বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে?
২০২৪ সালটা আমরা সবাই একটা ভিন্ন রকম বছর হিসেবে অতিবাহিত করেছি। তার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। আসলে একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। গ্রাহকরা আর্থিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সে চাপটা পড়ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশিত সীমা আমরা স্পর্শ করতে পারিনি। আমানত সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি যেমন কমেছে, তেমনি ঋণ আদায়ও কিছুটা কমেছে। এর বড় কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য একটা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি যে উৎপাদকদের পণ্য উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যান্য ব্যবসার ক্ষেত্রেও একটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসবের একটা চাপ রয়েছে আমাদের ওপর। তার পরও টিকে আছি, গ্রাহকের পাশে আছি। কিন্তু প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না।
প্রচলিত আর্থিক সেবার পাশাপাশি আপনারা শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবাও দিচ্ছেন। বর্তমানে আপনাদের শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম কেমন যাচ্ছে?
বাংলাদেশ ফাইন্যান্স দেশের প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা শরিয়াহভিত্তিক উইং চালু করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক উইংয়ের পদ্ধতি কী হবে সেটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না। ফলে আমরাই প্রথম প্রতিষ্ঠান যারা ব্যবসাটি শুরু করেছে। পরে আরো কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ পথে হেঁটেছে। আমরা জানি, দেশের মোট আমানত এবং ঋণের ২৫-৩০ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক। এটার একটা ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মতো শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রমেএ সুদ নেই। দেশের বেশির ভাগ মানুষ ইসলামপ্রিয়, ফলে তারা সুদমুক্ত লেনদেন এবং ব্যবসা করতে চান। এজন্যই আমরা ২০২২ সালে এটা শুরু করি।
শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম আপনাদের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই।
শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম নিয়ে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সকে পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে নিয়ে আসব। বাংলাদেশের অনেকগুলো ব্যাংক রাতারাতি শরিয়াহ কার্যক্রমে গেছে। সেক্ষেত্রে তাদের বেশকিছু জায়গায় হোঁচট খেতে হয়েছে। সব গ্রাহককে তো একসঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে নিয়ে আসা যাবে না। জবাবদিহিতার জায়গা, ব্যবসার ধরন এবং নথিপত্র—সবই ভিন্ন। সে কারণে আমরা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটা পর্যায়ে যাওয়ার পরই পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক করে ফেলব। কারণ সেটি করার জন্য অভিজ্ঞতা দরকার। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন বছরের মধ্যে ২৫ শতাংশের একটা পোর্টফোলিও তৈরি করা। সেখানে আমরা এখনো যেতে পারিনি। তবে প্রায় ৬০ কোটি টাকার একটা পোর্টফোলিও তৈরি করেছি। শরিয়ায় যে বিষয়গুলো আমরা দেখছি, সেখানে আমাদের কোনো রকম খেলাপি ঋণ নেই। গত সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছরে যেসব ঋণ দিয়েছি সেখানে আমাদের কোনো রকম খেলাপি নেই। আমাদের শরিয়াহর মূলনীতি ছিল শুধু একটা পণ্য বিক্রি করা নয়; গ্রাহকের জন্য শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ সুবিধা, সঞ্চয়, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ওয়াকফ বা ট্রাস্টের পুরোপুরি একটা সমাধান আমাদের কাছে পাবেন।
দেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০২৪ সালে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং নিয়ে আমরা কিছু নেতিবাচক প্রচারণা দেখেছি। তার একটা প্রভাব এ খাতে পড়েছে। এটি যদি না হতো বিশেষ করে দেখবেন ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। আমি মনে করি পরিকল্পনা করেই ক্ষতিটা করা হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর। শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ে ব্যাপারটা হচ্ছে যিনি আমানত রাখেন তিনি ঝুঁকি ও মুনাফা দুটোই শেয়ার করেন। আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করে যে মুনাফা হবে সেটির যেমন তিনি একটা অংশ পাবেন, তেমনি যে ক্ষতিটা হবে সেখানেও তিনি একটা অংশ বহন