একসময় মানুষের কাছে চা মানেই ছিল র চা। ব্রিটিশরা এ দেশে চা উৎপাদন করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এ দেশেও চা সংস্কৃতি গড়ে তোলে। রসনাবিলাসী বাঙালি চিনি ও দুধের সংমিশ্রণে চা পানে অভ্যস্ত হয়। শুরুতে গুড়ের ব্যবহার ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। তবে চায়ের প্রকৃত স্বাদ ও গুণাগুণ রক্ষা করে শরীরে সতেজ অনুভূতি আনতে লিকার বা র চায়ের বিকল্প নেই। বর্তমানে র চা পানেও আসক্ত হচ্ছে মানুষ। এ কারণে দেশের ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো টি ব্যাগ চা বাজারজাত শুরু করে, যা এখন অফিস-আদালতসহ সর্বত্র জনপ্রিয়।

গুঁড়ো ও দানাদার ব্ল্যাক চায়ের পাশাপাশি মানুষ এখন বিভিন্ন স্বাদের চা পানেও আকৃষ্ট হচ্ছে। যেমন বিশ্বব্যাপী অর্গানিক চা, গ্রিন টি ও বিভিন্ন ফুল-ফলের স্বাদযুক্ত চা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশে ক্রমশ গ্রিন টি উৎপাদন ও এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ভিন্ন স্বাদের একাধিক চায়ের জাত ও ফ্লেভারযুক্ত চা উদ্ভাবন ও উৎপাদন করেছে। মূলত সাধারণ চায়ের চেয়েও ভ্যালু অ্যাডেড চাই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি, চা শিল্পের উন্নয়ন ও উত্কর্ষে বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ ও সহায়তা দান ছাড়াও গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি চা শিল্পে প্রয়োগ করে আসছে। এটি দেশের ১২টি জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। এখন পর্যন্ত উচ্চফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগত মানসম্পন্ন ২১টি ক্লোন ও পাঁচটি বীজজাত চা উদ্ভাবন করেছে বিটিআরআই। বর্তমানে আটটি গবেষণা বিভাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে গবেষণার ফলস্বরূপ ২০১৬ সাল থেকে বিটিআরআই ১৬ জাতের ভ্যালু অ্যাডেড টি (মানসম্মত চা) উদ্ভাবন ও তৈরি করেছে। এছাড়া সাত ধরনের আর্টিজেন বা বেসিক চা উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিটিআরআইয়ের তথ্যমতে, আর্টিজেন চায়ের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে প্রিমিয়ার ব্ল্যাক টি, অর্থোডক্স টি, বিশেষায়িত গ্রিন টি, হোয়াইট টি, ইয়েলো টি, হোয়াইট পিওনি টি, ওলং টি। এছাড়া ফ্লেভারযুক্ত চায়ের মধ্যে রয়েছে সাতকড়া টি, লেমন টি, আদা টি, মাসলা টি (জিরা, দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ), আর্লগেরি টি (তুরস্কের সাইপ্রাস ফ্রুটস), জেসমিন টি, রোজ টি, তুলসী টি, পুদিনা/মিন্ট টি, স্টিভিয়া টি, সজনে টি, পাইনঅ্যাপল টি ও আমলকী টি।

বাংলাদেশের উদ্ভাবিত এসব চা ও বৈচিত্র্যময় বিটিআরআইয়ের মাধ্যমে সরকার প্রদর্শনী ও সীমিত পরিসরে বিপণন করছে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বাগান মালিকদের এসব চা উৎপাদনে সহায়তা দিয়ে আসছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের চায়ের সুনাম ছড়িয়ে দিতে দেশব্যাপী পাঁচটি বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে এসব চা প্রদর্শন করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম চা বোর্ড কার্যালয়, ঢাকা বিমানবন্দর, শ্রীমঙ্গলে বিটিআরআই কার্যালয়, টি রিসোর্ট সেন্টার ও ঢাকা র্যাডিসন হোটেলে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় চায়ের প্রদর্শনী কেন্দ্র খুলেছে চা বোর্ড।

 

ড. মো. ইসমাইল আলী: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট