গোলাম নাফিজের নাম আর ওর বাবার কথা শুনেই আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোলাম নাফিজের ছবিটি। অভ্যুত্থানে শহীদ সন্তানের পিতার সামনে যেতে আমার বুকে একটু তিরতির করে কাঁপন ধরে। সন্তানহারা এ পিতার সামনে গিয়ে আমি ঠিক কী বলব, উনাকে কী সান্ত্বনা দেব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
আমি পানি খেলাম। একটু লম্বা দম নিলাম। এক শহীদ পিতার সামনে গিয়ে বসার জন্য নিজেকে একটু প্রস্তুত করলাম।
নাফিজের বাবার সামনে গেলাম। সাধারণ পরিবারের এক পিতা। ছোটখাটো গড়নের একজন মানুষ। আমি যেতেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, ‘নাফিজের ছবি নিয়ে আপনার লেখা পড়েছি। আপনার লেখা আমরা অনেক যত্ন করে রেখেছি। আর রাজু ভাইয়ের তোলা ছবিটা। জীবন ভাইয়ের ছবিটা।’ আমি নাফিজের বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখলাম। এক শহীদের পিতার উষ্ণতা আমার বুকটা ভরিয়ে দিল। এক বীরের বাবার বুকের সঙ্গে আমার বুক মিলিয়ে নিজেকে গর্বিত অনুভব করলাম।
আমার প্রশ্নের জবাবে নাফিজের বাবা বললেন, ‘ভাই, সংসারে আমার স্ত্রী আছে, ওর বড় একটা ভাই আছে। আমার সোনার সন্তানটা চলে গেল, কিছুতেই মানতে পারছি না। আমাদের একটু দেখে রাখবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন।’
বললাম, ‘আপনার ছেলে দেশের মানুষের অধিকারের জন্য জীবন দিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য, সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে, রাজপথে তাজা রক্ত দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখে গেছে। হয়তো আপনি, এক সন্তান হারিয়েছেন।
এটাই সত্যি যে, আপনার সন্তানের জীবনের বিনিময়ে দেশ দানবীয় এক সরকারের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে মুক্তির জন্য নাফিজদের মতো কিশোর-তরুণরা জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৭১-এর বীর যোদ্ধাদের যেমন জাতি পরম মহিমায় স্মরণ করে, আপনার সন্তানকেও জাতি কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করবে। চব্বিশের জুলাই যোদ্ধাদের তালিকায় আপনার সন্তানের নাম জ্বলজ্বল করবে আজীবন। আপনার সন্তানকে নিয়ে আমরা গর্ব করে যাব আমৃত্যু। যতদিন অধিকারের জন্য মানুষ লড়াই করবে, ততদিন গোলাম নাফিজরা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
বললাম, আমাদের ‘রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। কবর জিয়ারতে গেলে বা বাসায় মিলাদ হলে আমাদের জানাবেন। আমরা সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করব। সময় পেলেই আপন মনে করে বণিক বার্তায় চলে আসবেন।’
গোলাম নাফিজের লড়াইয়ের স্মৃতি যুগ যুগ জাগরূক থাকুক। আমরা তার বাবার ছেলে হারানোর গর্বিত সমব্যথী। নাফিজের করকমলে গভীর শ্রদ্ধা।





