অর্থনীতির সংকট ও সংস্কারের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলন ও জন-অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থায় পড়ে। ২০২২ সাল থেকে একাধিক অর্থনৈতিক সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে তোলে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন ও প্রবাসী আয়ের অবনমন, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং নজিরবিহীন লুটপাটে ভঙ্গুর ব্যাংক খাত নিয়ে অর্থনীতি ব্যাপক সংকটে পড়ে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বেড়ে চলেছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, অন্যদিকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার বাইরে ঠেলে দেয়। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সাময়িক বা বাজারভিত্তিক ধাক্কা নয় বরং কাঠামোগত দুর্বলতার শিকার। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পড়ন্ত সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, অর্থনৈতিক আস্থার সংকট কাটানো এবং টেকসই পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা।
সামষ্টিক অর্থনীতির ফাটল ও কাঠামোগত দুর্বলতা
গত ১২ মাসে অর্থনৈতিক সূচকে আংশিক উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও অধিকাংশ সূচক এখনো দুর্বল অবস্থান থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি। গৃহীত কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ সামগ্রিক অর্থনীতিকে আংশিকভাবে উপকৃত করেছে। ব্যালান্স অব পেমেন্ট, বিশেষ করে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট দীর্ঘ তিন বছরের ধারাবাহিক ঘাটতির মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিওপি ঘাটতি ছিল ৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। চলতি হিসাব ও ভোক্তা কেন্দ্রিক অর্থনীতির মূল চালক হিসেবে ২০২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, যা বিগত বছরগুলো থেকে অনেক কম। আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছিল। তাছাড়া ১৯তম আইসিএলএস কাঠামোর অধীনে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ দশমিক ৩ লাখে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকে ২৪ লাখ থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার বেশি।
অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা গণ-অভ্যুত্থানের আগেই ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। দেশটির মোট ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ২০২১ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ঋণের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণের ফল। ক্রমবর্ধমান পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ৮ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। ফলে বৈদেশিক ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ২২ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, অতিরিক্ত প্রকল্প বাজেট, সমন্বিত ঋণ তথ্য ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, অনুন্নত বন্ড বাজার, অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার দুর্বলতা, পরিচালনাগত অদক্ষতা মূলত প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট (পিআইএম) প্রাথমিকভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে পরিচালিত হয়, পাশাপাশি অন্যান্য চ্যানেল যেমন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, জলবায়ু তহবিল উদ্যোগ এবং অপারেটিং বাজেট প্রোগ্রাম। যদিও দশক ধরে এডিপি ধারাবাহিকভাবে মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রেখেছে, ২০১০ সাল থেকে বার্ষিক ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা এবং কার্যকারিতা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। নীতিগত রাজনীতির অসংগতি, ডিজিটাল প্লাটফর্মের অনুপস্থিতি, দক্ষতা ও মানবসম্পদ সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল মূল্যায়ন ও নজরদারির ঘাটতি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রণয়নে প্রধান বাধা।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, জনসেবা প্রদানের জন্য অর্থায়ন করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকর রাজস্ব সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে তার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, অর্থবছরের প্রথমার্ধে কর রাজস্ব ২ শতাংশ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ১ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা পূর্ণ বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক কম। ভারতে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৭-১৯ শতাংশ, আর বাংলাদেশে তা মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ ঘাটতি কর ব্যবস্থায় স্থায়ী কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা রাজস্ব ভিত্তিকে সীমিত করে এবং নিম্ন আয়ের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চাপায়, যা সমতা ও স্থায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রস্তাবসহ সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগ করনীতি ও প্রশাসন আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে প্রযুক্তিগত সুস্থতা, শাসন কাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। কারিগরি দক্ষতা ও স্থিতিশীল সংস্কার কাঠামো নিশ্চিত না হলে কর-জিডিপি অনুপাত ও সামষ্টিক রাজস্ব স্থিতিস্থাপকতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। অপর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো, সীমিত অটোমেশন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতা, দুর্বল নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ক্ষমতা, উচ্চ কর ব্যয় এবং লক্ষ্যবিহীন প্রণোদনা এই চ্যালেঞ্জগুলো বাড়ায়।
ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ব্যয় ও প্রবৃদ্ধির চাকার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মুখে ইন্টারেস্ট রেট নয়-ছয় দিয়ে বেঁধে রাখা, এলসি কম্প্রেশন এর কারণে বাজারে কমে যাওয়া, প্রায় ৪০ শতাংশ টাকার মানের পতন এবং কোথাও কোথাও বাজার সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং ব্যবসার খরচের জন্য মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জন্য সুদের আগের বিধিনিষেধ তুলে ধরে বাজারভিত্তিক কাঠামো চালু করা হয়। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপও কার্যকর করা হয়েছে—প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যে আমদানি শুল্ক হ্রাস, এলসি নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং খাদ্য ও সার আমদানিতে ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সরবরাহ চাপ প্রশমিত করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, যা সামষ্টিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৪-এ মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রাক্কলন অনুসারে, গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, এছাড়া জুন ২০২৪ ব্যাংক খাতে ক্লাসিফায়েড লোন ২১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যার অনুপাত ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অনেকগুলো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সুস্পষ্ট। রফতানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ফলে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে গেলে পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বহুমুখীকরণের জন্য আইসিটি, ওষুধ শিল্প, ফুটওয়্যার ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতের সম্ভাবনা থাকলেও কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতি সহায়তার অভাব বড় বাধা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ধীরগতি রয়েছে—বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ২০২৪ অর্থবছরে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) মাত্র ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের তুলনায় অনেক কম। কর্মসংস্থান আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ; প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ নতুন শ্রমশক্তি যোগ হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশে জনমিতির সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ ও কর্মক্ষমকে অর্থনৈতিক এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের তুলনায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা বা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) জিডিপির ২৫ শতাংশ অবদান রাখলেও সহজ অর্থায়ন ও বাজার প্রবেশের অভাবে খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা না করা গেলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানো কঠিন হবে।
গত এক বছরের বিভিন্ন পদক্ষেপ
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কিছু স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বিভিন্ন খাতে সংস্কারের অভিপ্রায় ব্যক্ত করা। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতের সংস্কারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনটি আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যাদের মূল দায়িত্ব ব্যাংকিং সম্পদের মান যাচাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ এবং চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সরকারের অনুমোদিত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নে প্রয়োগযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। যদিও এসব উদ্যোগ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করবে আগামী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার ওপর। আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম, এই এক বছরের মধ্যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন প্রণয়ন দেউলিয়া আইনের সংস্কার সম্পন্ন করে অতি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা সম্পন্ন হবে, কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। তবু এটা বলা যায় যে পুরো অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সংস্কার বা উদ্যোগ এই ব্যাংক খাতের হয়েছে গত এক বছরে।
এছাড়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ডলার সংকট মোকাবেলায় আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা। এর ফলে জুন ২০২৫-এ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার ইতিবাচক সংকেত নির্দেশ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৮ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধির ফলে আংশিক চাপ কমেছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্যশস্য আমদানিতে ভর্তুকি ও বাজার মনিটরিং কিছুটা কার্যকর হয়েছে, যার ফলে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের জুনে নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে। প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ, বিশেষ করে সরকারি ব্যয়ের অযথা অপচয় কমানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিওপিতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। মোট বিওপি অবস্থান ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে পৌঁছেছে। আরেকটি আলোচিত সংস্কারের উদ্যোগ হলো, সরকার কর্তৃক ১২ মে ‘রেভিনিউ পলিসি অ্যান্ড রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ‘রেভিনিউ পলিসি’ ও ‘রেভিনিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ এ দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির একটি শর্ত। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা কর ব্যবস্থার দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য এ বিভাজনের সুপারিশ করে আসছিলেন। তবে কিছু সংশোধন ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে মতভিন্নতার কারণে বাস্তবায়ন এখনো বিলম্বিত।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক খাত সংস্কারের দিকে মনোযোগ আরো বাড়িয়ে দিতে পারত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে সর্বজনীন ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করছে। একইভাবে ব্যাংক খাতের ঋণ খেলাপি সমস্যা গুরুতর অবস্থায় থেকে গেছে। জুন, ২০২৫ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি; উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধির সুফলকে সীমিত করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রফতানি বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বাস্তব পদক্ষেপের অভাব, বিশেষ করে সংস্কারের অভাব। ফলে অর্থনীতি এখনো তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল রয়ে গেছে।
অর্থনীতির পুনর্জাগরণের জন্য যা প্রয়োজন
আগামী বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করতে রাজস্ব খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সংস্কার জরুরি। রফতানি বহুমুখীকরণে ফুটওয়্যার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি, ওষুধ ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগণের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং যুব ও মহিলাদের মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপরিহার্য। প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প ক্লাস্টার গঠন করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে সংস্কার, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া আরেকটা বড় অর্জন. তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উঁচু অবস্থায় রয়েছে, বিনিয়োগ কম, রফতানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এখনো দুর্বল এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি সীমিত। তাছাড়া রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত বৃদ্ধির তুলনায় ধীর এবং সরকারের ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সংস্কারে যে সুস্পষ্ট ইচ্ছার কথা আমরা শুনেছি তাকে কার্যকর সংস্কার কর্মসূচি এবং বাস্তবায়নে রূপ দিতে হবে।





