জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। অন্যান্য আন্দোলনে কৌশল ও সংখ্যাগতভাবে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, এখানে সে রকম জায়গায় আটকে ছিল না। বরং তারা কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়েই এ অভ্যুত্থানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন। বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণের সুদূরপ্রসারী প্রভাব অভ্যুত্থানে মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। যখন বড় আন্দোলন সমাজে বৃহৎ আকারে ছড়িয়ে যায়, সমাজের সব পদের মানুষ নেমে আসে, তখনই তো সেটাকে অভ্যুত্থান বলে। আন্দোলনটা অভ্যুত্থান রূপ লাভ করার ক্ষেত্রে নারীদের বিপুল সংখ্যায় নেমে আসাটা বড় ভূমিকা রেখেছে। কোনো আন্দোলনে যদি নারীরা সামনের সারিতে খুব বেশি অংশ নেন, তার একটা ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়। তখন সমাজের অন্যান্য স্তরের নারীরাও বেরিয়ে আসেন। এখানে সেটাই ঘটেছে। নারীরা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যরাও বের হয়ে আসেন।

কিন্তু বিশেষ প্রভাব ও ভূমিকা রাখলেও জুলাই অভ্যুত্থানের পর অর্থাৎ ৫ আগস্টের পর নারীদের দৃশ্যমানতা একেবারেই নাই হয়ে যায়। আমরা ৫ আগস্টের উদযাপন দেখেছি। পত্র-পত্রিকার ফ্রেমেও এটা পরিষ্কার যে নারীদের উপস্থিতি খুব অল্পই ছিল। বেশির ভাগ প্রচারিত ছবিগুলোয়, যেমন বিপুল সংখ্যক জনতার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে যাওয়া বা অন্যান্য জায়গায় যাওয়া ছবিতে বিপুল সংখ্যক পুরুষ রয়েছে; নারীদের সংখ্যা কম ছিল। পত্রিকা ও টেলিভিশনের ফ্রেম থেকেও নারীরা প্রথমে পেছনের সারিতে গিয়েছে, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছেন। জন ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর আনাগোনা কমে গেছে। মনে হয় যেন তারা আন্দোলন করে বাড়ি ফিরে গেছেন।

এর আগেও বাংলাদেশে যেসব আন্দোলন হয়েছে, নারীদের সব সময়ই ভূমিকা ছিল। চব্বিশের অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল। একইভাবে তাদের উধাও বা ফেরৎ যাওয়াটাও প্রবলভাবে হয়েছে। আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের পর নানা জায়গায় প্রচুর আলোচনা সভা হয়েছে। দেশ, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হবে—এগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সেসব আলোচনার টেবিলেও আমরা নারীদের দেখিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে নারীদের দেখিনি বা কম দেখা গেছে। যাদের দেখেছি তাদের উপস্থিত ছিল আলঙ্কারিক। ফলে মনে হয়েছে, গণপরিসরে নারীকে আর সরব দেখা যাচ্ছে না।

এর পেছনে অনেক কারণ আমরা নির্দিষ্ট করতে পারি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী অনেক কাজের চাপে থাকেন। দীর্ঘ সময় তার জন্য জনপরিসরে থাকাটা কষ্টকর। নারীদের মধ্যে যারা শিক্ষার্থী ছিলেন, তারা পড়ার টেবিলে ফিরে গেছেন। তারা রাজনীতির মাঠে থাকতে চাননি। কিন্তু যারা থাকতে চেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কিছু ঘটনা ঘটেছে। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। এটা একেবারে ৫ আগস্টের পর থেকেই। আন্দোলনে সামনের সারিতে নারীদের যে মুখগুলো ছিল, অভ্যুত্থানের সময় সহকর্মীদের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হননি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর একেবারে টার্গেটেড সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন। নারীদের জনপরিসর থেকে সরে যাওয়ার পেছনে এটা একটা কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

আমরা রাস্তায় যেসব যৌন নিপীড়নের কথা জানি, এগুলো জনপরিসরে থাকে না। কিন্তু যখন কেউ সাইবার বুলিং করে সেটা জনপরিসরে থেকে যায়। এটা তার পরিবার ও প্রতিবেশী সবার সামনে হাজির হয়। তাকে একটা ক্রমাগত ট্রমার মধ্যে থাকতে হয়। তাকে ভাবনায় ফেলে দেয় যে মানুষ এগুলো বিশ্বাস করছে কিনা। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ভুল তথ্য দেয়া হয়ে থাকে। এ আক্রমণের হাত থেকে নারী অভ্যুত্থান কর্মী—সে শিক্ষক বা শিক্ষার্থী, শিল্পী বা একজন শ্রমজীবী বা গৃহিণী হোন না কেন—কারো ক্ষেত্রেই সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

এভাবে জনপরিসরে নারীর যে স্বাভাবিক চলাফেরা সেটা থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মেয়েদের ঘরে আটকে রাখার যে দর্শন, সেটাকে উদযাপন করা হচ্ছে। প্রথমত, যারা এগুলো করছে তাদের কোনো তদন্ত বা বিচার হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি আরো ভয়ংকর যে নারী হয়রানিকারীকে গলায় মালা দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে নারীকে উত্ত্যক্ত করার কারণে রাজনৈতিক দল তাকে হয়তো বহিষ্কার করেছে, কিন্তু তার সমর্থকরা তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। এই যে নিপীড়ককে বীর হিসেবে উদযাপন করা—এটা ভয়াবহ একটা নজির।

এসব নজির নারীকে বার্তা দেয় যে জনপরিসরে নারীর অংশগ্রহণ বিঘ্ন করা হবে। এগুলো যদি কেউ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও বলতে চান, আমি বলব ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার জন্য এ ধরনের একটি ঘটনাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে নারীদের জন্য একটা ভয় তৈরি হয়েছে যে তাদের জনপরিসরে আসা বোধহয় সমীচীন না।

আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলোয় নারীরা যে যুক্ত হতে চেয়েছেন, নারীদের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলো সেটা পূরণ করেনি। ১০০ আসনে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণের প্রস্তাব ছিল সেটা মেনে নেয়া হয়নি। নারী অধিকার কর্মীদের দাবি ছিল ৩৩ থেকে ৫০ শতাংশ নারীদের মনোনয়ন দেয়া, সেই দাবিও রাজনৈতিক দলগুলো মানেনি। তারা মাত্র ৫ শতাংশের কথা বলেছেন। সেটাও আবার বাধ্যতামূলক করতে দেয়নি।

এসব ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, বাংলাদেশে নারীদের জন্য ভারসাম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরির পক্ষে আমরা যাইনি, যাচ্ছি না। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা হলো সরকার ও বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর।

ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়