বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম সংকট ও জমি কমে যাওয়া— এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাত কীভাবে অবদান রাখতে পারে?

বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতারও প্রধান চালিকাশক্তি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আমাদের কৃষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ২০২৪ সালে প্রায় ৬৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন শস্য উৎপাদন করেছেন, যার মধ্যে ধানই ৬০ মিলিয়নের বেশি। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রমাণ করে গ্রামীণ কৃষকের ঘাম ও মাটির প্রতি ভালোবাসাই আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার আসল ভরসা।

তবে এ সাফল্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা, আবাদি জমি হ্রাস এবং শ্রম সংকটের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই কৃষিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা জরুরি—শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদনকে আরো দক্ষ, লাভজনক ও টেকসই করে তোলা। এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথমত, ক্লাইমেট-স্মার্ট ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বাজারজাত; এরই মধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলো খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল উচ্চফলনশীল জাত, জিংকসমৃদ্ধ জাত, হাইব্রিড ধান, ভুট্টা, গম, আলুসহ বিভিন্ন হাইব্রিড সবজি ফসলের বীজ বাজারজাত করছে। এগুলো কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় উভয়ই বাড়াচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ; শ্রম সংকট ও খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ভাড়াভিত্তিক মেশিনারি ব্যবহারের সুযোগ কৃষকদের জন্য বড় সহায়তা। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহারে কৃষক দ্রুত, কম খরচে ও সময়মতো প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও ফাইন্যান্স; মোবাইল অ্যাপ ও ফিনটেক কৃষককে সহজে ঋণ, বাজারদর ও সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগের সুযোগ দিচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমছে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।

চতুর্থত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আকস্মিক বন্যা বা খরার ঝুঁকি বেড়েছে। ইনডেক্সভিত্তিক কৃষি বীমা কৃষকের ক্ষতি কমাচ্ছে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

পঞ্চমত, পোস্টহারভেস্ট ব্যবস্থাপনা ও ভ্যালুচেইন; সবজি ও ফল কর্তনের পর দেশে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ডচেইন, আধুনিক গুদাম ও পরিবহনে বিনিয়োগে ক্ষতি কমাবে, ভোক্তা তাজা খাদ্য পাবেন, কৃষক ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবেন এবং অর্থনীতি হবে আরো শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করলে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য সহজেই রফতানির বাজারে প্রবেশ করবে।

আমাদের কৃষি আরো উৎপাদনশীল হওয়ার সক্ষমতা রাখে। সরকারের সহায়ক নীতি এবং বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ মিলেই কৃষিকে আরো শক্তিশালী, টেকসই ও বিশ্বমানসম্পন্ন করে তুলতে পারে।

কৃষিপণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের কী সম্ভাবনা রয়েছে? এক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা দরকার?

বাংলাদেশ কৃষিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—ধান, সবজি, ফল, মাছ ও পোলট্রিতে আমরা আত্মনির্ভরতার পথে অনেক দূর এগিয়েছি। এখন সামনে নতুন এক সুযোগ—কৃষিপণ্য রফতানি। বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর আমাদের কৃষি সেই চাহিদা পূরণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষিপণ্য রফতানিতে সম্ভাবনার যেসব ক্ষেত্র রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প তৈরি করা। যেমন বর্তমানে ভোজ্যতেল, চিনি, গম, ডাল, স্টার্চ, সুগন্ধি চাল, ফল ও প্রসেসড ফুডের জন্য বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ এগুলো দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। স্থানীয় উৎপাদন শুধু আমদানিনির্ভরতা কমাবে না, বরং রফতানির নতুন সুযোগও তৈরি করবে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে হালাল ফুড, সবজি, ফল, ডাল ও সুগন্ধি চালের চাহিদা বাড়ছে। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশী সবজি ও ফল ভালো বাজার পেয়েছে।

বাংলাদেশে শুধু কাঁচা পণ্য নয়, বরং শুকনো সবজি, প্যাকেটজাত চাল বা রেডি-টু-কুক ফুডের মতো প্রক্রিয়াজাত ও ব্র‍্যান্ডেড খাদ্যপণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও বহুগুণ মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন) সম্ভব।

কৃষিপণ্য রফতানি বাড়াতে নীতিগত যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে সুগন্ধি চাল, ফল, সবজি বা ডালের জন্য বিশেষ অঞ্চল নির্ধারণ ও নিবিড় চাষের মাধ্যমে ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদনের সুযোগ বাড়ানো। আধুনিক কারখানায় কর সুবিধা ও স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে অ্যাগ্রো প্রসেসিং ও ভ্যালু অ্যাডিশনে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। কৃষিপণ্যে মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে HACCP, ISO, Global GAP ইত্যাদি সনদ প্রাপ্তি সহজীকরণে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হয়। লজিস্টিকস ও কোল্ডচেইন খাতে দ্রুত পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক কার্গো সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। আর বাজার তৈরিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, রফতানি প্রচার মিশন ও আন্তর্জাতিক ফুড ফেয়ারে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে বিশ্বমানের প্যাকেজিং অপরিহার্য। আর কোন কোন দেশে কোন কোন পণ্যের চাহিদা বেশি— এ সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে বেসরকারি খাত লক্ষ্যভিত্তিক রফতানি কৌশল নিতে পারে। আর স্থানীয় সংগ্রহ থেকে আধুনিক কোল্ডচেইন হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত পণ্য পাঠানো পর্যন্ত বেসরকারি খাতের শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক অবকাঠামো রফতানিকে সহজ করবে।

বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রফতানি সম্ভাবনা সীমাহীন। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ, মানসম্মত ব্র‍্যান্ডিং ও কার্যকর বাজার সংযোগের মাধ্যমে আমরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারি। সরকারের নীতিগত সহায়তা আর বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে একত্র করা গেলে কৃষি শুধু খাদ্যনিরাপত্তার ভরসা নয়, বরং রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন শক্তিও হয়ে উঠবে।

কৃষকরা প্রায়ই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না বলে অভিযোগ করেন। তাদের ন্যায্যমূল্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়? এসিআই বিষয়টিকে কীভাবে মোকাবেলা করে?

এসিআইয়ের মূল লক্ষ্য হলো কৃষককে সমৃদ্ধিশালী ও লাভজনক করা। আমাদের বিশ্বাস কৃষক লাভবান হলেই কৃষি হবে টেকসই, আর খাদ্যনিরাপত্তা হবে স্থায়ী। এজন্য আমরা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো, বাজার সংযোগ তৈরি এবং ফসল সংরক্ষণ পর্যন্ত কৃষির প্রতিটি ধাপে বাস্তবসম্মত সমাধান দিচ্ছি। বিশ্বমানের জাত উদ্ভাবন ও ইনপুট সরবরাহের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের দিচ্ছি আধুনিক সমাধান— উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, খরা ও রোগবালাই সহনশীল জাত, সুষম সার এবং কার্যকর ফসল সুরক্ষা প্রযুক্তি। এর মধ্যে গবেষণায় আমাদের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। যেমন দেশের প্রথম সুগন্ধি ছোট দানাবিশিষ্ট বোরো ধান এসিআই ধান২, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানির সম্ভাবনা তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, হেক্টরপ্রতি প্রায় আট টন ফলনক্ষম ও ১৪০ দিন মেয়াদি ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত এসিআই ধান৩, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমায়। বেসরকারি খাতে প্রথমবারের মতো উচ্চ গ্লুটেন (৩২ দশমিক ৪ শতাংশ) ও প্রোটিন (১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ) সমৃদ্ধ, হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৮ টন ফলনক্ষম এসিআই গম১ ও গম২ বাজারে আনা হয়েছে, যা স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক। বছরে দুবার চাষযোগ্য ভ্যালেন্সিয়া আলু, যা উচ্চ ফলনশীল (৪০-৪৫ টন/হেক্টর), রফতানিযোগ্য এবং শিল্পপ্রক্রিয়াজাত উপযোগিতা দিয়ে কৃষকের জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে। আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন দল নিয়মিত নতুন হাইব্রিড জাত ও প্রযুক্তি বাজারে আনছে, যা কৃষকদের প্রতি হেক্টরে বেশি ফসল তুলতে এবং ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তা করছে।

এছাড়া, যান্ত্রিকীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য জমি প্রস্তুতি, রোপণ, সেচ থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত আমরা চালু করেছি আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার ও কম্বাইন হারভেস্টার। ফলে কৃষকের শ্রম খরচ কমছে, সময় বাঁচছে এবং ফসল সময়মতো ঘরে তোলা যাচ্ছে।

পোস্টহারভেস্ট ক্ষতি কমাতে আমরা কোল্ডচেইন, গুদামজাত ও শস্য শুকানোর প্রযুক্তি সরবরাহ করছি, যাতে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। কৃষকরাও ফসল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে ভালো দামে বিক্রি করতে পারছেন। বাজার সংযোগ ও মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে আমাদের রিটেইল চেইন স্বপ্ন কৃষকের পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক কৃষি ও প্রসেসিং কার্যক্রম কৃষকের জন্য নিশ্চিত বাজার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করছে।

এসিআই বিশ্বাস করে কৃষকের লাভজনকতা মানে শুধু তার পরিবারের সমৃদ্ধি নয়; বরং সেটিই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি। আমাদের উদ্ভাবন কৃষকের আয় যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশকে করছে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর কতটা এগিয়েছে? স্থানীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এসিআই?

