নেত্রকোনার হাওর পারের মানুষ বাবুল মিয়া। পড়াশোনা নেই, তবে জমি চাষাবাদে হাত পাকা। ছোটবেলায় বাবার কাছে কৃষিকাজের হাতেখড়ি। ধান চাষ তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিকড়ের মতো। বয়স এখন ৬৫ পেরিয়েছে। বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুম—নিজেই এখনো জমিতে হাল চালান। কখনো গরুর লাঙল, আবার কখনো ট্রাক্টর। বীজতলায় চারা প্রস্তুত করেন যত্ন নিয়ে। সেই চারাগুলো যখন কোমল সবুজ হয়ে ওঠে, তখন সেগুলো রোপণ করেন চাষ করা জমিতে।

ধান গজানোর পর বাবুল মিয়ার চোখে খেলে যায় আনন্দের ঝিলিক। সকালে জমিতে গিয়ে সবুজ ঢেউ দেখে ভুলে যান সব ক্লান্তি। তবে দুশ্চিন্তারও শেষ নেই—হঠাৎ বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি, পোকামাকড়, সার আর কীটনাশকের দাম। তবুও হাল ছাড়েন না। কয়েক মাস পর যখন ধানের শীষে সোনালি রঙের দোলা লাগে, তখন তার বুক ভরে ওঠে আনন্দে। কাটার মৌসুমে গ্রামের মাঠে তখন উৎসবের আমেজ। ধান ঘরে তোলার পর বাবুল মিয়া বাজারে বিক্রি করেন কিছুটা, আর বাকিটা রাখেন সংসারের খাবারের জন্য।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের সাকুয়া গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া ৪৫ বছর ধরে করছেন কৃষিকাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা—ফসলের মাঠই তার ঠিকানা। নিজের জমিতে বোরো ও আমনের পাশাপাশি এখন ভুট্টাও চাষ করেন। সারা বছর ঘরের খাবার খেয়েও প্রায় তিনশ মণ ধান বিক্রি করতে পারেন। নিজেকে তিনি সফল কৃষক হিসেবে দাবি করেন।

ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের জনক বাবুল মিয়া নিজে কৃষিকাজে জড়িত থাকলেও বড় ছেলেকে মাস্টার্স করিয়েছেন। ছোট ছেলে এসএসসি পাস করলেও কৃষিকাজেই মন দিয়েছে। কৃষক বাবুল মিয়া জানান, চাষাবাদের জমি ছাড়াও নিজ বাড়ির এক পাশে একটি গরুর খামারে ১৪টি গরু লালন-পালন করছেন তিনি। আর ওই খামারটি দেখাশোনা করছেন তার স্ত্রী ও ছেলেরা।

কৃষিজীবী বাবুল মিয়া বলেন, ‘একসময় কৃষিপণ্যের দাম ছিল কম। আড়াইশ টাকায় পাওয়া যেত এক বস্তা সার; কামলার (শ্রমিক) মজুরি ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, তা-ও পাওয়া যেত যখন-তখন। কীটনাশকের তো কোনো প্রয়োজনই ছিল না। দেশী ধানের জাত—বিড়ই, পাইজম, মুক্তা নাজিরশাইল, কার্তিকশাইল ফলানো হতো। এছাড়া পাটের আবাদ ছিল ব্যাপক।’

আগের চেয়ে কৃষিকাজ এখন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে দাবি করে বৃদ্ধ বাবুল মিয়া বলেন, ‘আগে গরু দিয়ে হালচাষ করা যেত, এখন প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। সময়মতো হাল (ট্রাক্টর) পাওয়া যায় না। খেতে ধান পাকলে তা কাটার জন্য কামলা (কৃষিশ্রমিক) পাওয়া যায় না। সংকটেরও শেষ নেই—বিদ্যুৎ সংকট, সারের দাম ও সংকট ইত্যাদি। জমিতে দিতে হয় কীটনাশক। কৃষিপণ্যের দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। সে অনুযায়ী ধানের দাম পাওয়া যায় না। তবুও কৃষিকাজ ছাড়া কোনো উপায় নেই আমাদের। লাভ-লসের হিসাব করে তো আর জমি ফেলে রাখা যাবে না। তাই মৌসুম এলেই মাঠে নেমে পড়ি।’

নিজের হাতে ফলানো শস্যের স্বাদ নিয়ে বাবুল মিয়া গর্ব করে বলেন—‘আমরা কৃষক, মাটিই আমাদের ভরসা। এ মাটিরই ফসল খেয়ে দেশের মানুষ বেঁচে আছে।’

লেখক: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা