আমার মতে, এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি যে শুধু দুই মেয়াদে অর্থমন্ত্রী ছিলেন তা-ই নয়, তার সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, বাণিজ্য উদারীকরণ করার প্রক্রিয়াটি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন সেগুলো অত্যন্ত সমাদৃত ছিল।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপগুলো তার আমলে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে যে কাঠামোগত সংস্কার এবং সেখানে বাণিজ্য উদারীকরণ শুরু হয়েছিল সেটা তার অধীনেই হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে তিনি টাকা ও ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেন এবং তখনো দেশের বাজার কোনো রকম ঝুঁকিতে পড়েনি। একই সময়ে তিনি ব্যাংক খাতের বেশ বড় বড় কিছু সংস্কার করেন। দুঃখজনকভাবে অবশ্য সে সংস্কারগুলো পরে আবার অন্য সরকার এসে পেছনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে সময় ওই সংস্কারগুলোর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তাতে একদিকে অর্থনীতি বিশ্বায়নের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পেরেছিল, অন্যদিকে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা পেয়েছিল।

সাধারণত বিশ্বায়নের সঙ্গে যুক্ত হতে যে ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন হয়, বাজার উদারীকরণের সংস্কারে অন্যান্য দেশে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, বাংলাদেশে কিন্তু সেটা হয়নি। এ ধরনের সংস্কারের বিরুদ্ধে যেকোনো দেশে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা থাকে। কিন্তু সাইফুর রহমানের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও সরকারের ওপর প্রভাব ছিল, পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তার ওপর যে আস্থা ছিল, তার ফলেই তিনি এ কঠিন সংস্কারগুলো করতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি এমনভাবে সংস্কারগুলো করেছিলেন, এমন কৌশল ও সময় নির্ধারণ করেছিলেন যে তাতে দেশের ভেতরে তেমন নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ সংস্কারগুলোর সময় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলাম। অনেক বিষয়ে, বিশেষ করে বাণিজ্য উদারীকরণ, ডলারের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে তার সঙ্গে আমার পরামর্শ করার সুযোগ হয়েছে। আমি সেটাকে আমার সৌভাগ্য মনে করি।

এটা সত্য, তিনি যে সংস্কারগুলো শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে আমরা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছি। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে তখন সংস্কারের ফলে বেসরকারি খাতের অনেক ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত ব্যাংক খাতের এসব সংস্কারের অনেকই পরবর্তী সময়ে বিপরীতমুখী হয়ে গিয়েছিল। ব্যাংক খাত বর্তমানে যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, সেটা খুবই দুঃখজনক। তবে আমি মনে করি, সাইফুর রহমানের প্রবর্তিত সংস্কারগুলোর ছাপ কোনোদিনও মুছে যাবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার পেছনের দিনে ফিরে না গিয়ে বিশ্বায়নের সঙ্গেই থাকবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে। যদি থাকে এবং ভবিষ্যতে যে থাকবে তাতে সাইফুর রহমানের অবদানই আমি সবচেয়ে বেশি বলে মনে করি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যে উচ্চ-মধ্যবিত্ত অর্থনীতিতে আমরা পৌঁছতে পারব, আমি মনে করি তার ভিতও সাইফুর রহমান গড়ে দিয়ে গেছেন।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি নিজে তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি সবসময়ই তার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তিনি আমার পরামর্শ গ্রহণ করতেন। যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো গ্রহণের আগ মুহূর্তে আমি তার সঙ্গে ছিলাম। টাকা-ডলারের বিনিময় হার যেদিন বাজারমুখী হবে বলে ঘোষণা করা হলো, সেদিন আমি তার সঙ্গে ছিলাম। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের অর্থনীতির বড় ধরনের যে বাণিজ্য সংস্কার হয়েছিল, সে সময় তার সঙ্গে আমার ক্রমাগত পরামর্শ হতো। আমি তাকে সে পরামর্শগুলো দিতে পেরে, তার সান্নিধ্যে আসতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। অত্যন্ত দুঃখজনক একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান, সেজন্য পুরো জাতি শোকাহত হয়েছিল। তার প্রতি, তার স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এই দেশ, এই দেশের অর্থনীতিতে তার কাজের ছাপ চিরকাল থাকবে। তিনি আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: উপদেষ্টা, শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়