একটি গোলটেবিল ঘিরে বসেছে বন্ধুরা। প্রত্যেকের কেদারার পাশে রয়েছে ধূমায়িত আলবোলা। ভৃত্যেরা টেবিলের ওপর সাজিয়ে দিয়েছে গেলাস ও বিভিন্ন প্রকার সুরার বোতল, যার যেমন রুচি, সে নিজে ঢেলে নেবে। শুধু রামগোপালের সামনে একটি বিচিত্র আকৃত্রির পোর্সিলিনের পাত্র। পাত্রটি গোল, তার একদিক দিয়ে হাতির শুঁড়ের মতো একটি ছোট্ট নল বেরিয়ে আছে। সেখান থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সবাই কৌতূহলী হয়ে সেদিকে তাকিয়ে।

রোমগোপাল মৃদু হেসে বললেন, ইউ পোর ইওর ড্রিংকস। মাই ডিয়ার ফেলোজ, আমি আগে একটু উষ্ণ পানীয় পান করব। ইদানীং এটা পান করা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।

একটি হাতলযুক্ত গোল পোর্সিলিনের বাটিতে রামগোপাল খানিকটা কালো রঙের উষ্ণ তরল পদার্থ ঢাললেন, তারপর তার সঙ্গে তিন চামচ দুধ ও তিন চামচ চিনি মিশিয়ে গুলতে লাগলেন। মিশ্রণকার্যটি সমাপ্ত হলে রামগোপাল বাটিটি সাবধানে ওষ্ঠের কাছে এনে সুরুৎ করে ছোট একটি চুমুক দিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে বললেন, আহ!

রাধানাথ শিকদার আর কৌতূহল চাপতে না পেরে বলে উঠলেন, হোয়াট ইজ দ্যাট স্ট্রেঞ্জ কনককশন?

রামগোপাল পরিহাসের সঙ্গে বললেন, দ্যাট ইজ মাই ফেভারিট পয়জন। একটু স্বাদ নিয়ে দেখবে নাকি?

রসিককৃষ্ণ বললেন, দিস ইজ টি। রাধনাথ, তুমি চায়ের কথা শোনোনি? আগে চীন দেশ থেকে এ বস্তু আসত। এখন আমাদের আসামেই যথেষ্ট হচ্ছে।

রাধানাথ অনেকদিন দেশছাড়া বলে চা কথাটা জানেন না। তিনি টির কথা কাগজেপত্রে পড়েছেন, তবে কোনোদিন চর্মচক্ষে দেখেননি। তাদের দেরাদুনে নানা রকম মদ্যের ছড়াছড়ি। সেখানে উষ্ণ পানীয় বলতে শুধু চলে ভেড়ার দুধ।

প্যারিচাঁদ মধ্যপান করেন না। তার আসক্তি ধূমপানের দিকে। তিনি বললেন, আমি একটু চেখে দেখতে রাজি আছি। ইংরেজ মহলে আজকাল চা পান খুব চলচে শুনেছি।

...রামগোপাল দ্বিতীয় একটি বাটিতে প্যারিচাঁদের জন্য চা ঢালতে ঢালেতে বললেন, নেশা হয় বৈকি। এর এক চুমুকেই পঞ্চন্দ্রিয়ে একটা অ্যালার্টনেস এসে যায়। লাইক কিসিং এ ড্যামেজল...অ্যান্ড ইউ ওয়ান্ট টু কিসিং অ্যাগেইন...এই নাও প্যারী, আজ আমি তোমায় নতুন সুধারসে দীক্ষা দিলাম।

প্যারীচাঁদ প্রথমে খানিকটা ইতস্তত করলেন। বাটিটি হাতে নিয়ে তাকালেন একবার বন্ধুদের দিকে। ঠোঁট পুড়ে যাওয়ার ভয়ে ফুঁ দিলেন কয়েকবার। তারপর কোনোক্রমে একটি চুমুক দিয়েই মুখ বিকৃত করে ফেললেন। পানীয়টি তার পছন্দ হয়নি। রামগোপাল কোন সুখে এ জিনিস খাচ্ছেন? রামগোপাল তার সঙ্গে কৌতুক করার জন্য সত্যিই বিষাক্ত কিছু দেননি তো? রামগোপালের কথাই আলাদা, তিনি বেপরোয়া ধরনের মানুষ, কোনো কিছুতেই ভয় পান না। প্রায়ই তিনি কথায় কথায় বলেন, আই বেয়ার এ চার্মড লাইফ।

রামগোপাল জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্রাদার, কেমন লাগল?

