প্রায় দুই বছর আগে প্রচলিত আর্থিক সেবার পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স। এ সময়ে আপনাদের শরিয়াহ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে?
ডিবিএইচ ফাইন্যান্স ২৭ বছর ধরে প্রচলিত ধারার আর্থিক সেবা দিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি ২০২৩ সালের মে মাস থেকে আমরা শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা চালু করেছি। এ অল্প সময়ের মধ্যে আমরা শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমে ভালো সাড়া পেয়েছি। প্রতি মাসে আমরা যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ ও অর্থায়ন করে থাকি তার ২০-২৫ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আসছে। আমরা আশাবাদী যে সামনে আমাদের শরিয়াহ কার্যক্রম আরো ভালো করবে।
যে লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা চালু করেছিলেন সেটি অর্জিত হয়েছে কি?
আমরা আসলে কোনো সংখ্যাকে সামনে রেখে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা চালু করিনি। আমরা চেয়েছি আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে পুরোপুরি যাতে শরিয়াহ অনুশাসন পরিপালিত হয় সেটি নিশ্চিত করতে। অনেক সময় গ্রাহকদের মধ্যে সন্দেহ থাকে যে প্রচলিত আর্থিক সেবা ও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার মধ্যে কতটুকু পার্থক্য আছে। আমাদের শরিয়াহ কমিটির পরামর্শ অনুসারে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্য গ্রাহকদের কাছে উপস্থাপন করছি। আমাদের কর্মীদের আমরা সেভাবেই প্রশিক্ষিত করেছি যাতে তারা গ্রাহকদের কাছে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের বিষয়টি সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে। যেহেতু আমাদের প্রচলিত ধারার আর্থিক পণ্যও রয়েছে তাই আমরা গ্রাহকদের কাছে প্রচলিত ও শরিয়াহ দুই ধরনের পণ্যের বিষয়টিই তুলে ধরছি এবং এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী সেটি তাদের কাছে উপস্থাপন করছি। তাদের যেটি পছন্দ তারা সেটি বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গ্রাহকদের মধ্যে প্রচলিত ও শরিয়াহ—এ দুই ধরনের আর্থিক পণ্য নিয়ে যে জানার ঘাটতি আছে সেটি আমরা দূর করতে সফল হয়েছি। এখন পর্যন্ত আমরা শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি ২৭৬ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছি।
দেশের বর্তমানে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের কেমন চাহিদা রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সে চাহিদা পূরণ করতে পেরেছে কি?
আমরা ২০২৩ সালে ইসলামিক উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করলেও এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আরো তিন বছর আগেই। আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা ১৯৮৩ সালে শুরু হলেও গত সাত-আট বছরে এর ব্যাপ্তি অনেক প্রসার লাভ করেছিল। এ সময়ে অনেকগুলো ইসলামী ব্যাংক এসেছে, অনেক প্রচলিত ব্যাংক ইসলামিক উইং বা শাখার মাধ্যমে শরিয়াহ কার্যক্রম চালু করেছে। কিন্তু ২০২২ সালে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং একটি ধাক্কা খায়, যদিও এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আরো কয়েক বছর আগে। সে সময় গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এ রকম একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে আমরা শরিয়াহ কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের কারণে মানুষের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের বিষয়ে জানার সুযোগ ও আগ্রহ দুটোই বেড়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি কিছু অমুসলিম দেশেও এ ধরনের পণ্যে ভালো চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। মাঝে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এটি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল। তবে গত কয়েক মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু পদক্ষেপের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ভবিষ্যতে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের চাহিদা আরো বাড়বে।
বিপুল জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম সেভাবে প্রসার লাভ করেনি। এর কারণ কী বলে মনে করছেন?
শুরুতে আমাদের এখানে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রমের গতি বেশ ধীর ছিল। এর বেশকিছু কারণ রয়েছে। যেমন প্রথমে শুধু ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমেই শুধু শরিয়াহ ব্যাংকিং চলে আসছিল। অন্য কেউ এখানে আগ্রহ দেখায়নি। তাছাড়া নীতির স্পষ্টতার একটি বিষয়ও রয়েছে। আমাদের এখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে ৪২ বছর আগে। এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্র একটি ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা হয়নি। ১৫ বছর ধরে শুনে আসছি যে খসড়া নীতিমালা হচ্ছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি খসড়া নীতিমালা মতামতের জন্য অংশীজনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র কোনো ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগ নেই। এটিও প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া আমাদের এখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও অনেকেই ইসলামী ব্যাংকিংয়ে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অনেকে নিজ উদ্যোগেই পেশাদার কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন। শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ বেশ সীমিত। এক্ষেত্রে ইসলামী বন্ড, সুকুক এ ধরনের পণ্যের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে আমরা আমানতের অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাব।
প্রচলিত নাকি শরিয়াহ কোন ধরনের কার্যক্রমে আপনাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বেশি?
অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার চেয়ে শরিয়াহ কার্যক্রমে আমাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বেশি। প্রচলিত ধারায় আপনি ঋণ নিয়ে সেটি পরিশোধ করে দিতে চাইলে একটি আর্লি সেটেলমেন্ট ফি দিতে হয়। শরিয়াহর ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু নেই। এছাড়া আমরা যে খাতে অর্থায়ন করি যেমন অ্যাপার্টমেন্ট কেনা সেখানে প্রচলিত ধারায় আপনি ঋণ নেয়ার ছয় মাস পরে সুদসহ কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন কিংবা চাইলে আপার্টমেন্টে ওঠার পর কিস্তি শুরু করতে পারেন। কিন্তু শরিয়াহ কার্যক্রমে এর কোনো সুযোগ নেই। কারণ শরিয়াহ আইনে অসম্পূর্ণ কোনো সম্পদের বিপরীতে ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। অদৃশ্য কোনো সম্পদে বিনিয়োগ করা শরিয়াহ অনুসারে অনুমোদিত নয়। দৃশ্যমান সম্পদে বিনিয়োগকে শরিয়াহ অনুমোদন করে থাকে। ফলে আমরা যে ধরনের খাতে অর্থায়ন করে থাকি যেমন আবাসন খাত ও গাড়ি সেটি শরিয়াহর বিধিবিধানের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়গুলো গ্রাহকদের শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তুলেছে বলে আমার মনে হয়। আমানতের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত শরিয়াহর তুলনায় প্রচলিত ধারায় বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
বর্তমানে আমরা উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থাকা আমাদের ১৬টি শাখার প্রতিটিতেই শরিয়াহ কার্যক্রম রয়েছে। আমরা এখনই বলছি না যে আগামী তিন কিংবা পাঁচ বছর পর পুরোপুরি শরিয়াহ কার্যক্রমে যাব। সেটি নির্ভর করবে ব্যবসা কোন দিকে যাবে, নীতিমালা কী হবে সেটির ওপর। পর্ষদে আমাদের নীতিনির্ধারক যারা রয়েছেন তারা সেটি নির্ধারণ করবেন। তবে সামনে আমরা আরো বেশকিছু নতুন শাখা স্থাপন করব। এক্ষেত্রে আমরা সব শাখায়ই প্রচলিত ও শরিয়াহ দুই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করব, যাতে গ্রাহক তার পছন্দ অনুসারে পণ্য বাছাই করার স্বাধীনতা পান। এমনকি আমাদের প্রচলিত ধারার গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও শরিয়াহ কার্যক্রমে স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে।