করবেন। এটাকে মাথায় রেখে আমার কাছে মনে হয় কোনো একটি গোষ্ঠী ইসলামিক ব্যাংকগুলোকে তাদের আয়ত্তে নেয়ার চেষ্টা করেছে। যাতে ওই ঝুঁকিগুলো আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। যারা সেখানে শেয়ারহোল্ডার ছিলেন তাদের ওপর যেন না আসে। এমন একটি উদ্দেশ্যে এ কাজগুলো তারা করেছে। তারা এ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকেই টার্গেট করেছে। অন্য ব্যাংকগুলোয় কিন্তু তারা তেমন একটা হাত দেয়নি। এটিকে আমি কোনো পদ্ধতিগত ঝুঁকি বলতে চাই না। এটা এক ধরনের ডাকাতি। এটিকে তো আপনি অর্থনৈতিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। এর জন্যই আমরা হোঁচট খেয়েছি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিকভাবে যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সেটি তারা নিয়েছে। ব্যাংকের যে পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা দরকার সেটি তারা করে দিয়েছে। বাকিগুলোকে নিরীক্ষা করে একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিক করার চেষ্টা করছে। তারল্য সহায়তাও দিচ্ছে। এ অস্থিরতার একটা প্রভাব সবার মতো আমাদের ওপরও পড়েছে। গ্রাহক স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি টাকা উত্তোলন করেছে। এটি শুধু শরিয়াহভিত্তিক নয়, সব ব্যাংক থেকেই উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে সবাই বিপদে পড়েছে।
আপনারা প্রথমে উইং খোলার মাধ্যমে শরিয়াহ ব্যবসা শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রচলিত আর্থিক সেবা থেকে পুরোপুরি শরিয়াহ কার্যক্রমে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের অনুপ্রেরণার জায়গাটা কী?
ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মৌলিক নীতি হলো একটা পণ্য বা মেশিনারিজ কেনার জন্য অর্থায়ন। টাকার ব্যবহারটা শতভাগ নিশ্চিত করতে হয়। গোটা বিশ্বে কভিডের সময় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। এখন আমাদের এখানে ব্যাংকিং সিস্টেমে এত অনিয়মের মূল কারণ ঋণ যে উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে সেই কাজে ব্যবহার হয়নি। হয়েছে অন্য জায়গায়। অথবা একটা কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে এসব অনিয়ম থেকে বের হওয়ার জন্য ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সবসময় খেয়াল করতে হবে ব্যাংক যেখানে ঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না। যদি ভিন্ন কোনো মডেলে কাজ করতে না পারা যায়, তাহলে ব্যাংকের সঙ্গে একই ধরনের ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব না। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতার ইচ্ছা ছিল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং শুরু করার। সেটি আমরা একটু দেরিতে হলেও শুরু করেছি। প্রথমেই পুরোপুরি পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে করছি। অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি। কোন জায়গায় গ্রাহকের চাহিদা আছে আর কোন জায়গায় তাদের সক্ষমতা, সেটি বোঝার মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যাব। সেক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান পোর্টফোলিওকে জোর করে শরিয়ায় স্থানান্তর না করে ধীরে ধীরে করলে মনে হয় ভালো ফল পাওয়া যাবে।
গ্রাহকদের জন্য নতুন কোনো আর্থিক সেবা চালুর পরিকল্পনা আছে কি?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক নতুন পদক্ষেপ নেয়ায় আমরা ঠিকভাবে কাজ করতে পারছি। শরিয়াহভিত্তিক প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বাইরে যারা থাকে তাদের জন্য একটা নতুন প্রডাক্ট নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিদেশে থাকে তাদের ৫০ ভাগের বেশি থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের পছন্দের জায়গা কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিং। বাংলাদেশে আমরা কিন্তু লেনদেন বা রেমিট্যান্স আদান-প্রদানের বাইরে কোনো কিছু দিতে পারিনি। কিন্তু আমরা যদি দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কোনো বিনিয়োগ দিতে পারি কিংবা তিন-চার বছর পরেই বাড়ি করার ব্যবস্থা করে দিই, যা তিনি অবসরে গেলে পেতেন; কিংবা যদি বীমার আওতায় নিয়ে আসি; তাহলে প্রবাসীদের ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রায় ৭০-৮০ লাখ প্রবাসী আরব দেশগুলোয় আছেন। তাদের এসব সুবিধা দিতে পারলে একদিকে রেমিট্যান্স বৈধভাবে দেশে আসবে; অন্যদিকে প্রবাসীদের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা যাবে।
শ্রুতলিখন: তোফাজ্জল হোসেন





