এক বছরের বেশি সময় হয়েছে দায়িত্ব নিয়েছেন। এর মধ্যে অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে প্রধান উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে যদি বলতেন...

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের আলাদা কাজ। এগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে জিডিপিতে অবদান রাখছে। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মৎস্য ও প্রানিসম্পদ দীর্ঘদিন থেকে কৃষির অধীনে একটি উপখাত হিসেবে আছে। আমি এই ধারণাকে বদলাতে চাই। কৃষিকে দুটি দিক থেকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, এটিকে অন্যায় বলব না, এটি যৌক্তিক। কারণ এটি খাদ্য উৎপাদনের প্রধান জায়গা। পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি সবকিছু কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কৃষি বলতে আমরা মন্ত্রণালয়ের বাইরে গিয়ে যেটি বুঝি সেখানে শুধু ফসল উৎপাদন থাকে না। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন সবই একটি কৃষকের বাড়ির চরিত্র। কিন্তু সচিবালয়ে আসলে সেটি আলাদা। এর মন্ত্রণালয় আলাদা, ভবন আলাদা, কার্যক্রমও আলাদা। এটি কৃষির অধীনে উপখাত হয়ে আছে, ফলে গুরুত্বও কম। কৃষিতে চাল, ডাল, সবজি উৎপন্ন হচ্ছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাবার। এসব ছাড়া আমাদের চলবে না। পাশাপাশি মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ছাড়াও তো চলবে না—কথাটা কেউ বুঝছে না। নিরামিষভোজীরা বলতে পারে তাদের মাছ-মাংস লাগে না। কিন্তু তাদের পনির বা দুধ ঠিকই লাগছে। প্রাণিসম্পদের সঙ্গে জীবন-জীবিকাও যুক্ত। কৃষির জন্য জমি লাগে কিন্তু পশুপালনের জন্য আলাদা জমি লাগে না। তার বাড়িতেই হাঁস, মুরগি, গরু-ছাগল পুষতে পারে। এটি তাকে এগিয়ে নেয়। এটি তার জীবনধারণের মাধ্যম হয়ে যায়। সেজন্য আমি এটিকে কোনো অবস্থায় আলাদা করতে পারি না। এটিকে উপখাত ভাবতে পারি না। এটি একটি সমন্বিত খাত। পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পাওয়ার মতো খাত। এটিকে আমি প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

এটি আন্তঃসম্পর্কীয়। কোনোটি বেশি কোনোটি কম না, আন্তঃসম্পর্কটাই আমাদের সৌন্দর্য। কিন্তু এটিকে আমরা ভাগ করে ফেলেছি। এটিকে আমরা বলছি লাইভস্টক, আবার এটিকে বলি ফিশারিজ। ফিশারিজের মধ্যে আবার দেখি উৎপাদনের কথা বলছি আমরা। মাছে উৎপাদন বলে কিছু নেই। এককভাবে মাছের উৎপাদন যেটি হয়, সেটি অ্যাকুয়াকালচার বা মাছ চাষ। যেটি আমার পুকুরে করি। কিন্তু মূলত মাছ হচ্ছে আহরণ। সেটি জলাশয়, নদী, সমুদ্র, হাওর-বাঁওড় থেকে আসবে। তেমন কত উৎস রয়েছে। এসব উৎস রক্ষা করলে আমার উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু খুব দুঃখজনক হলো এই আহরণ করা মাছের সংখ্যা কমছে। চাষ করা মাছের দিকে আমরা ঝুঁকে যাচ্ছি। এটির দিকে নজর না দেয়াটা একটি কারণ। নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমরা পরিবেশের দিক দিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছি, কিন্তু মাছের জন্য উদ্বিগ্ন হচ্ছি না। রাজস্বের জন্য জলাশয় এমন লোকের হাতে দিচ্ছি যারা মৎস্য নিয়ে কাজ করছে না। তারা অন্য কাজ করছে। এখানে রাজস্ব পেয়ে সরকার খুশি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার শাস্তি হওয়ার কথা ছিল। সেটি হচ্ছে না। মৎস্যজীবী ছাড়া কোনো জলাশয় ইজারা হতে পারে না। এটি অনৈতিক কাজ। আমি কীভাবে সংস্কার আলাদা করব, চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন করতে হবে।

আপনি বললেন, এটি একটি উপখাত না। এটি যে উপখাত না, এর নিজস্ব পরিচয় আছে—এটি প্রতিষ্ঠা করতে কী কী পদক্ষেপ নিলেন আপনারা?

এ খাতকে একদিকে কৃষির উপখাত বলা হচ্ছে। আবার অন্যদিকে কৃষিতে সেচের জন্য যে বিদ্যুতের দাম আছে সেটি আমাদের দেয়া হচ্ছে না। এখানে দিতে হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা বাণিজ্যিক মূল্যে। এটি কেন? এটি বৈষম্য। একটি হচ্ছে বৈষম্য, আরেকটি হচ্ছে অজ্ঞতাপ্রসূত। এটাতে অজ্ঞতা আছে। না বোঝার বিষয় আছে। আমি পোলট্রি খামারিদের বলেছি, আপনারাই এটিকে শিল্প ঘোষণা করেছেন। এটিকে শিল্প ঘোষণা ভুল ছিল। এটি করে তাকে বিদ্যুৎ বিল বেশি দিতে দিচ্ছে। তার ভর্তুকি নেই। কৃষির জন্য সারে ভর্তুকি দেয়া হয়, তাহলে এ খাতের ফিডে কেন ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে না? এটি না দেয়ার কারণে প্রাইভেট খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি। ফলে বাধ্য হচ্ছি বেশি দামে কিনতে। কিন্তু এখানে যদি সরকারি ভর্তুকি থাকত তাহলে এমন হতো না। এখন প্রশ্ন উঠবে—ভর্তুকি দিয়ে কি অর্থনীতি চলতে পারে? না পারলে ভর্তুকি ভাগ করে দেন। কৃষি ভর্তুকির ৩৪ হাজার কোটির টাকা মধ্যে এ খাতে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা দিলেও আমি অনেক কিছু করে দেব। এ জায়গাগুলো পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি।

আপনারা এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছেন যখন দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম ছিল। এসব চর্চা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কী করলেন?

যারা কর্মকর্তা আছেন তাদের এ বিষয়ে আমরা খুব জোরালোভাবে বলে দিয়েছি। যেমন নিষিদ্ধ সময়ে (ব্যান পিরিয়ড) যখন মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করি, তখন প্রতিটি মৎস্যজীবী পরিবারকে ৪০ কেজি করে খাদ্যপণ্য প্রণোদনা দেয়া হয়। এসব নিয়ে অভিযোগ আসে, যারা প্রকৃত মৎস্যজীবী তারা পায় না, অন্যরা পায়। সেজন্য আমরা প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নিবন্ধন করছি। ফলে যারা অবৈধ সুবিধা পেত তারা চিহ্নিত হবে এবং প্রকৃতরা সুবিধা পাবে।

আমরা এক ধরনের তথ্যবিভ্রাট ও সমন্বয়হীনতা দেখি। এটির কারণে এ খাতের উন্নয়নও ব্যাহত হয়। সেই জায়গায় কী করা যেতে পারে?

এ খাতে পরিকল্পনাও ঠিকমতো নেয়া হয় না। এখানে তথ্যবিভ্রাট আছে। আমি যে কয়দিন দায়িত্বে আছি এর মধ্যেই তথ্যের উৎসগুলোকে ঠিক করব। তথ্য ঠিক না থাকার কারণে এ খাতের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সঙ্গে দুই কোটি মানুষ যুক্ত নাকি সাত লাখ—এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গবাদিপশুর সঠিক সংখ্যাও পাচ্ছি না। কৃষি পরিসংখ্যান বুক বের হচ্ছে। সেখানে কত মণ ধান, আলু ইত্যাদি চাষ হচ্ছে তার তথ্য আছে। কিন্তু কতজন কৃষক এসব চাষ করছেন তার পরিসংখ্যান নেই। একইভাবে মাছের তথ্য থাকলেও মৎস্যজীবীর কোনো তথ্য নেই। আমরা চাই সঠিক তথ্য থাকুক। তথ্য ঠিক থাকলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট করা যাবে।

আপনি ইকো-সিস্টেমের কথা বললেন। প্রাকৃতিকভাবে একটি ইকো-সিস্টেম ছিল, আমরা সেটিকে নষ্ট করে ফেলেছি। এখন কৃত্রিমভাবে হলেও কি সেই ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে পারি?

‘লিভ মি অ্যালন’ বলে আমরা একটি কথা বলি। যখন একা থাকতে চাই তখন এই কথাটি বলি। পরিবেশও মাঝে মাঝে বলে আমার জন্য তোমার কিছুই করতে হবে না, শুধু আমাকে একা ছেড়ে দাও। আমাকে বিরক্ত করো না। প্রকৃতি কিন্তু ফিরে আসে। বিরক্ত বলতে আমি পরিবেশ দূষণের কথা বলছি। আমরা যখন রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা বানাচ্ছি—এতে পরিবেশের কতটা ক্ষতি হচ্ছে তা মনে রাখছি না। কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন যে সড়কটি করা হয়েছে—এর নাম দেয়া হয়েছে অল ওয়েদার সড়ক। ফলে মাছের চলাচল নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সড়ক বিভাগকে অনুরোধ করেছি মৎস্য বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমীক্ষা করতে। এরপর যেখানে প্রয়োজন সেখানে কালভার্ট বসাতে। কিছুটা টেকনিক্যাল পরিবর্তন আনতে। যাতে পানিপ্রবাহ ও মাছের চলাচল ঠিক থাকে। আশা করছি দ্রুতই এ বিষয়ে আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাব। এ সড়কটি করতে গিয়ে পুরো হাওরের ইকো-সিস্টেমে আঘাত এসেছে, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি। উল্টো পহেলা বৈশাখের সময় আলপনা তৈরি করা হয়েছে। যেটি করে কেমিক্যাল মিশিয়েছে হাওরে। তবে এটি সত্য সড়কটির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পরিবেশের প্রতি নির্দয় আচরণ করা হয়েছে। এরপর হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ বা রাস্তার কথা আসছে। এগুলোর কারণে হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার ভুক্তভোগী হচ্ছে মানুষ। এসব সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমি আশা করছি যে, প্রকৌশলীদের কাছ থেকে ইটনা-মিঠামইনের রাস্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সেপ্টেম্বরে পাওয়া যাবে। কেননা, শুকনো মৌসুমে রাস্তা থেকে পানি নেমে গেলে এ কাজটা করা সম্ভব হবে। আবার, হাওড়-বাঁওড়ের মৎস্যজীবীদের সঙ্গে মিটিংয়ে বসলে তারা খুব অসহায়ভাবে কিছু সমস্যার কথা বলে থাকে, যেমন-অপরিকল্পিত বাঁধ, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট। শিক্ষিত লোকেরা নীতিনির্ধারণীতে বসে এ রকম পরিকল্পনাহীন রাস্তাঘাট তৈরি করে তথাকথিত উন্নয়নের কথা বলে। আর সেটার ভুক্তভোগী হন আমাদের দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, জেলেরা।

দুগ্ধজাত দ্রব্য ও প্রাণিজ আমিষের পণ্যগুলোর দাম অত্যন্ত বেশি। আর দামের প্রসঙ্গে প্রথম প্রশ্ন যেটা আসে সেটা হলো, মূল্য নির্ধারণে সরকার কোনো পদ্ধতির কথা ভাবছে কিনা?

দুগ্ধজাত দ্রব্য ও প্রাণিজ আমিষের (মাছ, মাংস, ডিম) দাম কমানোর সুযোগ সীমিত। এখানে দুটি মূল বিষয় হলো—প্রথমত, বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা-জোগানের ওঠাপড়ার ওপর দাম নির্ভর করে। আর মৌসুমভেদে নানা রকম কারণে দামের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তাছাড়া সারাটা বছর তো আর এক রকম যায় না। বন্যা, খরাসহ নানা রকম দুর্যোগের শিকারও হতে হয়। সেজন্য আমরা ‘‌সারা বছরের জন্য এক পরিকল্পনা’ করতে পারি না।

‘‌কেন আমরা পোলট্রির দাম নির্ধারণের জন্য সারা বছরের পরিকল্পনা করতে পারি না? শুধু এ হিসাবে না গিয়ে আমরা যদি উৎপাদনকারীদের জন্য বাজার ও মূল্যসহায়তা (মার্কেট ও প্রাইস সাপোর্ট) নিয়ে কাজ করি সেটাও বাজারে ভারসাম্য আনতে সাহায্য করবে। উৎপাদনকারীদের ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকার মতো সক্ষমতার ব্যবস্থা করা উচিত। কেননা, অনেক সময় দাম এতটা পড়ে যায় যে তার সঙ্গে মিল রেখে উৎপাদন খরচ একদমই কমেনি। বিদ্যুতের রেট কমেনি, খাদ্য-ওষুধ ও শ্রমের মজুরিও আগের মতোই আছে; তাহলে উৎপাদন খরচ না কমে বরং আগের মতো বা তার চেয়ে বেশিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে দাম কমানোর ফলে উৎপাদনকারীদের, ব্যবসায়ীদের আয় কমে যাচ্ছে। এ আয়ে তাদের খরচই উঠছে না।

