দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংকট কোথায়?

আমাদের শিক্ষার একটি মৌলিক সংকট হলো ধারণাগত দিক। শিক্ষা কেবল কিছু দক্ষতার সমষ্টি নয়, এর উদ্দেশ্য অনেক ব্যাপক। শিক্ষিত মানুষের আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষিত মানেই প্রায়ই শুধু ডিগ্রিধারী। অথচ ডিগ্রিহীনদের সঙ্গে তাদের চিন্তাভাবনা ও উৎকর্ষে বড় কোনো ফারাক চোখে পড়ে না। এটি শিক্ষার মূল মহিমা ধারণ না করতে পারার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো গুণগত মানের অভাব। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে রেজাল্টে জোর দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী শুধু ডিগ্রি নেয়ার জন্য পড়াশোনা করে। মানসম্পন্ন শিক্ষা, সঠিকভাবে শেখানো ও শেখার প্রক্রিয়া দুই জায়গাই গুরুতরভাবে উপেক্ষিত।

খুব অল্প সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক রÅvংকিংয়ে পেছনে ফেলেছে। এ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান একরকম নয়। বড় ও পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিভাগ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে একটি মান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এগুলো টিকে আছে মূলত আন্তরিক প্রচেষ্টা ও শক্তিশালী নেতৃত্বের কারণে। তবে গড়ে বেশির ভাগ বিভাগে জবাবদিহির অভাব রয়েছে। কোনো শিক্ষক অযোগ্য বা স্বেচ্ছাচারী হলে তাকে আটকানোর ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে পাঠদান ও গবেষণার মান দ্রুত নেমে যায়।

অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শৃঙ্খলা আরোপ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাধীন হওয়ায় তুলনামূলক ভালো প্রার্থী বাছাই করতে পারে। এতে তারা মানোন্নয়নের সুযোগ বেশি কাজে লাগাতে পারে।

সার্বিকভাবে বলতে গেলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা এখনো অনেক পিছিয়ে। কিছু ভালো উদ্যোগ থাকলেও তা সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে রূপ নিচ্ছে না। অধিকাংশ শিক্ষক জানেন, একবার চাকরি হয়ে গেলে আর সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পদোন্নতি বা ইনক্রিমেন্ট পেতে খুব বেশি অবদানও রাখতে হয় না। ফলে প্রণোদনা ও জবাবদিহি দুটোই কমে গেছে। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার ইকোসিস্টেম দুর্বল অবস্থায় আছে।

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও সার্বিক উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রÅvংকিংয়ে অনেক ভালো করেছি। আমার মনে হয় না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এর আগে গবেষণা এবং শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিটি সূচকে এত অল্প সময়ে এ পরিমাণ উন্নতি কখনো দেখা গেছে। আমরা গবেষণা প্রণোদনার ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা চলছে। এ সুবিধায় শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারাও প্রণোদনা পাচ্ছে।

শিক্ষকদের জন্য ১০ বছর বন্ধ থাকা পিএইচডি ইনক্রিমেন্ট পুনরায় চালু করেছি। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দ্বিগুণ করার বরাদ্দ রয়েছে। প্রথমবারের মতো মাস্টার্স থিসিস পর্যায়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিটি বিভাগে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি স্কলারশিপ চালু হবে, একজন শিক্ষার্থীকে তিন বছরের অর্থায়ন করা হবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নে দীর্ঘ পরিকল্পনা আছে। রাস্তাঘাট ঠিক করার জন্য দরপত্রের কাজ চলছে। বন্ধ থাকা হলগুলোর কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে। শিগগিরই ২০তলা ভবন ও ছেলেদের হলের কাজ শেষ হবে। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে (রুয়া) একটি গঠনতন্ত্রের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তদবির বা সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। সেরা প্রার্থীদেরই নিয়োগ দেয়া হবে। রাকসু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা থাকলেও বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট অর্জনের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেয়া হয়। এ মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এটি শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতির বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের ফল। অর্থ ও পদবির প্রতি বেশি গুরুত্ব দিলে জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। যিনি মাইকে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ তুলতে পারেন, তাকে প্রাধান্য দিলে জ্ঞানের কদর থাকে না। ফলে শিক্ষা ও মূল্যায়নের পরিবেশও সৃষ্টি হয় না এবং স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পর্যায়ে জ্ঞানকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয় না।

নিয়োগকর্তারা বলছেন তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছেন না। আবার দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে?

এটি ঘটছে মূলত শিক্ষার মানের দুর্বলতার কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষ জনসম্পদ সরবরাহ করতে পারছে না। যেমন আমাদের পোশাক শিল্প বিশ্বে উন্নত হলেও এখানে ডিজাইন ও বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়নি। এটি তারই প্রতিফলন।

শিক্ষক রাজনীতি কি গুণগত শিক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে?

শিক্ষক রাজনীতি গুণগত শিক্ষার বড় অন্তরায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি শিক্ষার মান বা গবেষণার উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখে না। শিক্ষক রাজনীতি মূলত রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় স্বার্থসিদ্ধি এবং লেজুড়বৃত্তিক চরিত্রের, যেখানে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা একাডেমিক উৎকর্ষের উদ্যোগ থাকে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন ও গবেষণার মান প্রভাবিত হচ্ছে।

দেশে শিক্ষা খাতের সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন না হওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? আর উচ্চশিক্ষা সংস্কারে আপনার পরামর্শ কী?

শিক্ষা খাতে সংস্কারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। সবচেয়ে আগে যেটিতে হাত দেয়ার কথা ছিল তা হলো শিক্ষা। শিক্ষার মান না থাকলে স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বড় বড় ইমারত নির্মাণ বা প্রকল্প চালানো গেলেও শিক্ষার মানের অবনতি থাকলে তা টেকসই হবে না। এ কারণে শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে কমিশন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যা শুরুতেই করা উচিত ছিল।

কেউ কেউ বলছেন শিক্ষার সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় কম। তবে আমি মনে করি, শুরুতেই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল। আজ সারা দেশে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা আসলে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার প্রভাব।

শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণভাবে বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তাদের জীবন ও কর্ম শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। যারা বাস্তবায়নে যুক্ত থাকবেন, তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবেন। অযাচিত হস্তক্ষেপকারী শক্তি হিসেবে নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলবে বা উন্নতি করবে তা নির্ধারণ করবেন সেই প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানী ও গুণী মানুষরা। অন্য কেউ নয়।