দেশের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় কয়েক বছর ধরেই বেশ সাফল্যের সঙ্গে ভূমিকা রেখেছে ল্যাবএইড হাসপাতালের আইভিএফ সেন্টার। সেন্টারটির সার্বিক সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারিন জাহান সিগমা

দেশেই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় ল্যাবএইড বেশ সাফল্যের সঙ্গে ভূমিকা রাখছে। ল্যাবএইডের আইভিএফ সেবার মান কেমন?

আমাদের দেশে ১২-১৫ শতাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান হচ্ছে না। যেটা সারা পৃথিবীতে হয়তো ১০-১২ শতাংশ। তার মানে আমাদের দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দম্পতির সন্তান না হওয়ার ব্যাপারটি বেড়ে গেছে।

সন্তান না হওয়ার ব্যাপারে মেয়েদের এক-তৃতীয়াংশ এবং ছেলেদের এক-তৃতীয়াংশ সমস্যার কারণ দায়ী। এর সঙ্গে দুজনের সমস্যা মিলিয়ে আর একটি অংশ যোগ হয়। সাধারণত বলা হয়, মেয়েদের সমস্যার কারণে সন্তান হয় না এটা সঠিক নয়। অনেক সময় ছেলেদের দুই-তৃতীয়াংশ সমস্যার কারণেও সন্তান হচ্ছে না। আমরা সন্তান না হওয়া বা আইভিএফ নিয়ে কাজ করি ১৯৯৩ সাল থেকে। পাকিস্তানে হামিদ লতিফ নামে হাসপাতাল আছে। তখন সে হাসপাতালে পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব শিশুর জন্ম হয়। প্রথম শিশুটি হয় লন্ডনের কিংস হাসপাতালে। এ ঘটনা আজ থেকে ৩০ বছর আগে। তার মানে উপমহাদেশে এ ধরনের চিকিৎসা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়।

এবার বাংলাদেশের কথাই আসি। আমাদের এখানকার বেশির ভাগ রোগী ভারতে যেতেন। আমরা পাকিস্তানের হামিদ লতিফ হাসপাতালকে রেফারেন্স ধরে এগোতে থাকি।

এখানে আমার পরিবারের একটা ঘটনা আছে। আমার দ্বিতীয় বোনের সন্তান হতো না। তাকে নিয়ে গেলাম সিঙ্গাপুরের মাউন্টএলিজাবেথ হাসপাতালে। এটা ১৯৯৫ বা ৯৬ সালের ঘটনা। সেখানে যে ডাক্তার দেখলেন, তাদের মধ্যে একজন গাইনিকোলজিস্ট ছিলেন, নাম ডাক্তার রতনাম। আমি ডাক্তার রতনামের সঙ্গে দেখা করলাম। বললাম স্যার, আমাদের দেশে যাদের সন্তান হয় না, তাদের কোনো চিকিৎসা হয় না। আপনি আমাদের সাহায্য করেন। তিনি বললেন, ‘তুমি হাসপাতাল করো, আমরা সাহায্য করব। আরেকজন ডাক্তার ছিলেন বাংসো, তিনি হলেন এমব্রায়োলজিস্ট। একটি আইভিএফ সেন্টারের জন্য একজন গাইনিকোলজিস্ট ও একজন এমব্রায়োলজিস্ট লাগে। এরপর ঢাকায় এসে আমি আইভিএফ সেন্টার করলাম। এর নাম হলো আইএমসি-ইনফার্টিলিটি ম্যানেজমেন্ট সেন্টার। এটা শুরু করি ১৯৯৫ সালে। আমরা প্রথমে পাকিস্তানের হামিদ লতিফ হাসপাতাল থেকে ট্রেনিং করলাম। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করলাম। আমাদের আইএমসি থেকে ’৯৭ সালে গিয়ে শিশুর জন্ম হয়। পরে আমরা ল্যাবএইডে করলাম ২০০২ সালের দিকে। এখন এটা আমাদের একটি প্রতিষ্ঠিত আইভিএফ সেন্টার। এখানে ডাক্তার স্বাতী আপা কাজ করেন। তরুণ গাইনিকোলজিস্টরা কাজ করেন। এখানে বছরে ৭০০-৮০০ কেস আসে। আমাদের সাকসেস প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

Lab-aid_Hospital_MAS_170725_9

ল্যাবএইডের আইভিএফ সেন্টারের একাংশ ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

আমাদের দেশে কার্ডিওলজি যেভাবে পরিচিতি পেয়েছে, মানুষ জানে, সেভাবে আইভিএফ সম্পর্কে জানে না। বাংলাদেশের আরো দুই-তিনটি সেন্টার আছে, তাদের মানও ভালো। এটা কিন্তু ছয় থেকে সাতবার পর্যন্ত চেষ্টা করতে হয়। আমরা ট্রাই করে দেখেছি যে তিনবারে সন্তান হচ্ছে।

এই সাফল্যের কথা আমরা মানুষকে জানাতে পারিনি—এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা। একটা মেসেজ সবাইকে দেয়া দরকার যে আপনার খরচের যে সামর্থ্য তার মধ্যেই বাংলাদেশে চিকিৎসা আছে। বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা সহজলভ্য ও প্রতিষ্ঠিত।

ভারতে সাকসেস রেট ৭০ শতাংশ। কারণ তাদের স্পার্ম ব্যাংক আছে। কেউ চিকিৎসার জন্য গেলে তারা ব্যাংক থেকে নিয়ে স্পার্ম স্থাপন করে। আমরা কিন্তু এটা করতে পারিনি। কারণ ধর্মীয় ব্যাপার আছে। তাই আমরা সেটা পারি না। কেউ চাইলেও আমরা করি না। ভারতে অনেকক্ষেত্রে না চাইলেও করে দেয়।

বেশ কয়েক বছর হলো, ল্যাবএইড হাসপাতালের আইভিএফ সেন্টার যাত্রা শুরু করেছে। বর্তমানে আপনাদের আইভিএফ সেবার অগ্রগতি কেমন?

আমাদের প্রথম সেন্টারটি হয় ১৯৯৫ সালে। তারই ধারাবাহিকতা হলো বর্তমান আইভিএফ সেন্টার। এটা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

বর্তমানে দেশে যে ধরনের আইভিএফ সেবা প্রচলিত রয়েছে, তা উন্নতীকরণে আপনারা কী কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যবস্থা করছেন?

প্রথমত, রোগীকে বাছাই করার কাজ করতে হয়। তার মানে কোনটি আইভিএফ করব, কোনটা ইকসি করব—কোনটা হরমোনাল ইনডাকশন করব। এমনও দেখা গেছে যে মায়ের হরমোন অ্যাসেস করে হরমোন লেভেলটা ঠিক থাকলেই সন্তান হয়ে যায়। সিম্পল আইইউআইয়ে অনেক শিশু হয়। এখানে প্রযুক্তিগত ইকসি—এগুলো কিন্তু পরের বিষয়। এখানে শতকরা পাঁচটি শিশু হয়। এর আগে কিন্তু ৯৫ শতাংশ এমনিতেই হয়ে যায়। এমনি বলতে এখানে ইজি প্রসেসের কথা বলছি। ইকসির পর আমার জানামতে আর কিছু নেই। এখানে ভারত ও থাইল্যান্ডে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক এমব্রায়োলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান আছেন। ডাক্তার ও নার্সরা বিদেশের সেমিনারগুলোয় অংশগ্রহণ করছেন। এর একটা ভালো দিক আছে। যেখানে যা হচ্ছে আমরা তা জানতে পারছি। কোথায় আমরা পিছিয়ে আছি তা জানতে পারি। এখন প্রযুক্তিগত সব মেশিন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। সবকিছু দেখা যাচ্ছে। সুতরাং কেউ খুব একটা পিছিয়ে নেই।