এছাড়া ভর্তুকি দেয়ারও একটা বিষয় আছে। ধরা যাক, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যখন বাজারে চাহিদা বেশি থাকে, ব্যবসায়ীরা অনেক আয় করেন। কিন্তু আবার বছরের যে সময়টাতে ওদের এ আয়-ইনকাম থাকবে না তখন সাবসিডি দেয়া যায় কিনা। এতে ক্রেতারাও ভালো থাকবেন আবার আমাদের ব্যবসায়ীরাও ভালো থাকবেন। কিন্তু ব্যবসায়ীকে মেরে ফেলে ক্রেতাকে সুবিধা দেয়ার যে সামগ্রিক ক্ষতি; সেটা নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

একই কথা কৃষি ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন বাম্পার ফলন হলে কৃষককে অতি অল্প দামে—২ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি করতে হয়, সেই আলু আবার ৪০ টাকা কেজিতে ঢাকায় বিক্রি হয়। পণ্যমূল্যের ওপর কোনো নীতি প্রণয়ন করা অথবা পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কৃষিদ্রব্য যেহেতু দ্রুত পচনশীল তাই দাম নির্ধারণীতে সেটা শিল্পপণ্যের মতো কাজ করবে না।

সেজন্য আমার মূল চেষ্টার জায়গাটি হলো, উৎপাদন খরচের জায়গায় কিছু কাজ করা। কেননা, এটা কমাতে পারলে কৃষিপণ্যে আর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির দরকার হবে না। কৃষিতে যন্ত্রপাতির দাম কমানো, বাজার সুরক্ষা, ফিডসহ গবাদিপশু খাদ্যের দাম কমানো, সরকারিভাবে চারা, পোনা সরবরাহ—এগুলো আমরা করতে পারি কিনা সেটা দেখছি। এছাড়া আমরা নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যায়-দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। সিন্ডিকেট করে ফিডের দাম বাড়ানো, এমনকি দেখা যায় অনেক সময় বাজার কোম্পানি দ্বারা নয়, ডিলারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ জায়গাগুলোয় শক্তিশালী রেগুলেটরি ম্যাকানিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এ খাতে দেশের বিরাট একটা অংশ রয়েছে অনিবন্ধিত খামারি হিসেবে। তাদের অর্থসহায়তা বা প্রণোদনার লক্ষ্যে সরকার কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কিনা?

অর্থায়নের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সরকারের কিছু সংকট আছে। কিন্তু বিকল্প একটা অর্থায়নের কথা চিন্তা করাই যায়। আমাদের দেশে এ রকম অনেক অর্থায়নের উৎস আছে, যেমন ক্ষুদ্র ঋণ থেকে নেয়া যেতে পারে, গ্রামীণ অর্থায়নের উৎস আছে। এমনকি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করেছে যে, কৃষিসহ অন্যান্য ব্যাংক কৃষি খাতে যে ২০ শতাংশ ঋণ দেয় এখন সেটার আওতায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও তা দেয়া হবে। এমনকি এ খাতে ঋণের উৎস তৈরি করার জন্য আমরা এখন কিছু বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গেও কথা বলছি যাদের সুনাম আছে।

রফতানি বাজারে টিকে থাকতে ইইউ(ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ন্যাশনাল রেসিডিউ কন্ট্রোল প্ল্যান (এনআরসিপি) ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কারে মন্ত্রণালয় কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে?

