দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় সেবা দিয়ে আসছে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের ইনফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ সেন্টার। শুরু থেকে এ হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত আছেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট

ডা. রেহনুমা জাহান। দেশে আইভিএফের যাত্রা, প্রসার ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারিন জাহান সিগমা

আইভিএফ সেবার প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাদেশ কি উন্নত দেশগুলোর সমতুল্য?

আমি মনে করি, আমাদের দেশের ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) সেবা উন্নত বিশ্বের সমমানের। কারণ বাংলাদেশে আইভিএফের সেবা শুরু হয়েছে অনেক দিন আগেই। ১৯৯৯ সালে এ দেশে প্রথম শুরু হয়েছে। স্কয়ার হাসপাতালে শুরু হয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। তার মানে, একটা লম্বা সময় বাংলাদেশ এবং স্কয়ার হাসপাতাল আইভিএফ সেবাটা দিয়ে যাচ্ছে। গুণগত মান যদি আমরা বলি, অবশ্যই এটা বিশ্বমানের। উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তিতে যেভাবে এগিয়ে আছে, বাংলাদেশও সেভাবে এগিয়ে আছে। কিছু সীমাবদ্ধতা তো দেশে আছেই। আমাদের ছোট দেশ। যেহেতু আমাদের সব জিনিস সীমিত, সেহেতু কিছু সীমাবদ্ধতা আমাদের থাকেই। যেমন আইভিএফের ক্ষেত্রে যদি আমরা বলি, আমাদের কাছে আইভিএফের প্রযুক্তি তো আছে। পাশাপাশি ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজেমিক স্পার্ম ইনজেকশন দেয়ার প্রযুক্তিও আমাদের আছে। মোটামুটি ভালো ফ্রোজেন অ্যাম্ব্রোয়ো প্রতিস্থাপনে যেসব প্রযুক্তি—সব প্রযুক্তি আমাদের খুব উন্নত মানের। এখানে ফার্টিলিটি প্রিজারভেশন আছে। যারা হয়তো এ মুহূর্তে সন্তান নিতে পারছেন না অথবা কোনো কারণে সোসিও-ইকোনমিক (আর্থসামাজিক) অবস্থা বা ক্যারিয়ারের জন্য দেরিতে সন্তান নিতে চান, তাদের জন্য ফার্টিলিটি প্রিজারভেশনের সুযোগ আমাদের হাসপাতালে রয়েছে। মোটামুটি সব ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশে আছে বলে মনে করি। শুধু কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে আমার ধারণা। যেমন কারোর হয়তো এগের (ডিম্বাণু) সংখ্যা কম বা স্পার্মের সংখ্যা কম। সেসব ক্ষেত্রে হয়তো ডোনার এগ নিতে হয় বা স্পার্ম নিতে হয়, সারোগেসি করতে হয়—সেগুলো যেহেতু আমাদের কিছুটা সামাজিক, ধর্মীয় কিছু বিধিনিষেধের মধ্যে আমরা থাকি—সেই লিমিটেশন ছাড়া আর কোনো লিমিটেশন আছে বলে আমি মনে করি না।

২০০৬-২৫ এ ১৯ বছর ধরে কাজ করছেন। এ দীর্ঘ সময়ে বন্ধ্যাত্বের হার কি বেড়েছে নাকি কমেছে?

বর্তমানে অনেক পার্থক্য। তখন যেমন রোগী ছিল এখন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। পুরো বিশ্বেই ইনফার্টিলিটির (বন্ধ্যাত্ব) রোগী বেড়েছে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশেও বেড়েছে। বলা হয় যে পুরো বিশ্বে এখন ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বন্ধ্যাত্বে ভুগছে। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। পুরুষ বন্ধ্যাত্ব এবং স্ত্রী বন্ধ্যাত্ব সমান পর্যায়ে বেড়ে গেছে। এখন আমরা অনেক অনেক রোগী পাই, আসলে বয়সের সীমাবদ্ধতা নেই এখন। খুব অল্প বয়সী আমরা যেমন বন্ধ্যাত্ব রোগী পাচ্ছি। এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজনন সক্ষমতা কমে গেছে এমন রোগীও পাচ্ছি।

