আজ বিশ্ব এলপিজি দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য ‘এলপিজি: পাস ইট ফরওয়ার্ড’। যার অর্থ ‘এলপিজি: এটি ছড়িয়ে দিন’। ওয়ার্ল্ড লিকুইড গ্যাস অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএলজিএ) ৭ জুন দিবসটি উদযাপন করে। এর লক্ষ্য হলো পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সহজলভ্য জ্বালানি হিসেবে এলপিজি কীভাবে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নত করছে, তার বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পণ্যটির প্রভাব যেমন বিস্তৃত, বাংলাদেশেও এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেশের এক কোটি পরিবার পণ্যটির সুবিধাভোগী। তবে পণ্যটির ব্যবহার শুধু বাসাবাড়িতে ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শিল্পে ব্যাপক হারে ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশের বাজারে বিকল্প এ জ্বালানির পুরোটাই প্রসার হয়েছে বেসরকারি খাতের হাত ধরে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এ বাজারকে গড়ে তুলতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি অবকাঠামো, সরবরাহ চেইন, সেফটি সিকিউরিটি, জনবলসহ নানা খাতে বিনিয়োগ করেছে। সামনের দিনগুলোয় এ খাতে আরো বড় বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধান ভূমিকা পালন করে এলেও গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রতিনিয়ত একটি বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, ফলে গৃহস্থালি পর্যায়ে নতুন পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং বহু অঞ্চলের ছোট-বড় শিল্প-কারখানা তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা হারাচ্ছে। এ প্রতিকূল বাস্তবতায় পরিচ্ছন্ন ও ধোঁয়াহীন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও সরবরাহযোগ্য হিসেবে এলপিজি একটি অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং গত এক দশকে বাংলাদেশের এলপিজি শিল্পে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে দেশে বার্ষিক এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ লাখ টন, সেখানে বর্তমানে তা জ্যামিতিক হারে বেড়ে গড়ে বার্ষিক ১৬ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ১০% হারে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি নির্দেশ করে এবং এ খাতের প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক অবদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সমগ্র এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিচালিত, অর্থায়িত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের সাহসী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে।
দেশের বাজারে এলপিজি বাজার সরবরাহ ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশী উদ্যোক্তারাও এ খাতে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। বর্তমানে তিনটি বিদেশী কোম্পানি দেশে এলপিজি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে। মার্কেট লিডার হিসেবে শীর্ষস্থানে এসব কোম্পানি গত কয়েক বছরের ব্যবধানে উঠে এসেছে।

এলপিজি বাজারে ব্যবসায় বিনিয়োগের লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত ৫৮টি কোম্পানি লাইসেন্স গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ২৮টি। তবে বাস্তবতা হলো ছোট বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় অনেক শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিও এ খাত থেকে ছিটকে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত জ্বালানির বাজার কয়েক বছর ধরে অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে আমদানি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, মুদ্রামান অবনমনসহ নানা কারণে এ খাতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ খাতের নিরাপত্তা। বিষয়টি নিয়ে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো কাজ করলেও এ খাতে এটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বাজারে গত এক দশকে এলপিজি বড় বাজার তৈরি করলেও এ বাজারের টেকসই ও নিরাপদ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে এখনো বাজারে এলপিজির দাম নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে বড় অসন্তোষ রয়েছে। রেগুলেটরি কমিশনের ঘোষিত দামে পণ্যটি বাজারে না পাওয়ার অভিযোগ গ্রাহকের। সেই সঙ্গে সিলিন্ডার ব্যবহারের যথাযথ জ্ঞান ও ধারণা না থাকায় প্রায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এলপিজির দুর্ঘটনা ঘটছে। টেকসই ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবে এলপিজির বাজার গড়ে তুলতে হলে এ খাতে কাঠামোগত উন্নয়ন ও সচেতনতাবোধে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে সরকার ও অপারেটরদের।
এলপিজি এখন বাসাবাড়িতে নয়, গাড়িতেও সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বড় জায়গা করে নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় ১ হাজার ১০০টির মতো অটোগ্যাস স্টেশন তৈরি হয়েছে। সারা দেশে সাড়ে চার হাজার ডিলারের মাধ্যমে এ খাতে বিপুল পরিমাণ জনবলের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। শিল্পেও এলপিজির বড় ব্যবহার শুরু করছেন উদ্যোক্তারা। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বড় আকারে এলপিজির ব্যবহার হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ খাতে অন্তত দেড় হাজার শিল্পগ্রাহক তৈরি হয়েছে। যেখানে প্রতি মাসে ১০ হাজার টন এলপিজির ব্যবহার হচ্ছে।





