নাদের খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পেডরোলো এনকে লিমিটেড

‘পানি নিয়ে ভাবনা, আর না, আর না’ পেডরোলো পানির পাম্পের জনপ্রিয় এ টিভি বিজ্ঞাপনটির সাথে কে না পরিচিত। দেশে ইতালির পেডরোলো পানির পাম্প আমদানি করেছিলেন কৌতূহলবশত হয়ে। সেখান থেকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে খুব বেশি সময় নেননি নাদের খান। সময়ের ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছেন চা ব্যবসার সঙ্গে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হালদা ভ্যালির পতিত জমিতে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদনে এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পেয়েছেন চা উৎপাদনে ‘সেরা পুরস্কার’। চীনে প্রথম গ্রিন টি রফতানি করে নাম লেখান রফতানিকারকের খাতায়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনাও করেছেন চাকে ঘিরে। পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যুরোপ্রধান রাশেদ এইচ চৌধুরী

ব্যবসার শুরুর গল্পটা বলুন।

নাদের খান: মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রথম টায়ার আমদানি করেছিলাম খাতুনগঞ্জে। ভালো লাভও হলো, পাশাপাশি লোকসানও। খাতুনগঞ্জের চার বছরে আমার মনে হয়েছে কমোডিটি বিজনেস একটা গ্যাম্বলিং। খাতুনগঞ্জের ব্যবসা বন্ধ করে বন্ধুরা মিলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কারখানা দিলাম। ১৯৭৪ সালে খুব কাছের বন্ধু মোখলেসুর রহমান বিমান খরচ দিয়ে বিশ্বভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালেন। আমার জীবনে ব্যবসার শিক্ষাগুরু হিসেবে আমি তাকেই মানি। ৮২ দিন দুই বন্ধু মিলে ১২টি দেশ ঘুরে এলাম। আমি শুধু টিকিট কিনেছিলাম আর বাকি সব খরচ সে বহন করে। এ বিদেশ ভ্রমণই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ভ্রমণ থেকে এসে উপলব্ধি করলাম বিশ্বের উন্নয়ন কোথায় আর আমরা কোথায়। আমার চিন্তায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ১৯৮৫ সালে ইতালির ই-রিচ কোম্পানির রেফ্রিজারেটর আমদানি করি। তাদেরই আমন্ত্রণে ইতালির মিলান ফেয়ারে যোগ দিয়েছিলাম। পেডরোলো পাম্পের গল্পটাও কিন্তু এখান থেকে শুরু। ইতালির মিলানে গিয়ে আমি সাতদিন থাকলাম, যেখানে পেডরোলোর স্টলও ছিল। পেডরোলো কোম্পানির সঙ্গে প্রথম যোগাযোগটাও ওখানে। তাদের কথাবার্তা শুনে ধারণার ওপর নির্ভর করে ১০০ পাম্পের অর্ডার করে দিয়ে এলাম। ১৯৮৫ সালের জুনে চট্টগ্রাম বন্দরে চালান এলেও কাস্টমসের বেশকিছু জটিলতা কাটিয়ে উঠতে উঠতে বাজারে আসে জুলাইয়ে। ভালো বিক্রিও হয়। এর পর পরই আমদানি করি আরো ৪০০ পেডরোলো পাম্প, যা একজন ক্রেতাই কিনে নিয়ে যায়। ভালো লাভ হওয়ায় এ ব্যবসায় আমার আগ্রহ বাড়ে। সাহস ও অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকলে পুরো এক কনটেইনার (২ হাজার পাম্প) আমদানি করি। একটা সময়ে সরকারের একটি এসআরওর কারণে সাময়িকভাবে পাম্প আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে থাকলেও আমি দামটা সহনীয় পর্যায়ে রাখলাম। এভাবে ধাপে ধাপে দেশের বাজারে সুনাম আর পরিচিতি পেয়ে আমার পাম্প ব্যবসার পরিধিও বাড়তে থাকে।

 

পানির পাম্প বাজারজাত থেকে চায়ের রাজ্যে আসার গল্পটা কেমন?

নাদের খান: ফটিকছড়িতে ৩৮ একরের একটি জায়গা ছিল আমার। এখানে প্রথমদিকে গামারি গাছ লাগাই। এক বছরেই এর ফলাফল আমার মধ্যে উৎসাহ এনে দেয়। এ সময়ে আমার এক বন্ধু একজন চা ব্যবসায়ীকে আমার কাছে নিয়ে এলেন। হালদা ভ্যালি তখন বিক্রির প্রক্রিয়ায় ছিল। ১ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ২০০৩ সালে হালদা ভ্যালি নিয়ে নিলাম। এর আগে ১৯০৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাগানটি প্রায় ছয়বার হাতবদল হয়েছে। নেয়ার পর পরিত্যক্ত বাগানটিতে উৎপাদনের কোনো অনুকূল পরিবেশই পেলাম না। মাটি চা চাষের উপযোগী করা থেকে শুরু করে ফলন পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে কর্মপন্থা ঠিক করলাম। ২০০৫ সালে বিদেশী কোম্পানি ফিনলে বাগান বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করলে আমরা আটজনে মিলে সেগুলোও কিনে নিই।

বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি চায়ের গড় উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ কেজি। আপনাদের মালিকানার বাগানগুলোতে উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি। পরিত্যক্ত একটি চা বাগান কীভাবে দেশের শীর্ষ চা উৎপাদনকারী বাগানে পরিণত হলো?

নাদের খান: পানির পাম্পের ব্যবসায় অভিজ্ঞতা থাকায় ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পাইপ ও পাম্প আমদানির মাধ্যমে দেশে প্রথম কৃত্রিম সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করি আমার বাগানে। সেচ নলের মাথায় ঘূর্ণমান নজেল প্রায় ১২০ ফুট এলাকায় অবিরত বর্ষণ ব্যবস্থা করায় চা গাছের ওপর বৃষ্টির মতো পানি পড়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে অন্যান্য চা বাগানে পানির অভাবে হাহাকার পড়লেও টেনশন নেই হালদা ভ্যালিতে। এ স্থায়ী সেচ পদ্ধতিতে পাম্পের সাহায্যে পুরো বাগানে একসঙ্গে সেচ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। সেচের পাশাপাশি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার পদ্ধতি গড়ে তুলেছি হালদা ভ্যালিতে আলাদাভাবে। পাশাপাশি চা উৎপাদনের জন্য দক্ষ কর্মী নিয়োগ, গবেষণা ও সময়োপযোগী বিনিয়োগের মাধ্যমে বাগানগুলোকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

 

চা, চা বাগান আর আপনার স্বপ্ন নিয়ে বলুন...

নাদের খান: চা নিয়ে আমার স্বপ্ন ভ্যালু অ্যাডিশন করে টোটাল ইন্ডাস্ট্রিকে ডেভেলপ করা। বর্তমানে আমরা উৎপাদনের পাশাপাশি চায়ের গুণগত মান বৃদ্ধি ও ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। শূন্য থেকে শুরু করে হালদা ভ্যালিতে ১৪ বছরের মধ্যেই বছরপ্রতি গড়ে নয় লাখ কেজি উৎপাদনে উন্নীত করেছি। এটা দেশের চা খাতের জন্য একটি মাইলফলক। ২০২০ সালে এ বাগানের বার্ষিক উৎপাদন ১০ লাখ কেজি ছাড়িয়েছে। আমরা এখন এ বাগানের বার্ষিক উৎপাদন ২০ লাখ কেজিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। এজন্য গবেষণা থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগেও কার্পণ্য করছি না। হালদা ভ্যালির চা এখন চীনেও রফতানি হচ্ছে। রামগড়ের চা দেশেই বাজারজাত করছি। সেখানে ৫০ একরের একটি লেক করেছি। ফিনলেতে নরমাল ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি দুই রকমেই হচ্ছে। চায়ের ভ্যারাইটি বাড়াতে মনোযোগ দিচ্ছি।

সময়ের ধারাবাহিকতায় আমার ব্যবসা বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন আমার অনুভূতি হলো চা নিয়ে আমি বেশ এনজয় করছি। হালদা ভ্যালিকে ঘিরে এখন আমার স্বপ্ন। একমাত্র শতভাগ পারমানেন্ট ইরিগেশনের বাগান হালদা ভ্যালির এখন মোট আয়তন ১ হাজার ৫২ একর। পাশেই তিনটি প্লট মিলিয়ে ৮০০ একরের সরকারি খাস জমির জন্য আবেদন করে রেখেছি। এটা নেয়া হলেই দুই মিলিয়ন কেজিতে পৌঁছবে হালাদা ভ্যালির উৎপাদন। তখন সরকারও রাজস্ব হিসেবে প্রায় ৮ কোটি টাকা পাবে এ বাগান থেকে। হালদা ভ্যালিকে আমি ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনে রূপ দিতে চাই। এখানে পাঁচতারকা মানের হোটেল করার পরিকল্পনা রয়েছে আমার। হালদা ভ্যালি বাগানকে ডিস্টার্ব না করেই এর সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি পিকনিক স্পট করব।

 

চা খাতে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কী দেখছেন?

নাদের খান: চায়ের শুরু থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আসতে হয়েছে আমাকে। প্রথমত, চা নিয়ে এখনো আমাদের দেশে গবেষণার ঘাটতি আছে। গুরুত্বপূর্ণ এ জায়গাটিতে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। নিজস্ব উদ্যোগ আর গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে এখন পর্যন্ত যা করতে পেরেছি। দেশে চা আমদানি কমেছে। দৃশ্যপট বদলে এখন রফতানি হচ্ছে চা পাতা। এ শিল্পের জন্য একটা বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সীমান্ত এলাকায় স্মাগলিং বন্ধ হয়নি। বর্তমানে চা বোর্ড বিক্রির ওপর ১ শতাংশ কর কেটে নেয়। এটা এখন ২ শতাংশে আনতে চাচ্ছে চা বোর্ড। এ শিল্পের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ ভালো কিছু হবে না।

 

আমদানি থেকে আমরা ধাপে ধাপে সরে আসছি। এটা ভালো খবর। পাশাপাশি রফতানি বাজার শক্তিশালী করার কতটুকু সুযোগ রয়েছে দেশের উদ্যোক্তাদের?

নাদের খান: রফতানি বাজারে অবস্থান তৈরির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে আমাদের। দেশে চা চাষের জন্য উপযুক্ত যত বাগান বা জায়গা খালি আছে এতে যদি সরকার ইনসেন্টিভ দেয় কিংবা ল্যান্ডিং প্রগ্রেসিভ ওয়েতে লোন প্রদানের ব্যবস্থা করে তাহলে খুব দ্রুতই চা রফতানিমুখী শক্তিশালী খাতে পরিণত হবে। এ প্রক্রিয়ায় লোন দিলে অন্য কোনো খাতে খাটানোর সুযোগ থাকবে না। ১৬৫ চা বাগানে যে জায়গা খালি আছে তা কাজে লাগাতে হবে। এতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। চা উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। দেশে সারপ্লাস নিশ্চিত করে রফতানি বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে আমাদের।