ফার্টিলিটি কমে যাওয়ার পেছনে মোটা দাগে কী কী কারণ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ফার্টিলিটির অনেকগুলো ফ্যাক্টর থাকে। বিভিন্ন কারণে মানুষ বন্ধ্যাত্ব বরণ করে। একেকজনের একেক কারণে হয়। তবে আমরা খুব সাধারণ যে ব্যাপার লক্ষ করেছি সেটি হলো স্থূলতা বা ওবিসিটি। মেয়েদের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)। এটিও বর্তমানে আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করছি। পুরুষদের ক্ষেত্রে স্থূলতার কারণে বন্ধ্যাত্ব হচ্ছে। দ্বিতীয় হলো, এন্ড্রোমেট্রোসিসের খুব প্রকোপ হয়েছে। এন্ড্রোমেট্রোসিসের কারণে এগের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। টিউব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জরায়ু ভালো কাজ করতে পারছে না। সে কারণে বন্ধ্যাত্ব হচ্ছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এনভায়রনমেন্টাল ফ্যাক্টর (পরিবেশগত কারণ) আছে বলে আমার ধারণা। পলিউশনের (দূষণের) কারণে স্পার্মের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। স্পার্মের মোটিলিটি কমে যাচ্ছে। ভালো চেহারার, ভালো কোয়ালিটির স্পার্ম কমে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে খুব কমন একটা কারণ আমরা খুঁজে পাই, যেটা হচ্ছে এগের রিজার্ভ কমে যাওয়া। এগের রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণটা কিছুটা এনভায়রনমেন্টাল (পরিবেশগত) থাকে, কিছুটা জেনেটিক (জিনগত) থাকে। আরেকটা কারণ আমরা যেটা দেখি, যারা বন্ধ্যাত্বে ভুগছেন তারা অনেক দেরি করে আমাদের কাছে আসেন। আবার অনেকেই বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, তারা অনেকেই বারবার চিকিৎসক বদলান। তারা নানা ওষুধ খান। এগুলোকে আমরা ওভুলেশন ইন্ডেকশন ড্রাগ বলি। অনেক সময় দেখা যায় মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারা করেন না। যেমন এগের সংখ্যা কেমন আছে, এসব পরীক্ষা না করে ওভুলেশন ইন্ডেকশন ড্রাগ নিতে থাকে। তাতেও দেখা যাচ্ছে এগের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমরা ইদানীং এই পেশেন্ট পাচ্ছি। খুব অল্প বয়সী এমন পেশেন্ট পাচ্ছি।

খরচের ব্যাপারে একটা ধারণা আছে যে অন্যান্য দেশে এসব চিকিৎসার খরচ কম, আমাদের দেশে বেশি। এমন ধারণা কি সঠিক?

ব্যাপারটি নিয়ে আসলে আমার অনেক কিছু বলার আছে। যেহেতু খরচের বিষয়টি অবশ্যই না। আইভিএফ তো ব্যয়বহুল এটা সবাই জানে। প্রত্যেক দেশেই ব্যয়বহুল। এটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে না। আমাদের দেশের তুলনায় বাইরের দেশে এটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। আমাদের দেশে সে তুলনায় কম খরচ হয়। বাইরের দেশে এটা রোগীর খরচ ইন্স্যুরেন্স (স্বাস্থ্য বীমা) কাভার করে না বলে নিজেদের দিতে হয়, সেখানে ৮ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত (২৫ লাখ টাকা) খরচ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে সর্বোচ্চ ৪-৫ লাখ টাকা খরচ হয়। আরেকটা ভুল ধারণা যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে গেলে হয়তো কম খরচে চিকিৎসা হয়, সেখানেও আমি কিছু বলতে চাই। যেমন মানুষের অনেকের ধারণা আছে, এখানে তাদের অনেক এজেন্ট থাকে, তারা অনেক রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করে। রোগীদের তারা বলবে যে অনেক কম খরচে হবে। দুই-আড়াই লাখ টাকা খরচ হবে। ওই রোগীরা যখন আমাদের কাছে আসেন তখন তাদের অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের কাছে শেয়ার করেন। দেখা যায়, তারা ওই টাকা নিয়ে বাইরে গেল, পরে দেখা গেল একটা হিডেন (লুক্কায়িত) চার্জ থাকে, যেটা অনেক বেশি। তারা তা বুঝতে পারেন না। যখন একটা জায়গায় পৌঁছে যায় সেখান থেকে আর ফেরত আসতে পারেন না। তখন ওই টাকা ম্যানেজ করে তাদের চিকিৎসা করে আসতে হয়। দুই-আড়াই লাখ টাকার কথা বলে ১২-১৪ লাখ থেকে ১৮ লাখ বা ২০ লাখও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ রকম তথ্যও আমাদের কাছে আছে।

বাংলাদেশে এ চিকিৎসার খরচ কত পড়বে? বিশেষ করে স্কয়ারে কত পড়বে?

আমাদের এখানে সর্বোচ্চ ৪-৫ লাখ টাকার মতো।

আইভিএফ নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ভুল ধারণাগুলো কী কী?

