আবার কখনো তার ছেলের রক্তমাখা জামাটি বুকে চেপে বলেন, ‘আমার ছেলেটা শহীদ হয়েছে, দেশটা যেন বাঁচে!’ ২০২৪-এ সংগঠিত ‘বর্ষা বিপ্লবে’ বাংলাদেশের কয়েক হাজার মা সন্তানহারা হয়েছেন। নিজের সন্তান হারিয়ে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন। আবার অন্যের সন্তানের জন্য খাবার রেঁধে, পানি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। যার যতটুকু সামর্থ্য ততটুকু নিয়েই আন্দোলনকারী তরুণদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মায়েদের রাস্তায় নেমে আসার ঘটনাই শেখ হাসিনার পরাজয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

‘বর্ষা বিপ্লবে’ ঢাকায় আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল বনশ্রী-রামপুরা, আফতাবনগর-বাড্ডা এলাকা। এ এলাকায় অবস্থিত ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। বসবাসসূত্রে আমি আফতাবনগরের বাসিন্দা। শান্ত ও নিরিবিলি হিসেবে আবাসিক এলাকাটির পরিচিতি থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাইজুড়ে ছিল উত্তাল। মধ্য জুলাইয়ের পর থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই এলাকাটিতে রক্ত ঝরেছে। শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন রামপুরা-বাড্ডার মূল সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন। আন্দোলনকালে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন আফতাবনগরের মায়েরা। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে খাবার ও পানির বোতলের স্তূপ জমা হতো। মায়েরা খিচুড়ি রান্না করে নিয়ে আসতেন। নিজেরা খাবার বেড়ে খাওয়াতেন। কোনো মা-ই জানতেন না, তিনি কার সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন। আর সন্তানরাও জানতেন না, তিনি কার মায়ের রান্না খাচ্ছেন। পরম মমতায় আন্দোলনকারী তরুণ-তরুণীদের প্লেটে কিংবা মুখে খাবার তুলে দেয়ার সে দৃশ্য ছিল স্বর্গীয়।

এ দৃশ্য কেবল আফতাবনগরে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং ঢাকাসহ সারা দেশের মায়েরাই তার সন্তানদের পাশে দাঁড়াতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। হাসিনা বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর মহাখালী ও মিরপুর ডিওএইচএসে মিছিল-বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সেনা পরিবারের সদস্যরা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এসব আবাসিক এলাকায় সংগঠিত মিছিলের অগ্রভাগেও ছিলেন মায়েরা। রাজপথে নেমে আসা মায়েদের চোখে জল ছিল, কণ্ঠে প্রতিবাদ ছিল, আর হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশ। যেসব মা রাজপথে নামতে পারেননি, তারা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়েছিলেন। মায়েদের চোখের জল যেমন নীরব কান্না, তেমনি তার আহ্বান হলো বজ্রনিনাদের মতো জাগরণ। ইতিহাস সাক্ষী—বিপ্লবীরা যুদ্ধে যাওয়ার আগে মায়েদের আশীর্বাদ নিয়েছেন। রণাঙ্গনে বিজয়ী হয়ে মায়ের কাছে ফিরেছেন। আবার কেউ শহীদ হয়ে সেই মায়ের কোলে ফিরে চিরনিদ্রায় শুয়ে থেকেছেন সাহসের প্রতীক হয়ে। বাংলাদেশের মায়েদের এ জাগরণ জারি থাকুক।