অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা খাতের সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। এটি কীভাবে দেখছেন?

শিক্ষা খাতে অতীতেও অনেক সংস্কার কমিশন হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। দেখা গেছে কোনো সরকার সংস্কার কমিশন করেছে ঠিকই। কিন্তু পরবর্তী সরকার এসে সে সুপারিশ বিবেচনায়ই নেয়নি। তারা সবকিছু তাদের মতো করে করতে চেয়েছে। সুতরাং সংস্কার কমিশন করা হলেই যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হবে সেই নিশ্চয়তা নেই। তবে আমরা আমাদের জায়গা থেকে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন সে সংস্কার করছি। মানসম্মত শিক্ষাকে সামনে রেখে আমরা কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নিচ্ছি। যেমন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমরা বেশকিছু কাজ করেছি, যেন প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয়ে না ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক সমাজের বিত্তবান ও অগ্রসর শ্রেণী থেকে এসেছেন। এখন তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে কিছু দেয়া। পরবর্তী প্রজন্মকে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখা। তাদের এ কাজ যেন লাভের উদ্দেশ্যে না হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রের অর্থায়নে চলে। এসব প্রতিষ্ঠানের মান ও নিয়মনীতি বজায় রাখার পাশাপাশি আবাসন সুবিধার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আগে হলের আসন বণ্টন হতো রাজনৈতিকভাবে। এখন সেই সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে। হলগুলোয় এখন আসন বরাদ্দ হচ্ছে মেধা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে।

জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় একীভূত করার মাধ্যমে সংখ্যা হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছিল। এখনো বিগত সরকারের সময় ঘোষিত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়নি। এগুলোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি?

জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ও মানের মতো বিষয়গুলো এখানে উপেক্ষিত হয়েছে। এখন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা পাস করে বেরিয়েছে, সেগুলোকে একীভূত করা হলে ওই শিক্ষার্থীরা জটিলতায় পড়বে। চাকরি-উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের সার্টিফিকেট প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর যেগুলো এখনো চালু হয়নি; প্রকল্প পর্যায়ে আছে, সেগুলোর বিষয়ে এখনো আমরা ইতিবাচক নই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক সরকার এসে কী সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি।

উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি করা হলেও শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ বিষয়ে ইউজিসির কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

এমন ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে যার মেধা আছে, আত্মসম্মান আছে। যিনি সৎ ও পদের প্রতি মোহ নেই। যার পদের প্রতি মোহ আছে, তাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। উপাচার্য নিয়োগের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে, সেখান থেকে এসব বিষয় বিবেচনা করেই উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর শিক্ষক নিয়োগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে উপাচার্যকেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে মেধাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য উপাচার্যকে অত্যন্ত সৎ হতে হবে এবং সব কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। একজন উপাচার্য সৎ, দক্ষ ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন হলে তার সাহস ও চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যরাও দুর্নীতি-অনিয়মের সাহস পায় না। এর পরও এ বিষয়ে উপাচার্যরা যদি কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তাহলে আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যায়নি। ইউজিসি এ নিয়ে কী ভাবছে?

গত ১৬ বছরে যেসব শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে আমরা একজনও খুঁজে পাইনি, যাদের দলীয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। হয়তো কিছুসংখ্যক এর বাইরে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের চোখে পড়েনি। আমরা যেটা দেখেছি শিক্ষকদের যতটা না শিক্ষকতার জন্য, তার চেয়ে বেশি ভোটার বাড়ানোর জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক। এ সংকট কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ এখন সিন্ডিকেটকে সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যদেরই নিতে হবে এবং আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সমর্থন দেব। এছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলে উপাচার্যরা শিক্ষার্থীদেরও পাশে পাবেন। কারণ শিক্ষার্থীরা জানে তাদের কোন কোন শিক্ষক আসলেই মেধাবী এবং কোন কোন শিক্ষক দলীয় বিবেচনায় এসেছে। উপাচার্যদের সাহস করে পদক্ষেপটা নিতে হবে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সুযোগ এবং বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই কম। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটেও এ খাতে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। গবেষণা খাতের উন্নয়নে কী ভাবছেন?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রÅvংকিংয়ে এগোতে না পারার অন্যতম কারণ গবেষণা খাতের দুর্বলতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে। এ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোও যাচ্ছে না। কারণ বিগত দেড় দশকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা রাষ্ট্র অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। এর পরও আমরা গবেষণায় আগ্রহ ও সুযোগ-সুবিধা যতটা সম্ভব বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্প্রতি আমরা ‘হিট’ প্রকল্প শুরু করেছি। এর মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দক্ষ শিক্ষকসহ শিক্ষার মৌলিক সুবিধার জায়গাগুলোয় মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বিশেষত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ক্যাম্পাস, অধ্যাপক-সহযোগী অধ্যাপক ছাড়াই চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হলেও এগুলোয় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরিতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে নানা রকম সংকট আছে। এসব সংকট একদিনে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক-সহযোগী অধ্যাপকের মতো পদে সরাসরি নিয়োগ দিতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্প এবং সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে অন্যান্য সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।

আমাদের দেশে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। এ নিয়ে সরকারের কোনো চিন্তা ভাবনা আছে কি?

শিক্ষার্থীরা তো শিক্ষাজীবন শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই যোগদান করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের জন্য ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের দেশে তা এখনো ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা যে ‘হিট’ প্রকল্প শুরু করেছি, তাতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতার বিষয়টি আছে। আমরা ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত যেসব জায়গা থেকে আগ্রহ এসেছে তার বেশিরভাগ মানসম্মত নয়। আমরা চেষ্টা করছি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই উদ্যোগী হতে হবে। একই সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রিগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন এবং উত্তরণে করণীয় কী?

প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্থিতিশীলতার জন্য ছাত্র-শিক্ষক সুসম্পর্ক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের শিক্ষার্থীরা অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ করেছে। তাদের কাছে আমরা ঋণী। রাষ্ট্র ঋণী। রাষ্ট্রকে তাদের আরো অনেক কিছু দেয়ার আছে। তারাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। আগামীর বাংলাদেশকে তারা নেতৃত্ব দেবে। জাতি তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এ কারণে তাদের পড়ার টেবিলে মনোযোগী হওয়া এবং তাদের শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।