বাংলাদেশের কৃষি এখন দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। আজ কৃষক মাঠেই মোবাইল ফোনে বাজারদর জানতে পারছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচ্ছেন। এ পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মের সমন্বয়ে কাজ করছে এসিআই।

আমরা শুধু ইনপুট সরবরাহ করছি না; বরং কৃষকের সঙ্গে তৈরি করছি শক্তিশালী ডিজিটাল সেতুবন্ধন। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, লিংকডইন ও এসএমএসসহ মাল্টিচ্যানেল কমিউনিকেশনের মাধ্যমে কৃষক মাঠেই বাজারদর ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে যাচ্ছেন। রিয়েলটাইম অ্যাডভাইজরি যেমন রোগ-পোকার সতর্কতা, সেচ ও সার প্রয়োগের পরামর্শও মুহূর্তেই তাদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।

মেকানাইজেশনের দিক থেকে এসিআই সারা দেশে ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও ড্রায়ার চালু করেছে, যা রেন্টেড সার্ভিস মডেলের মাধ্যমে ছোট কৃষকেরও নাগালে এসেছে। ফলে সময়মতো ফসল তোলা, খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

স্মার্ট ফার্মিংয়ে আমরা এনেছি সেন্সরভিত্তিক সেচ, ড্রোন স্প্রে এবং প্রিসিশন ফার্টিলাইজার অ্যাপ্লিকেশন, যা একদিকে ইনপুট সাশ্রয় করছে, অন্যদিকে ফলন বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক কোল্ডচেইন ও প্রসেসিং অবকাঠামো কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া কমাচ্ছে এবং ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ তৈরি করছে।

অর্থাৎ গবেষণা থেকে ডিজিটাল প্লাটফর্ম, যান্ত্রিকীকরণ থেকে পোস্টহারভেস্ট সমাধান—সব দিকেই এসিআই আজ কৃষকের এক পূর্ণাঙ্গ অংশীদার, যা কৃষিকে করছে আরো উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই।

সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা খাতে কী ধরনের সংস্কার ও পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন? সেখানে বেসরকারি খাত কীভাবে এগিয়ে আসতে পারে?

খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি নির্ভর করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক ভ্যালুচেইন, সংরক্ষণ, বাজার সংযোগ এবং ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী দামে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেয়ার সক্ষমতার ওপর। তাই আজ ‘ফার্ম থেকে প্লেট’—এ সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে সংস্কার দরকার।

নীতি ও সংস্কারের ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ দরকার; তার মধ্যে শুরুতেই কৃষকের ভালো মানের ফসল আলাদা দামে কেনার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে গুণগত উৎপাদন বাড়ে। ডিজিটাল ওয়্যারহাউজ রিসিপ্ট সিস্টেম চালু করলে কৃষক গুদামে শস্য রেখে এর বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন এবং কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। নতুন জাত বা প্রযুক্তি বাজারজাতের জন্য রিলিজ ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজ হওয়া প্রয়োজন। কৃষি গবেষণা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকারি তহবিল সহায়তা নিশ্চিত করাটাও অপরিহার্য। আমদানি ও রফতানি নীতি বেসরকারি খাতের জন্য সুবিধাজনক হলে কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হবে।

আর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত ক্লাইমেট-স্মার্ট নতুন হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, উন্নত সার ও ফসল সুরক্ষা প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া, যান্ত্রিকীকরণ বাড়িয়ে শ্রম ও খরচ কমানো, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও ফিনটেকের মাধ্যমে বাজারদর, আবহাওয়ার তথ্য ও সহজ ঋণ বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে এ সংস্কারের সুফলগুলোকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া ইনডেক্সভিত্তিক ফসল বীমা চালু করে জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস এবং পোস্টহারভেস্ট ক্ষতি কমানোর জন্য কোল্ডচেইন, আধুনিক গুদাম ও প্রসেসিংয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমেও বেসরকারি খাত তার ভূমিকা রাখতে পারে।

এসিআই এরই মধ্যে স্বপ্ন রিটেইল চেইনের মাধ্যমে কৃষকের পণ্য সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জার্মপ্লাজম ও দক্ষতা ভাগাভাগি করে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে দ্রুত উদ্ভাবনী সমাধান কৃষকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সহায়ক নীতি, গবেষণা সহায়তা ও বাজার সংস্কার যেমন অপরিহার্য, তেমনি বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ সমন্বিত প্রচেষ্টা বাংলাদেশের কৃষিকে করবে আরো লাভজনক, আধুনিক ও বিশ্বমানসম্পন্ন।