২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অভিপ্রায়। সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর শুরু। এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অনেক কারণ থাকলেও বৈদেশিক ঋণ ও মেগা প্রজেক্টনির্ভর ভেঙে পড়া অর্থনীতি থেকে উৎসারিত কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির মডেল ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ। তাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কর্মপন্থায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার, যা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আমরা সবসময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা বলি কিন্তু আমরা যদি আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা জনমিতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হব। সেই সঙ্গে দেশে বেকারের সংখ্যাও আরো বাড়বে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৩-২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। কিন্তু একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ছাড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নাজুক এবং প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচক ছিল নিম্নমুখী। তখনকার পরিস্থিতিতে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছিল এসব সূচকের ধারায় স্থিতিশীলতা আনয়ন ও অর্থনীতিকে মোটা দাগে একটা কার্যকর ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর দিকে। এর জন্য প্রয়োজন ছিল কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আমরা দেখেছি সরকার আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও পতনন্মুখ প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন ঠেকাতে বেশ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং সফলও হয়েছে। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো নাগরিক জীবনে স্বস্তি আনয়নে যে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান, দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষা জালের বিস্তার প্রয়োজন ছিল তার তেমন কিছু এখনো অর্জন করা যায়নি। যদিও এ সরকারের কাছে এতসব কিছু চাওয়া যাবে কিনা সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখে এগিয়ে যেতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার সমন্বিত নীতি: বাংলাদেশ এ মুহূর্তে পৃথিবীর স্বল্প কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে একটি। এ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আমরা যদি সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য আয় না বাড়াতে পারি তাহলে কিন্তু শক্তিশালী সরকার পাব না। সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য করের আওতা বাড়াতে হবে। ট্যাক্স আদায়ের জন্য নির্ঝঞ্জাট ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার দিকে জোর দিতে হবে। কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ ও এর নিষ্পত্তি অনলাইনে নিয়ে যেতে হবে। সরকারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে একটি উন্মুক্ত নথি স্থাপন করা যায় যেখানে প্রতিটি ব্যয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উল্লেখ করা থাকবে। প্রকল্প শেষে তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক মূল্যায়ন এবং ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা: আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা আনয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন নতুন ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তিকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। আর্থিক খাতে স্ট্রেস টেস্ট বা ঘাতসহনীয়তা শুরু করতে পারে। আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনাকে রাজনৈতিক বিবেচনা ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
রফতানি বহুমুখীকরণ: রফতানি আয় আমাদের চালিকাশক্তি হলেও আমরা দীর্ঘদিন ধরেই রফতানি বহুমুখীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছি না। রফতানি বহুমুখী করতে আমরা প্রতি দুই-তিন বছরের জন্য দুই-তিনটি পণ্য বেছে নিতে পারি এবং তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দিয়ে একটি পরিণত পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে পারি।
বাণিজ্য নীতির যৌক্তিকীকরণ: দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এখন পর্যন্ত একটিও কার্যকর ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা কেবল আমাদের আয় কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত থাকি কিন্তু আমাদের যে নতুন নতুন বাণিজ্য তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হবে তা কিন্তু ভেবে দেখি না। ট্রাম্প ট্যারিফ মোকাবেলার ক্ষেত্রে দেখেছি আমাদের গড় শুল্ক সমজাতীয় দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি।
ফ্রি ট্রেড জোন: বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আমরা ফ্রি ট্রেড জোন বা দেশের মধ্যেই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে বৈশ্বিক সব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারি।
ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিদেশী বিনিয়োগের নিরাপত্তা: বাংলাদেশে বিদেশী কোম্পানির মুনাফা তাদের নিজের দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যেকোনো কোম্পানি ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের জন্যই। আমরা একই সঙ্গে বিদেশী কোম্পানিকে অধিক মুনাফা আয়ের সুযোগ দিই কিন্তু একই সঙ্গে এ মুনাফা তাদের দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট রকম জটিলতা দিয়ে রেখেছি। এ ধরনের সংরক্ষণবাদিতার খোলস থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা ভিয়েতনামের উদাহরণ টানতে পারি। আমাদের মতো অবকাঠামো সুবিধা থাকার পরও তারা এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। তাছাড়া খরচের একটা নির্ভরযোগ্য এস্টিমেশন, বিশেষত করনীতি, ইউটিলিটিজ সুবিধা ও খরচ, ফরমাল ও ইনফরমাল খরচের ক্ষেত্রে একটা ক্লিয়ার আইডিয়া তুলে ধরতে হবে। এটার জন্য একটা ওয়ান স্টপ সল্যুশন থাকতে হবে।
সমন্বিত লজিস্টিকস অর্থনৈতিক সংস্কারের আরেকটি কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে। বাংলাদেশে মোট খরচের ২০ শতাংশের মতো খরচ চলে যায় লজিস্টিকে। পার্শ্ববর্তী ভারতেও এটা বেশি ছিল কিন্তু তারা এটার ওপর নিবিড়ভাবে কাজ করেছে ও এটাকে সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারেনি। বিদেশে আমাদের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করতে যায় কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা খুবই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। অথচ আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই তাদের দক্ষ করে পাঠাতে পারতাম তাহলে তারা সম্মানজনক কাজে নিয়োজিত হতো, বেতন বেশি পেত এবং স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পারত। আমরা গ্লোবাল শ্রমবাজারের চাহিদাসেট পর্যালোচনা করে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিশ্বমানের আইটি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে এবং আমাদের রেমিট্যান্স কয়েক গুণ বাড়বে এবং বিদেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
আধুনিক ও টেকসই কৃষি: আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল কাজটাই অপূর্ণ থেকে যাবে যদি আমরা আমাদের কৃষির সংস্কার না করতে পারি। কৃষির সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলাকে কার্যকর ও দক্ষ করা, যা চূড়ান্ত ভোক্তার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। বীজ ও সারের ভর্তুকি নীতির বাইরে গিয়ে আমাদের প্রয়োজন কৃষির কল্যাণকেন্দ্রিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ও ভর্তুকিতে হিমাগারের ব্যবস্থা করা, যাতে বিভিন্ন সিজনের অভিঘাত সামলে বাজারে সরবরাহে ভারসাম্য থাকে। সর্বোপরি আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে কৃষির ক্ষেত্রে এটা কেবল বাণিজ্য আর পার্টনারদের ভাবগতির ওপর নির্ভর করা যাবে না; বরং এটা আমাদের বাজার ব্যবস্থার ওপর জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কেন্দ্রীয় বিষয়। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এদিকে এখনো সরকারের মনোযোগ কম। একটি অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রকাশ হয়েছিল, সেটির অগ্রগতি সম্পর্কে জনপরিসরে কোনো আলোচনা নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনেও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি জোরারোপ করা হয়েছে। লুটপাট ও পাচার বন্ধ করতে সক্ষম এবং কর্মসংস্থান ও উৎপাদননির্ভর অর্থনীতিই বর্তমানে আমাদের অগ্রাধিকার। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ঋণের ঘানি টেনেছে; দুর্নীতিতে লাগাম টানতে না পারলেও লুটপাট ও পাচার বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন দরকার বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের স্থায়ী ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সে প্রতিশ্রুতিও আদায় করা প্রয়োজন।
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ: যুগ্ম সদস্য সচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)