প্যারীচাঁদ বললেন, একটু তিক্ত, একটু কষা।

বন্ধুরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন।

রামগোপাল প্যারীচাঁদের বাটিতে আরো খানিকটা চিনি মিশিয়ে দিয়ে বললেন, এবার দেখো তো!

প্যারীচাঁদ সভয়ে আবার চুমুক দিলেন। এবার তার মুখ হাসিতে ভরে গেল, তিনি বললেন, বাহ্, দিব্য অপূর্ব, স্বাদটা যেন একেবারে বদলে গেল!

রামগোপাল জিজ্ঞেস করলেন, কেমন, শরীরে বেশ একটা চনমনে ভাব হয়নি?

প্যারীচাঁদ বললেন, বিলক্ষণ!

রামগোপাল আবার জিজ্ঞেস করলেন, মনে হয় না আবার চুম্বন করি, আবার, আবার?

প্যারিচাঁদ বললেন, নিশ্চয়! আমি বলি কি, এবার থেকে আমরা এই বস্তুই পান করব। শুধু শুধু সুরা পান করে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা কেন? সর্বনাশী সুরা যে দেশটারে ছারখার করে দিচ্ছে।

বাঙালি অভিজাত সমাজ চায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠার এই কাহিনীটি শুনিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস ‘সেই সময়’-এ।

‘ইয়ং বেঙ্গল’-এর এ রকম কোনো আড্ডা কি আদৌ হয়েছিল? হলে কবে? এসব জানা দুষ্কর। তবে এ গল্প বলার আগেই সুনীল তার সেই সময়ে জানিয়ে দিয়েছেন রাধানাথ শিকদারের পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ আবিষ্কারের কথা। ১৮৫২ সালে ত্রিকোণমিতির হিসাবনিকাশে হিমালয়ের শৃঙ্গের উচ্চতা মাপতে গিয়ে রাধানাথ শিকদারের কাছেই প্রথম ধরা পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও বড় শিখর হিমালয়ে রয়েছে। পরবর্তী সমেয় যার নাম হয় মাউন্ট এভারেস্ট।

তখনো সব বাঙালির অন্দরমহলে চা প্রবেশ করেনি। বরং শিক্ষিত, উঁচুতলার মানুষের মধ্যেই চা নিয়ে রয়েছে নাক সিঁটকানো ভাব। তখন ধর্মপ্রাণ বাঙালিরাও চাকে নিষিদ্ধ পানীয় মনে করে এড়িয়ে চলত। বাঙালিদের চা পানে অভ্যস্ত করতে, বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্রিটিশরা বিভিন্ন জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে চা বিতরণ শুরু করল। একেও বাঁকা চোখে দেখলেন অনেকে। ব্রাহ্মসমাজ থেকেও আপত্তি উঠল। এমনকি ১৯৩২ সালে এসেও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছেন, ‘চা পানে লোকে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শরীর ও মনের অশেষ ক্ষতি হয়।’

চিকিৎসক ও রসায়নবিদ প্রফুল্লচন্দ্র তার ‘চা-এর প্রচার ও দেশের সর্ব্বনাশ’ প্রবন্ধে আরো লিখেছেন, ‘কলিকাতা, বোম্বাই প্রভৃতি নগরের স্বল্প বেতনভুক, শীর্ণ কেরাণী আহার্য্য ও পানীয়ের উভয়বিধ প্রয়োজন চা পানের দ্বারাই মিটাইয়া থাকেন। উহাতে ক্ষুধা নষ্ট হয়, সুতরাং ব্যয়সাধ্য পুষ্টিকর আহার্য্যের আর প্রয়োজন পড়ে না। হুইস্কির বোতল কিংবা চায়ের পাত্র ইহাদের কোনটি যে অধিকতর মারাত্মক, তাহা নিশ্চিতরূপে বলা কঠিন।’