মাংস রফতানি করার ক্ষেত্রে রোগমুক্ত করা একটা বড় মানদণ্ড। এটা আমরা যেকোনো দেশ থেকে যদি আমদানি করতে চাই প্রথমেই গরুতে ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজি, লাম্পি স্কিন ডিজিস (এলএসডি), বার্ড ফ্লুমুক্ত কিনা সেটা জানতে চাই। সম্প্রতি আমি জেনেছি অস্ট্রেলিয়ায় ডিমই পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ওদের দেশে কোথায় যেন একটা বার্ড ফ্লু হয়েছে, ওরা সব ডিম বন্ধ করে দিয়েছে। তাই এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাবের যে জায়গাগুলো সেগুলো আমাদের আগে বন্ধ করতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে এটাই হবে আমাদের এক নম্বর পদক্ষেপ।

এটার জন্য ভ্যাকসিন খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমাদের ভ্যাকসিন আমদানি করতে হবে। আমরা সীমিতভাবে কিছু উৎপাদন করি। লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যা উৎপাদন করে পরিমাণে তা যথেষ্ট না। প্রাইভেট সেক্টরও আমদানি করে। তবে সেগুলো আবার অনেক বেশি দামে তারা বিক্রি করে। আমরা চেষ্টা করছি একটা ভ্যাকসিন প্লান্ট স্থাপন করার। আমরা যদি ভ্যাকসিনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি তাহলে আমাদের গবাদিপশু রোগমুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ, পিপিআর, এলএসডিমুক্ত গবাদিপশু উৎপাদন করতে হবে।

দুই নম্বর আমাদের ল্যাবরেটরি আছে, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি। যেগুলো রফতানির জন্য মানদণ্ড মেনে সনদ দিতে পারবে। বুঝতে হবে এগুলো খাদ্য, যে দেশের মানুষই খাক না কেন সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অপরাধের পর্যায়ে পড়বে। শুধু মাংসকে ফাইনাল প্রডাক্ট ধরে সেফটি নিশ্চিত করলে হবে না, এ গবাদিপশুটা যা খেয়েছে সেটির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের মধ্যে বিশেষ করে পোলট্রি খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের একটা অভিযোগ পাওয়া যায়? দায়িত্বকালে এ অভিযোগের কোনো যথার্থতা পেয়েছেন?

ব্যক্তি খাতে যখন কথা বলেছি তাদের মধ্যে সিন্ডিকেটসুলভ আচরণ আমি দেখিনি। তারা তাদের ব্যবসাটাকে প্রসার ঘটাতে চায়। কিন্তু সিন্ডিকেট বলতে যে একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব ওটা আমি দেখিনি। ওরা কেউ প্রতারক চক্র না, অন্তত পোলট্রি সেক্টরে। যদিও তারা ওদের মনগড়া দাম রাখছে, তারা ওলিগোপলিস্টিক একটা সিস্টেম গড়ে তুলছে সেখানে তাদের সঙ্গে আমাদের একটু কথাবার্তা বলতে হবে। কিন্তু তারা সার্বিকভাবে দেশের পোলট্রি সেক্টরকে টিকিয়ে রেখেছে। এটার জন্যই সাধারণ মানুষ কিছু না হোক একটা ডিম হলেও খেতে পারছে। ওদের একেবারে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে এ সেক্টরকে উন্নত করা সম্ভব।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে এমন কোনো বিষয় আছে যেটা বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ইজারা বিষয়টি অনেক বড় একটা ব্যাপার। জল যার জলা তার—এটা ছিল এক কালে। কিন্তু বর্তমানে জলাশয়ের মালিকানায় মৎস্যজীবীদের পাচ্ছি না। ইজারা দেয়ার যে সিস্টেমটা গড়ে উঠেছে, সেখানে রাজস্বকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কিন্তু জীবিকাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না, মৎস্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা যথেষ্ট সহানুভূতির সঙ্গে আমাদের কথা শুনছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা করছেন। আমাদের একত্রে আরো কিছু কাজ করার আছে। আর ইজারার সিস্টেমটা বদলাতেই হবে। আর একটা ব্যাপার—যেখানে উৎপাদন বা আহরণ হয়, সেখান থেকে ঢাকায় আসার পরিবহন পদ্ধতি খুব নাজুক। ঢাকায় দুধ আনার জন্য কোনো কুল ভ্যান নাই, চিলিং কোনো স্টেশন নাই। এখানে যদি বিনিয়োগ করা হয়, প্রাইভেট সেক্টরের সহায়তা নিয়েও যদি বিনিয়োগ করা হয় বাংলাদেশে দুধ আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। বাংলাদেশ বহু দিক থেকে পরিবর্তন দেখতে পারবে। অনেক হতাশা আছে, কিন্তু এর মধ্যেও আমি অনেক আশাবাদী।