জুলাই আন্দোলনে আমি যুক্ত হই ৪ জুলাই থেকে। ওই সময় শিক্ষকরা আন্দোলনে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কম ছিল। তবে পুলিশ যখন ১০-১১ তারিখের দিকে আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয় তখন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। আর এরপর যখন আমরা ১৪ ও ১৫ তারিখে ছাত্রলীগ এবং পুলিশের হামলার শিকার হই তখন শিক্ষার্থীরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন প্রায় সবাই হামলার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ওই সময়ে ছেলেমেয়ে সবাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। এখানে কাউকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগে বাধ্য করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে যায়। তখনো আমরা পৃথকভাবে যে যার মতো আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলাম। যারা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন তারা দেখা যেত নিজ এলাকায় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছেন। আমি শুরু থেকেই হলে থাকতাম না। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতাম। তখন কারফিউয়ের কারণে আরো বেশ কয়েকজন মেয়ে আমার কাছে ছিলেন। এছাড়া আমাদের মতো আরো অনেক মেয়েই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং আমরা চেষ্টা করতাম মেয়েদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে। মূলত আন্দোলনে নারী কিংবা পুরুষ এ পরিচয়ের চেয়েও তখন বড় পরিচয় ছিল আমরা সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ছিলাম। তখন মিছিলগুলোয় মেয়েরা যেমন সামনের সারিতে থাকতাম, আবার হামলার সম্ভাবনা থাকলে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ছেলেরা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত। শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নয় সারা দেশের চিত্রই এমন ছিল। এক কথায় ছেলেমেয়ে সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণেই জুলাই অভ্যুত্থান চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমে নারীদের এ বিপুল অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এর দুটো কারণ হতে পারে। প্রথমত, আমাদের দেশে সবসময়ই দেখা যায় ছেলে কিংবা মেয়েরা ওই সময়ে চূড়ান্ত প্রতিবাদ করে যখন কোনো পরিস্থিতি খুব সংকটময় হয়ে ওঠে। জুলাইয়ে যখন আন্দোলনে একের পর এক শিক্ষার্থী মৃত্যুবরণ করছিলেন, চোখের সামনে সহপাঠীরা হামলার শিকার হয়েছিলেন তখন সবাই এর বিরুদ্ধ প্রতিবাদে নেমে এসেছিলেন এবং বিজয় অর্জনের পর তারা বেশির ভাগই একাডেমিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেটি নারীদের জন্য অনুকূল নয়। ফলে আমাদের দেশে আগে থেকেই নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কম। এ অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে সর্বপ্রথম মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমরা ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এমন একটি পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলাম, কিন্তু এখনো নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে নারীরা এখনো রাজনীতিতে আসতে নিরাপদ বোধ করছেন না। হয়তো নতুন দল হয়েছে কিন্তু নারীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না সেই দলে তারা রাজনীতি করার জন্য অনূকূল পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা পাবেন কিনা। এ কারণেই নারীরা আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক কার্যক্রমে কম অংশগ্রহণ করছেন। তবে আমি মনে করি যদি আবার কোনো সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয় নারীরা একইভাবে এগিয়ে আসবেন। এছাড়া সার্বিকভাবেও ৫ আগস্টের আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম প্রকৃতপক্ষে সেই বাংলাদেশ এখনো পাইনি। একটা রেজিমের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কিন্তু দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয় এখনো আছে। বিচারের প্রক্রিয়া বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সংস্কার-বিচার এগুলো আরো দ্রুতগতিতে হতে পারত। তবে কিছু জায়গা আগের তুলিনায় ইতিবাচক। আগে রাজনৈতক দলগুলোকে নিপীড়ন করা হতো, কিন্তু এখন আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সহাবস্থান দেখতে পাচ্ছি। এ ধারা চলমান থাকলে আশা করছি সামনে আরো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ফাহমিদা ফাইজা, শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