প্রফুল্লচন্দ্রের লেখা থেকেই বোঝা যায়, চা তখন বাঙালিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। তবে প্রফুল্লের আপত্তি সত্ত্বেও কালক্রমে এ চা হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের সর্বজনীন ও সবচেয়ে সহজলভ্য পানীয়। পানি ব্যতীত আর কোনো পানীয়ই এতটা সর্বজনীনতা পায়নি। বস্তির টং দোকান থেকে পাঁচতারকা হোটেল, গ্রাম থেকে শহুরে রান্নাঘর—কোথাই নেই চা! সবখানেই এর সদম্ভ উপস্থিতি। চা-বিহীন বাঙালির অতিথি আপ্যায়ন তো এখন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এককালে যা ছিল বিলাসিতা তা এখন আবিশ্যকতায় পরিণত হয়েছে।

যে পানীয়কে নিয়ে প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছেন ‘শরীর ও মনের অশেষ ক্ষতি হয়’, সেই চা নাকি শুরুর দিকে ব্যবহূত হতো চিকিৎসাকাজে। রোগের পথ্য হিসেবে। জাপানি লেখক-শিল্পী কাকুজো ওকাকরা তার চা-চরিত (The Book Of Tea) বইটি শুরু করেছেন এভাবে—‘চায়ের শুরু চিকিৎসায়, পৌঁছেছে সে পানীয়ে।’ তার মতে, প্রথম দিকে রোগের পথ্য হিসেবেই ব্যবহূত হতো চা।

১৯২০-৩০-এর দশকে বাংলায় চায়ের বিজ্ঞাপনেও উল্লেখ ছিল এর ওষুধি গুণের বিষয়টি। তখনকার কয়েকটি বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘গরম চা পান করো। লাভ হইবে। শীত ও বর্ষার ব্যাধি দূর হইবে। ইহাই একমাত্র বর্ষার শীতল পানীয়।’

অথবা ‘ইহা খাইতে বেশ সুস্বাদু। ইহাতে কোনো অপকার হয় না। ইহা জীবনশক্তি উদ্দীপক। ইহাতে মাদকতা শক্তি নাই। ইহা নিম্নলিখিত রোগের আক্রমণ হইতে রক্ষা করে: ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, আমাশয়, প্লেগ, অবসাদ।’

দিন দিন রোগের পথ্য থেকে সর্বজনীন পানীয়তে পরিণত হয়েছে চা। কেবল বাঙালির কথা বলা কেন, চায়ের জনপ্রিয়তা তো বিশ্বজনীন। কোথায় নেই চা!

চা আবিষ্কার

চা যে চীনেই আবিষ্কৃত হয়েছে, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। তবে চা কীভাবে এল তা নিয়ে নানা কাহিনী চালু রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনী বোধহয় চীনের সম্রাট শেন নাঙকে ঘিরে।

কাহিনীটা এ রকম—প্রকৃতিপ্রেমিক ও বৈজ্ঞানিক শেন নাঙ একবার নিজের সাম্রাজ্য পরিদর্শনে বেরিয়েছেন। যাত্রাপথে এক অরণ্যের ভেতরে তিনি থামলেন। তখন গ্রীষ্মের দুপুর। সম্রাট তৃষ্ণার্থ। তৃষ্ণা নিবারণে জল পান করবেন। তাই জল ফুটানো হচ্ছিল অরণ্যের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। এমন সময় জঙ্গল থেকে কয়েকটি পাতা উড়ে এসে গরম জলের মধ্যে পড়ল।

সম্রাট দেখলেন, পাতা পড়ার পর মুহূর্তেই রঙিন হয়ে উঠল পানীয় জল। সম্রাট অবাক হলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেই জল পান করলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্তি চলে গেল তার। সম্রাট উত্ফুল্ল হলেন, পেলেন নতুন উদ্যম। তিনি রায় দিলেন, ক্লান্তি দূর করতে ও শরীর-মন উত্ফুল্লতায় ভরিয়ে তুলতে এ পানীয়ের তুলনা নেই।

এভাবে সৃষ্টি হলো নিদ্রা নিবারণ ও উদ্যমতার প্রতীক চা।

শেন নাঙের রাজত্বকাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ থেকে ২৬৯৮। ধারণা করা হয়, এ সময়েই চা আবিষ্কৃত হয়েছে। তার রাজত্বকালেই চীন, মিয়ানমার, তাইওয়ান, থাইল্যান্ডে চা পাওয়া যায়।

আবার অনেক চীনা মনে করেন, বুদ্ধের জন্মের এক হাজার বছর আগে চীনা সন্ন্যাসীরা প্রথমে চা আবিষ্কার করেন।

চীনে চা চাষ প্রথম শুরু হয় ১৬৫০ সালের দিকে।

ভারতবর্ষে চা

ভারতবর্ষে চা আসে ব্রিটিশদের হাত ধরেই। পলাশীর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত চায়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল না এ অঞ্চলের মানুষের। ১৬৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চীন থেকে চা রফতানি শুরু করে। তখন চায়ের জন্য পুরোপুরি চীনের ওপরই নির্ভরশীল ছিল সারা বিশ্ব। চীনের ওপর নির্ভশীলতা কমাতে বিকল্প হিসেবে ব্রিটিশরা ১৭৮০ সালে ভারতবর্ষে পরীক্ষামূলকভাবে চা গাছ তৈরি করে। এর পর থেকে তারা ভারতেই চা উৎপাদনে মনোযোগী হয়।

১৮২৩ সালে রবার্ট ব্রুস আসামের শিবসাগর অঞ্চলে প্রাকৃতিক অবস্থায় চা গাছ দেখতে পান। ওই অঞ্চলের সিংফো আদিবাসীরা ওই চা পান করে বলেও দেখতে পান।

১৮২৬ সালে আসাম পূর্ণ ব্রিটিশ অধিকারে আসে। এরপর রবার্ট ব্রুসের ভাই চার্লস ব্রুস আসামে চা বাগান গড়ে তোলেন। তাকে আসাম চায়ের আবিষ্কর্তা ধরা হয়। আর ভারতীয়দের মাঝে প্রথম চা বাগান গড়ে তোলেন মণিরাম দেওয়ান। ১৮৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে যাকে ফাঁসি দেয় ব্রিটিশরা।

সিলেট ও চা

বাংলাদেশে চায়ের প্রসঙ্গ এলেই সিলেটের কথা উঠে আসে। চা আর সিলেট এ দুই শব্দ এখন সমার্থক হয়ে উঠেছে। দেশের বেশির ভাগ চা বাগানই এ অঞ্চলে। দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম চা চাষও শুরু হয় সিলেটে। চা আর সিলেট এখন অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠলেও দেশে প্রথম চা চাষের শুরু হয় চট্টগ্রামে। এ অঞ্চলে প্রথম চা বাগান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ১৮২৮ সালে। অবিভক্ত ভারতের চট্টগ্রামের কোদালায় তখন চাষের জন্য জমি নেয়া হয়। বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম ক্লাব, ১৮৪০ সালে সেখানেই পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা হয় প্রথম চা গাছ। গড়ে ওঠে ‘পাইওনিয়ার’ চা বাগান। ১৮৪৩ সালে ওই বাগানের পাতা থেকে প্রথম চা উৎপাদন হয়। ১৮৭৩ সালে বাংলায় চা চাষবিষয়ক তৎকালীন কৃষি বিভাগের এক প্রতিবেদনে এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে ওই বছরের ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে এ প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮৪০ সালে তৎকালীন কালেক্টর স্কোনস আসাম থেকে চায়ের বীজ ও কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে তিনটি চায়না চারা সংগ্রহ করেন। এসব চারা ও বীজ পাইওনিয়ার বাগানে রোপণ করেন তিনি। তবে দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম চা বাগান গড়ে ওঠে সিলেটে। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৪ সালে সিলেট শহরের অদূরে, বর্তমান বিমানবন্দর সড়কের পাশের টিলাভূমিতে গড়ে ওঠে মালনীছড়া চা বাগান।

টিলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছড়া (প্রাকৃতিক খাল)। যার নাম মালনীছড়া। এ ছড়ার নামেই এলাকার নামকরণ। এ এলাকার দেড় হাজার একর জায়গার ওপর লর্ড হার্ডসন চা বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ১৯০৫ সালে প্রকাশিত ‘আসাম ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারস, সিলেট’-এ বলা হয়, সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। এ বাগানের মাধ্যমে এ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশে চা শিল্পের যাত্রা হয়। বাগানটি এখনো রয়েছে। ব্রিটিশ মালিকানা বদলে এখন বাঙালি মালিকানায়ই পরিচালিত হচ্ছে মালনীছড়া চা বাগান। বহু ইংরেজ, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশী ব্যবস্থাপকের হাত ঘুরে ১৯৮৮ সাল থেকে এটি ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। মালনীছড়া এখনো দেশের বৃহত্তম চা বাগান।

মালনীছড়ার সাফল্যের পর ১৮৬০ সালে হবিগঞ্জের লালচাঁন্দ চা বাগান ও মৌলভীবাজারের মির্তিঙ্গা চা বাগানে চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। সিলেট বিভাগের এ তিন জেলায়ই রয়েছে চা বাগান। বিভাগের মধ্যে কেবল হাওরপ্রধান সুনামগঞ্জেই কোনো চা বাগান নেই। বর্তমানে দেশে উৎপাদনে আছে ১৬৭টি চা বাগান, যার মধ্যে ১৩৫টি চা বাগানই সিলেট বিভাগে। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। এ জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলাকে বলা হয় চায়ের রাজধানী। এছাড়া চট্টগ্রামে বাগান রয়েছে ২১টি। এখন উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার সমতল এলাকায়ও গড়ে তোলা হয়েছে চা বাগান।

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ

শ্রীমঙ্গলে ঢুকেই একটি ভাস্কর্য চোখে পড়বে সবার। পিঠে ঝুড়ি নিয়ে চা উত্তোলন করছেন এক নারী। জেলা প্রশাসন নির্মিত এ ভাস্কর্যটির নিচে লেখা রয়েছে—‘চায়ের দেশে আপনাকে স্বাগতম’।

শ্রীমঙ্গল সত্যিকার অর্থেই চায়ের দেশ। প্রায় সোয়া ৪০০ কিলোমিটার আয়তনের এ এক উপজেলায়ই চা বাগান আছে ৪০টি। যেদিকে চোখ যায় সবুজ চা বাগান। ছোট চা গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁচু উঁচু ছায়াবৃক্ষ। সম্প্রতি এ উপজেলা শহরে গড়ে উঠেছে চায়ের দ্বিতীয় নিলাম কেন্দ্র।

শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি আর সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চা। এ উপজেলা শহর থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার নাম ‘চায়ের দেশ’। শহরে একটু পর পরই রয়েছে চা পাতার দোকান।

১৯৫৭ সালে শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয় চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। ১৯৫৭ সালেই চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হন শেখ মুজিব। তিনি দায়িত্বগ্রহণের পর বেগবান হয় গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম। এ ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত চায়ের উচ্চফলনশীল ও গুণগত মানসম্পন্ন ২১টি ক্লোন ও পাঁচটি বীজজাত উদ্ভাবন করেছে।

কেবল শ্রীমঙ্গলের কথাই বা বলা হোক কেন, পুরো সিলেটের সঙ্গেই তো অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে চা। সিলেটকে বলা হয় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। চা গাছের দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি থেকেই সবচেয়ে ভালো চা পাওয়া যায়। চা বাগানের আধিক্য থাকায় সিলেটকে এ নামে অভিহিত করা হয়। এখানকার পরিচিতিরও অনেকটা গড়ে উঠেছে চা বাগানকে ঘিরে। সিলেট জেলা প্রশাসন, সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে এখানকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের লগোতেও শোভা পায় ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’।

পাহাড়ি ভূমি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চলে বেশির ভাগ চা বাগান গড়ে উঠলেও চা বাগানের মালিকানায় সিলেটিদের প্রভাব অনেকটাই কমে আসছে। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার ছাড়া সিলেট অঞ্চলের পুরনো বাগান মালিকদের অনেকেই এ ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত লাভ করতে পারছেন না অনেকেই। এখন চা শিল্পে প্রভাব বেড়েছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। তারা কিনে নিচ্ছে পুরনো বাগান।

চা বাগানের শ্রমিকরাও এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নন। তাদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এখানে নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। বাগানের ভেতরেই বসবাস তাদের। ফলে চা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ সামান্যই।

তবে কৃষিভিত্তিক শ্রমঘন শিল্পটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি আয় বৃদ্ধি, আমদানিমুখিতা হ্রাস এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসকরণে অবদান রাখছে যথেষ্ট।

এছাড়া চা বিক্রি, রফতানি ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন এখানকার অনেকে। আর চা পান তো করছেন সবাই।

সাম্প্রতিককালে পর্যটনের বিকাশেও ভূমিকা রাখছে চা বাগানগুলো। সবুজ চা বাগানগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক পর্যটকই আসেন চা বাগান দেখতে। শুধু চা বাগানকে ঘিরেই শ্রীমঙ্গল হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান। সারা বছরই এখানে ভিড় থাকে পর্যটকদের। বিভিন্ন ছুটিতে সিলেটের বাগানগুলোতেও দেখা যায় পর্যটকদের ঢল। তবে বাগানগুলোতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিপাকে পড়তে হয় পর্যটকদের।

সঠিক উদ্যোগ আর ব্যবস্থাপনা সম্ভব হলে চা বাগানকে ঘিরে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকে আরও বিকশিত করার সুযোগ রয়েছে যথেষ্ট।

চা-স্তোত্র

শুরু করেছিলাম বাঙালির চা পানের অনভ্যস্ততা আর চা নিয়ে নাক সিটকানো মনোভাব নিয়ে। ইতস্ততভাবে চায়ের পেয়ালায় প্যারিচাঁদ মিত্রের প্রথম চুমুক কিংবা চায়ের অপকারিতা নিয়ে প্রফুল্লচন্দ্রের প্রবন্ধ রচনার সময় পেরিয়ে চা এখন বাঙালির প্রাত্যহিক সঙ্গী। চা নিয়ে গুণকীর্তনও কম হয়নি এখানে। গানে-কবিতায়ও উঠে এসেছে চায়ের কথা। কবির সুমনের ‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’ তো ফিরেছে তো সবার মুখে মুখে।

চায়ে মুগ্ধ কাজী নজরুল ইসলাম ‘চা-স্তোত্র’ নামে একটি চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন। চা নিয়ে বিরূপ মন্তব্যকারীদের প্রতিও নজরুলের স্বভাবসুলভ ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে এ কবিতায়। সেটি উল্লেখ করেই এ রচনা শেষ করা যেতে পারে—

চায়ের পিয়াসী পিপাসিত চিত্ত আমরা চাতক দল

দেবতারা কন সোমরস যারে সে এই গরম জল

চায়ের প্রসাদে চার্বাক ঋষি ব্যাকরণে হল পাশ

না নেই পেয়ে চার পেয়ে জীবে চর্বণ করে ঘাস

লাখ চা খেয়ে চালাক হয়, সে প্রমাণ চাও কত লাখে?

মাতালের দাদা আমরা চাতাল, বাতাল বলিস বল।

চায়ের নামে যে সাড়া নাহি দেয় চাষাড়ে তাহারে কও,

চায়ে যে ‘কু’ বলে চাকু দিয়া তার নাসিকা কারিয়া লও।

যত পায় তত চায় ব’লে তাই

চা নাম হ’ল এ সুধার ভাই।

চায়ের আদর করিতে, হল দেশে চাদরের চল।।

চা চেয়ে চেয়ে কাকা নাম ভুলে পশ্চিমে চাচা কয়,

এমন চায়ে যে মারিতে চাহে সে চামার সুনিশ্চয়।

চা করে করে ভৃত্য নফর

নাম হারাইয়া হইল চাকর,

চা নাহি খেয়ে বেচারা নাচার হয়েছে চাষা সকল।।

চায়ে এল যায় চাল্-কুমড়ো সে, চাঁদা করে মার চাঁটি,

চা নাহি খেয়ে চানা খায় আজ দেখ হে অশ্ব জাতি।

একদা মায়ের মুন্ডেতে শিব

চা ঢে’লে দেন; বের করে জিভ

চা-মুন্ডা রূপ ধরিলেন দেবী সেইদিন রে পাগল।।

চায়ে পা ঠেকিয়া সেদিন গদাই পড়িল মোটর চাপা,

চাঁটু ও চাটনী চায়েরই নাতনী, লুকাতে পার কি বাপা?

চায়ে মর্ম ব’লে গালি দিয়ে মাসি

চামর ঢুলায় হয়ে আজ দাসী,

চাটিম্ চাটিম্ বুলি এই দাদা চায়ের নেশারই ফল।

 

দেবাশীষ দেবু: সাংবাদিক