাত্র ৯২ জন গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ তুলে দেয়া হয়েছে। এটি কখনো ইসলামী ব্যাংকিং হতে পারে না। আমি বলেছি, এখন থেকে যে শাখার আমানত, সেই শাখার অধীনে বিনিয়োগ করতে হবে। পদ্মার ওপারের আমানত ঢাকায় আসবে না। ঢাকার আমানত চট্টগ্রামে যাবে না। এ ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে লেনদেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গ্রাহকরা নতুন করে আমানতও রাখছেন।