আইভিএফ নিয়ে ভুল ধারণা হচ্ছে, প্রথমে রোগীরা ভাবেন এটা ভয়ংকর একটা ট্রিটমেন্ট। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারকে জানাতে চায় না। তারপর ভুল ধারণা হচ্ছে, আরেকজনের স্পার্ম, আরেকজনের এগ কি দেয়া হবে। আসলে এটা একেবারেই না। আমরা কথা বলেই নিই, যে রোগী তার স্পার্ম আর এগ নিয়েই আমরা কাজ করব। এটা দিয়ে কাজ না হলে আমরা কিছুই করব না। এতে আমাদের সাফল্যের হার যদি কমও হয়, তাহলেও কিছু করার নেই। যেমন আমি বলি, এখানেও আমি বলতে চাই, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে তারা বলবে ১০০ শতাংশ ক্যাশব্যাক। কারণ হচ্ছে, তাদের ওই ফ্যাসিলিটি আছে। ওই সুযোগ আছে। তারা রোগীকে চাইলেই ডোনার দিয়ে দিতে পারছে। কিন্তু আমরা এখানে সে কাজটা করব না। সেই কারণে তাদের সাফল্যের হার বেশি হলেও হতে পারে। যেহেতু তার ডোনার ইউজ করছেন। আমাদের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার উন্নত বিশ্বে যেমন, আমাদের এখানেও একই রকম। সেটা হচ্ছে, আমরা সবাইকে বলি যে একটা আইভিএফের সাফল্য নির্ভর করে কীসের ওপর। এগের কোয়ালিটি কেমন, স্পার্মের কোয়ালিটি কেমন, ইউটেরাস কেমন, ওর ধরে রাখার ক্ষমতা কেমন, প্লাস ক্ল্যাপ টেকনোলজি—এগুলো সব ঠিকঠাক থাকলেও ৩৫ থেকে ৪০ সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ সাফল্যের হার।

সংশ্লিষ্ট রোগীদের জন্য স্কয়ার হাসপাতালের কী কী সুবিধা রয়েছে?

হ্যাঁ, আমি আরো কিছু বিষয়ে বলতে চাই। আমাদের কাজ হচ্ছে রোগীকে নিয়ে। আমি একজন মানুষ নিয়ে কাজ করছি। তাহলে প্রথমে আমাকে অবশ্য চিন্তা করতে হবে তার সেফটির বিষয়ে। সেফটির বিষয় চিন্তা করলে আমি যখন তাকে একটা ওষুধ দেব তখন আমাকে চিন্তা করতে হবে যে তিনি ওষুধটা নিতে পারবেন কিনা। আমাকে সেটা রোগীর হিস্ট্রির মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, যেকোনো ওষুধে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। সেটা আগে থেকেই বলা যায় না। যখন সে শুরু করবে, সেই সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা আমার হাসপাতালে, আমি তাকে সেই সাপোর্ট দিতে পারব কিনা, যদি কোনো সমস্যা হয় এ ওষুধের কারণে, তারপর হচ্ছে ইনফেকশন কন্ট্রোল। আমি যখন কোনো একটা প্রসিডিওর করতে যাব তখন অবশ্যই যাতে ইনফেকশন না হয়, আমি পেশেন্টের উপকার করতে গিয়ে অপকার যাতে না করি, আমাকে সবসময় মাথায় সেটাই রাখতে হয়। তো ইনফেকশন বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। যেকোনো প্রসিডিউরে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। সেই ইনফেকশন কন্ট্রোল করার মতো আমার যথেষ্ট ফ্যাসিলিটি আছে কিনা সেটা আমাকে খেয়াল রাখতে হবে। তিন নম্বর হচ্ছে, আমি যখন কোনো প্রসিডিওর করব তখন কোনো একটা অ্যানেস্থেসিয়া করতে হবে। তাকে প্রোপার অ্যানেস্থেসিয়া দেয়ার মতো ক্ষমতা আছে কিনা, অ্যানেস্থেসিয়া হ্যাজার্ড হলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার আছে কিনা। চার নম্বর হচ্ছে, আমরা যখন কোনো একটা আইপিএস করতে যাই যেকোনো কম্পিলিকেশন হতে পারে, খুব গুরুত্বপূর্ণ ওভারিয়ান হাইপারস্টুমিলেশন হতে পারে, সেক্ষেত্রে আইসিইউর সাপোর্ট লাগতে পারে। সেটি আমাদের হাসপাতাল দিতে পারে কিনা। অনেক সময় অনেকের হেল্প নিতে হয়। যেমন ইউরোলজিস্ট, জেনারেল সার্জন—এই সাপোর্টও আমি নিতে পারি কিনা।

একদম শেষ নম্বর হলো, আমার এখানে অস্টেটিক সাপোর্ট আছে কিনা। আমি একটা রোগীকে আইপিএফ করলাম, ছেড়ে দিলাম, তারপর সে ঘুরল কোথায় যাবে ঠিক নেই, এ সাপোর্টটা আমি দিতে পারি।

আমি মনে করি, এসব সুযোগ-সুবিধা একসঙ্গে স্কয়ার হাসপাতালে রয়েছে। পাশাপাশি স্কয়ার হাসপাতাল সেফটি মেইনটেইন করতে পারে, ইনফেকশন কন্ট্রোল, তারপর হচ্ছে ল্যাবের কোয়ালিটি কন্ট্রোলের একটা বিষয়, যার ওপর সাকসেস রেট অনেকটা নির্ভর করে। স্কয়ার হাসপাতাল এসব দিক থেকে উন্নত বলে আমি মনে করি।

শ্রুতলিখন: রুদ্র ইকবাল