ল্যাবএইডে আইভিএফ একটি টিমওয়ার্ক। এখানে তিনজন লোক কাজ করেন। মেয়েদের কাজটা করেন গাইনিকোলজিস্ট, ছেলেদের হলো এনড্রোলজিস্ট আর ল্যাবে যে করেন তাকে বলে এম্ব্রায়োলজিস্ট। পাশাপাশি মেশিনারি ও টেকনোলজি সাপোর্ট থাকে। এই টিমের অনেক ডেডিকেশন ও ধৈর্য্য লাগে। রোগীর সঙ্গে অনেক কাউন্সেলিং করতে হয়। রোগীকে বোঝাতে হয়। যেমন নারীর বয়স ৪৫, পুরুষের বয়স ৫০। দু-একবার ফেল করলে সে ধরেই নেয় যে আর সন্তান হবে না। তাদের কাউন্সেলিং করে ধরে রাখতে হয়। আরেকটি বিষয়, হরমোন ইনজেকশন দেয়ার কারণে এই প্রেগন্যান্সিগুলো হাই রিস্কি হয়। পেটে পানি এসে যায়। ডাবল প্রেগন্যান্সিও হয়। এগুলো হ্যান্ডল করার জন্য ভালো গাইনিকোলজিস্ট প্রয়োজন হয়।

এবার এ সেবার উন্নতীকরণ বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিষয়ে আসা যাক। আমাদের চিকিৎসকরা কিন্তু এ বিষয়গুলো বাইরের দেশে গিয়ে দেখে আসেন। আমরা ম্যানেজমেন্ট থেকে যাই। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো আইভিএফ সেন্টারগুলো দেখার ব্যবস্থা করা হয়। তাদের ল্যাবে কী আছে, আমাদের কী নেই সেটা আমরা দেখি। দ্বিতীয়ত, বিদেশে সেমিনারে যাচ্ছে। উন্নত বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে আসে। তখন আমরা দামি মেশিনপত্র ও প্রযুক্তি কিনি। আবার বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসি। তারা এখানে এসে পাঁচ-ছয়দিন কাজ করে যান। এভাবে আমাদের দেশের চার-পাঁচটা সেন্টার পৃথিবীর যেকোনো সেন্টারের মতোই উন্নত। তবে হ্যাঁ ব্রিটেনের একটি সেন্টারে গেলে দেখা যাবে তাদের এনভায়রনমেন্ট অনেক ভালো। যারা কাজ করেন তাদের ডেডিকেশনও অনেক ভালো। মেশিনপত্রও ভালো। এটা আসলে নির্ভর করে রক্ষণাবেক্ষণের ওপর, ম্যানেজমেন্টের ওপর। আমাদের দেশেও এমনটা হয় না—এটা কিন্তু না। আমাদেরও আছে।

দেশের আইভিএফ সেবা নিশ্চিত হলে এটি দেশের আর্থিক উন্নতিতে কীভাবে সহায়তা করবে?

আইভিএফ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যখন যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই যেতে হয়। সাত-আটবার যেতে হয়। এক মাস থাকতে হয় সেখানে অনেক টাকা খরচ। একটা দম্পতিকে যদি দেশে রাখা যায়, কমপক্ষে ২০-৩০ লাখ টাকা বেঁচে যায়।

বাংলাদেশে আইভিএফ পদ্ধতির ব্যাপারে কোনো নীতিমালা বা আইনের প্রয়োজন আছে কিনা?

আইভিএফের ক্ষেত্রে নীতিমালা যা রয়েছে তা আমাদের ক্ষেত্রে সহায়ক। কোনো বাধা নেই। তবে আইভিএফের প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে আরো বেশি নজর দেয়া উচিত। এগুলো নিয়ে ক্যাম্পেইন করা জরুরি। এ দেশে ১০-১৫ শতাংশ দম্পতির সন্তান নেই। অনেকেই সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেয় না। মানুষের ভুল ভাঙানোর পেছনে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন—সন্তান না হওয়ার পেছনে দোষ একমাত্র নারীদের। আমাদের সমাজে যে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে।