বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থনীতি ও সংস্কারকে মিলিয়ে যদি ভাবতে হয়, মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব সেক্ষেত্রে অন্যতম অনুকরণীয় ব্যক্তি (ওয়ান অব দ্য রোল মডেল)। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক হিসেবে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে, জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনে এবং তাদের জীবনের মানোন্নয়ন করতে যা যা করা দরকার, তিনি সবই করেছেন।

বাংলাদেশে একদলীয় বাকশাল রাষ্ট্রচালিত অর্থনীতি থেকে বাণিজ্য উদারীকরণের মতো বড় ধরনের যে রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন) আমরা দেখেছি, তা সাইফুর রহমানের হাত ধরে শুরু হয়েছে। বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির যে অধ্যায়টা শুরু হয়, সেখান থেকে আমাদের বেসরকারি খাত উঠে এসেছে। প্রাইভেট সেক্টর সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের যে ধারণা ছিল এবং উন্নয়নের রাজনীতি, উৎপাদনের রাজনীতির যে দর্শন ছিল, তাতে সাইফুর রহমান মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন। কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ, সরকারি খাতের উদ্যোগ সব মিলিয়ে কাজটা তিনি সফলভাবে করেছেন। তখন সবার জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়েছিল। সক্ষমতা অনুযায়ী সবাই সুযোগটা নিতে পেরেছিল। এটা ছিল উন্নয়নের অর্থনীতিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ।

এছাড়া ব্যাংক খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়া, বেসরকারি খাতে যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের সরবরাহ প্রদানও তিনিই শুরু করেছিলেন। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্যও বেশকিছু পদক্ষেপ সাইফুর রহমান নিয়েছিলেন।

তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো রাজস্ব আহরণের বিষয়টিতে। তিনিই প্রথম ভ্যাট প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের রাজস্বকে উচ্চমানে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজস্ব না থাকলে তো উন্নয়ন সম্ভব না। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে যে কাজগুলো করা প্রয়োজন সেগুলো করাও সম্ভব না। এক্ষেত্রে তিনি খুব সফলভাবে কাজ করেছেন। তিনি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। যে কারণে অন্য উন্নয়নগুলো করা সম্ভব হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা থেকে তিনি সরে এসেছেন। ক্রমান্বয়ে আমাদেরে দেশীয় সম্পদ আহরণের মাধ্যমে বিদেশী অর্থায়নে উন্নয়নের যে মডেলটা ছিল সে মডেলটা থেকে সরে এসেছিলেন তিনি।

আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টেক অফ করানোর জন্য যেসব বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তা দক্ষিণ এশিয়ায় আর কেউ নেয়নি। যেমন আমাদের তৈরি পোশাক খাত। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে সাইফুর রহমান যে সুবিধাগুলো দিয়েছিলেন, তাতে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পেয়েছে। কারণ ব্যাক টু ব্যাক এলসি হলে আমদানি খরচটা থাকে না। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হলে ট্যাক্সের বিষয়টা থাকে না। সে কারণে মধ্যবিত্ত শিক্ষিতরা তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায় ঢুকতে পেরেছে। তখন শত শত ফ্যাক্টরি হয়েছে, পরবর্তী সময়ে হাজারের ওপর হয়েছে। সে সময় কিন্তু শুধু উৎপাদন নয়, বিশাল একটা কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, বহুলাংশে সেটি ছিল নারীদের জন্য। নারী ক্ষমতায়নে কিন্তু তৈরি পোশাক শিল্পের বড় ভূমিকা আছে। এখনো কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীদের যে অংশগ্রহণ, দক্ষিণ এশিয়ায় তা বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। গার্মেন্টসের মতো একটা সেক্টরের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হয়েছে। এই যে নারীরা বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছে, আয় করছে, তাদের নির্ভরশীলতা কমায় তাদের ক্ষমতায়ন বাড়ছে, সেটায়ও কিন্তু বড় একটা ভূমিকা রয়েছে গার্মেন্টসের।

সাইফুর রহমানের নেয়া আরেকটা বড় পদক্ষেপ ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার নমনীয় করে স্থিতিশীলতা আনয়ন, বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। আমাদের যে ৪০ শতাংশের মতো টাকার মূল্যমান কমে গেল, তার ধাক্কা কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা এখনো সামলাতে পারছেন না। এ কারণেই সাইফুর রহমান আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হারটা শিথিল রেখে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার সময় রিজার্ভ ও বিনিময় হারটাও স্থিতিশীল ছিল। তাছাড়া পুঁজিবাজার স্থির ছিল। যদিও তখন আমাদের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন খুব বড় হয়নি কিন্তু অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল। কোনো ধরনের ধাক্কা খায়নি। তিনি মাইক্রো স্ট্যাবিলিটিটা নিশ্চিত করেছিলেন। সে ধারায় বাংলাদেশ বহুদিন চলেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সাইফুর রহমানের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ অবদান হলো কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা। একেবারে নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ ছেলেমেয়েদের স্কুলে না দিয়ে কাজে পাঠাত। কারণ তাদের সে আয়টার প্রয়োজন আছে। এটাকে মাথায় রেখে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষাটা চালু করা হয়। ওরা স্কুলে গেলে খাদ্য পেত, ফলে দুপুরের খাওয়ার টাকাটা বেঁচে যেত। তাই তারা স্কুলে যেত। এটা সে সময় বেশ বড় প্রভাব রেখেছিল। এতে স্কুলগুলোয় ছেলেমেয়ে বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। অনেক দেশ এটা করতে পারেনি, বাংলাদেশ করেছে।

সাইফুর রহমান যেটা বিশ্বাস করতেন, সে জায়গায় দৃঢ় থাকতেন। রাজনৈতিক চাপের কাছে তিনি কখনই নত হননি। তার একটা উদাহরণ হলো ব্যাংক খাত। এই যে বর্তমানে এত ব্যাংক, যাদের ব্যাংক সম্পর্কে কোনো ধারণাও নেই, পরিচালনা তো দূরের কথা তারাও ব্যাংক চালাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর ডুবতে বসেছে। সাইফুর রহমান কিন্তু রাজনৈতিক চাপেও ব্যাংকের লাইসেন্স দেননি। যদিও তখনো চাপ ছিল। যেখানেই তিনি মনে করেছেন অর্থনীতির ক্ষতি হবে, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জনগণের ক্ষতি হবে সেখানে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

সাইফুর রহমানের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। যেহেতু আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম আর তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের, আমাদের একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হতো। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব পছন্দ করতেন। আমরা একসঙ্গে অনেক ভ্রমণও করেছি। তিনি খেতে খুব ভালোবাসতেন, খাওয়াটাকে উপভোগ করতেন। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে আমি কখনই তাকে ডিঙাতে পারিনি!

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় স্থায়ী কমিটির সম্মানিত সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী