তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারে দেশে বড় একটা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন এনেছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় পেট্রোলিয়াম পণ্যটি বড় ভূমিকা রাখছে। আগামীতে এ খাতের সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?
এলপিজি আজ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা লাখো পরিবারের জন্য পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎস হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি জ্বালানি কাঠের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে এলপিজি আগামী দিনগুলোতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। ওমেরা সহজ ৫ দশমিক ৫ কেজি সিলিন্ডারের মাধ্যমে আমরা বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার এবং জ্বালানি কাঠ ব্যবহারকারীদের এলপিজির আওতায় আনার চেষ্টা করছি। এর ফলে গাছ কাটার প্রবণতা কমবে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সুবিধা আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
আবাসিক থেকে শুরু করে গাড়িতে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। শিল্পেও ব্যয়সাশ্রয়ী হিসেবে পণ্যটি ক্রমান্বয়ে বড় জায়গা করে নিচ্ছে? কিন্তু আমদানিনির্ভর পণ্যটির ট্যারিফ নিয়ে একধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ প্রতিবন্ধকতা কীভাবে মোকাবেলা করা যায়?
এলপিজি একটি আমদানিনির্ভর পণ্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং ট্যারিফ কাঠামোর প্রভাব সরাসরি এ শিল্পে পড়ে। আমরা মনে করি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ প্রয়োজন। সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওমেরা শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সোর্সিং নেটওয়ার্ক এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারের এ পরিবর্তনগুলো মোকাবেলা করে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে আসছে।
এলপিজির ব্যবহার ও ব্যয় কমাতে পণ্যটির মজুদ অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের। কিন্তু গত এক দশকেও এ অবকাঠামো নির্মাণ করা যায়নি। বেসরকারি খাত দেশে এলপি গ্যাসের বাজার তৈরি করেছে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অপারেটররা এগিয়ে আসতে পারে কিনা?
বাংলাদেশে এলপিজি শিল্পের বিকাশে বেসরকারি খাত এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বৃহৎ পরিসরের স্টোরেজ অবকাঠামো গড়ে তুলতেও বেসরকারি খাত আগ্রহী। তবে এ ধরনের বিনিয়োগকে আরো কার্যকর ও টেকসই করতে সহায়ক নীতিমালা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দেশের অন্যতম শীর্ষ এলপিজি অপারেটর হিসেবে ওমেরা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এলপি গ্যাস বৃদ্ধির পাশাপাশি সেফটি-সিকিউরিটি ইস্যুটি বড় আকারে প্রশ্ন তুলছে। বেসরকারি পর্যায়ে কমপ্লায়েন্স সেফটি ইস্যু নিয়ে বেসরকারি খাত কী ধরনের কাজ করছে?
সেফটি সিকিউরিটি, দায়িত্বশীল এলপিজি অপারেটরদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শিল্প খাতজুড়ে মান নিয়ন্ত্রণ, সিলিন্ডার পরীক্ষণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ভোক্তা সচেতনতা কার্যক্রমে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
সেফটি সিকিউরিটির ক্ষেত্রে ওমেরা কখনই কোনো আপস করব না। আমরা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করি এবং নিরাপদ এলপিজি ব্যবহারের জন্য নিয়মিতভাবে মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করি। পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব সিলিন্ডার উৎপাদন কারখানা এবং নিবেদিত কোয়ালিটি ও সেফটি টিম রয়েছে, যারা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে কাজ করে।
এলপিজি খাতের বড় বাজারের সম্ভাবনা রয়েছে অটোগ্যাসে। কিন্তু এ খাতের ব্যবসা পরিচালনায় ৯০ শতাংশ পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স নেই। বিষয়টি যেমন উদ্বেগের তেমনি বড় ধরনের হুমকিও। এসব জটিলতা কাটাতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?
অটোগ্যাস খাত পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী পরিবহনের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নিরাপদ ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সব অপারেটরের লাইসেন্সিং ও নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা, তদারকি জোরদার করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি এ খাতকে আরো সুশৃঙ্খল করতে পারে। একই সঙ্গে আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অটোগ্যাস স্টেশনে অননুমোদিত সিলিন্ডার ক্রস-ফিলিং কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। কারণ এ ধরনের কার্যক্রম ভোক্তা, অপারেটর এবং পুরো শিল্পের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
সামনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। এ বাজেটে এলপি গ্যাস খাতে আমদানি, পণ্যটির অবকাঠানোগত উন্নয়নে কর সুবিধা ব্যাপারগুলো রয়েছে। কোথায় কোথায় সরকারের নীতি ও ছাড় দিলে এ খাত আরো টেকসই হতে পারে?
আমরা মনে করি স্টোরেজ সুবিধা, টার্মিনাল, নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং লজিস্টিকস উন্নয়নে নীতিসহায়তা ও কর সুবিধা বিনিয়োগকে আরো উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে এলপিজি অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ওপর যৌক্তিক কর কাঠামো শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপ সরবরাহ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করবে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তারাও উপকৃত হবেন।

দেশের বাজারে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিদেশী কোম্পানি এ খাতে ব্যবসা করছে। প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি, বাজারে সামনের দিনগুলোতে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন কিনা?
প্রতিযোগিতা একটি বিকাশমান শিল্পের জন্য ইতিবাচক বিষয়। এটি উদ্ভাবন, সেবার মানোন্নয়ন এবং ভোক্তার জন্য আরো ভালো মূল্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবে বাজারের সুস্থ বিকাশের জন্য সব প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের নিরাপত্তা, মান এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ওমেরা প্রতিযোগিতাকে চ্যালেঞ্জ নয়, বরং উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখে। বাংলাদেশের এলপিজি বাজার সবসময়ই প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছিল এবং আমরা সেই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই দেশের অন্যতম শীর্ষ এলপিজি ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ভোক্তার আস্থা, পণ্যের গুণগত মান এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা।
এলপিজির দাম নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন পক্ষ একে অন্যকে দোষারোপ করছে। কমিশন ঠিকমতো ভূমিকা রাখতে পারছে না এমন অভিযোগ গ্রাহকেরও। সমন্বিত এমন কোনো পদক্ষেপ রয়েছে কিনা যা এ বাজারে অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতা কাটাতে পারে?
এলপিজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আরো সমন্বয়, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন।
ওমেরা সবসময় চেষ্টা করে যাতে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি পেতে পারেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা আমাদের ডিলার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল প্লাটফর্ম এবং নিজস্ব হোম ডেলিভারি ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্য স্বচ্ছতা ও নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ বাজারে আরো স্থিতিশীলতা ও ভোক্তাদের মাঝে আস্থা তৈরি করবে।
অনেকের কাছেই এখনো এলপিজি প্রচলিত রান্নার জ্বালানির তুলনায় ব্যয়বহুল মনে হয়। তাহলে কেন পরিবারগুলোকে এলপিজিতে আসার কথা ভাবা উচিত?
প্রাথমিকভাবে এলপিজির খরচ কিছুটা বেশি মনে হলেও এটি বহন সুবিধা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে উল্লেখযোগ্য উপকার নিয়ে আসে। এলপিজিতে রান্না দ্রুত হয়, রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন থাকে এবং জ্বালানি কাঠ বা অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানির ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবারকে সুরক্ষা দেয়।
ওমেরা নিম্ন আয়ের পরিবার এবং নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য ওমেরা সহজ ৫ দশমিক ৫ কেজি সিলিন্ডার বাজারে এনেছে, যা এলপিজিকে আরো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের উদ্যোগ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে এমন অনেক পরিবারের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসছে, যারা আগে এলপিজি ব্যবহারের কথা ভাবতে পারতেন না। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে এলপিজির ব্যবহার আরো বিস্তৃত করতে সহায়তা করছে।
সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যে এলপিজি সম্পর্কে ধারণা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?
এলপিজি প্রথমদিকে অনেকের কাছে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি দেশের লাখো পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। ভোক্তারা এখন এলপিজির সুবিধাজনক ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আমরা বিশ্বাস করি, সচেতনতা বৃদ্ধি, বিতরণ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং ওমেরা সহজ-এর মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো বেশি মানুষ এলপিজির আওতায় আসবেন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার আরো বিস্তৃত হবে।





