এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য রেকর্ড রাখা, সত্য ও নির্ভুল তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়ে ওঠে গণমাধ্যমকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ এ সময়েই দেশের প্রতিটি খবর হয়ে ওঠে ইতিহাসের উপাদান। তাতে বাধা হয়ে আসে ই-যোগাযোগ সেবা বন্ধ করে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৮ জুলাই প্রথম দফায় সারা দেশে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্টারনেট সেবা। বহির্বিশ্ব থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। বড় শহর থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয় আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে। কখনো পুরো মোবাইল নেটওয়ার্কই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কখনো কখনো ব্লক করে দেয়া হয় বিভিন্ন ওয়েবসাইট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। এর ফলে সাধারণ মানুষ যেমন তথ্য থেকে বঞ্চিত হন, চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয় সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্বও।
আন্দোলন চলাকালে সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে, রাস্তায় অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা, বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের কর্মস্থলে পৌঁছাই হয়ে ওঠে একটি চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় অফিসেই থাকতে হয় টানা কয়েকদিন। অফিস হয়ে ওঠে অস্থায়ী নিবাস; সেখানেই রাত কাটানো, ব্রিফিং, তথ্য সংগ্রহ, খবর লেখা, সম্পাদনা, প্রুফ, মেকআপ, প্রিন্টিং—সবই করতে হয় অ্যানালগ সময়ে ‘ফিরে’ গিয়ে। দোকানপাট বন্ধ থাকায় ওই সময় চা, বিস্কুট আর কখনো-বা শুকনো খাবারে চলে রাতের প্রহর। গুলির শব্দে ঘুম আসে না। সঙ্গে পরিবারের চিন্তা তো আছেই। এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসার প্রবাদটা তখন সত্যি হয়ে সামনে আসে।
আন্তঃযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সবকিছু এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে নিতে হয়েছে পেনড্রাইভ দিয়ে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়তে হয়েছে তখন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে। সেক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে টেলিভিশন। সকাল থেকেই চোখ রাখতে হয়েছে টিভির পর্দায়। ঢাকার বাইরের সংবাদ সংগ্রহেও ছেদ পড়ে। বিমানে করে পেনড্রাইভের মাধ্যমেও নিউজ আর ছবি আনতে হয়েছে।
এ সময়েই গুজবের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নেয়। তাই সংবাদ যাচাই করা হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিরোনাম হওয়ার আগেই প্রতিটি তথ্যকে পেরোতে হয় একাধিক স্তরের যাচাই প্রক্রিয়ায়। একদিকে সংবাদ সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সরকারের চাপ—সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে এক ভারসাম্য রক্ষার খেলা। কখনো আবার হামলা হয় সংবাদকর্মীদের ওপর। তবুও দায়িত্ব পালন থেমে থাকে না।
গণ-অভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রই নয়, এটি সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি ইতিহাসও রচনা করে। আর সেই ইতিহাসের প্রাথমিক খসড়া লিখে রাখেন সংবাদকর্মীরাই। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেখান থেকেই জাতির আত্মচিত্র ফুটে ওঠে। সেই বিবরণ একদিন হয়ে ওঠে গবেষণার উপাদান, আন্দোলনের দলিল, সমাজ পরিবর্তনের ক্যানভাস।





