যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫৭ বছর আগের কথা। তখন ভারতবর্ষের সম্রাট ছিলেন বিক্রমাদিত্য। তিনি চালু করেন বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকা। তবে বিক্রমাদিত্য হিন্দু রাজা ছিলেন বলেই হয়তো একে হিন্দু পঞ্জিকাও বলা হয়। তাছাড়া একসময়ের হিন্দু রাষ্ট্র নেপাল এখনো এ পঞ্জিকা মেনে চলে বলেই আন্তর্জাতিক মহলে তা হিন্দু পঞ্জিকা বলে পরিচিত। যদিও অনেকে একে নেপালি ক্যালেন্ডারও বলে। কালের আবর্তনে বিক্রমাদিত্যের সাম্বাত পঞ্জিকাই হয়েছে বাংলা পঞ্জিকা।

ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য ঘটনার অনুরণন। সময়ের শিলালিপি হয়ে তারা সমৃদ্ধ করে চলে আমাদের বর্তমানকে। শোনা যায়, রাজা শশাঙ্কের শাসনামলে ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। ততদিনে বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের বয়স হয়ে গেছে ৬৫০ বছর। তাছাড়া যখন বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের সূচনা, তখন কিন্তু বাংলা ভাষা লিখিত রূপে ছিল না। ছিল সংস্কৃত ভাষা। ঠিক যে সময়টাতে বাংলা ভাষার লিখিত রূপ তৈরি হয়, তখনই বাংলা ক্যালেন্ডারের যাত্রা শুরু। মূলত বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারকেই বাংলায় লেখা হয়। মাসের নামগুলোও প্রায় অবিকলই আছে।

তবে অনেক ইতিহাসবিদই আবার মনে করেন, বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের চেয়েও পুরনো বৌদ্ধ ক্যালেন্ডার। আর তা আরো ৪৮৮ বছরের পুরনো, প্রাচীন। তবে বৌদ্ধ পঞ্জিকা, বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকা কিংবা বাংলা পঞ্জিকা—প্রকৃতপক্ষে একই। তাছাড়া সব পঞ্জিকাতেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র—বারো মাসেরই নাম রয়েছে।

সবচেয়ে চমত্কার বিষয় হচ্ছে, শুধু বাংলাদেশ নয়; ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, ভুটান, শ্রীলংকাও একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নববর্ষ উদযাপন করে। তারা এটিকে বৌদ্ধ পঞ্জিকা বলে থাকে। তাই পয়লা বৈশাখ শুধু বাঙালির নববর্ষ নয়, এটি পুরো দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নববর্ষ। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোও এ পঞ্জিকা অনুসরণ করে থাকে। এটি তাদেরও নববর্ষ।

বর্ষবরণের উৎসবটিকে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা মর্যাদা ও মমতার সঙ্গে লালন ও পালন করে। বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসুক, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, সাংক্রান। চাকমাদের বিজু, ত্রিপুরাদের বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু, মারমাদের সাংগ্রাইং বা সাংগ্রাই। নামকরণ আর উদযাপনে খানিকটা পার্থক্য থাকলেও বিষয়বস্তুর আলোকে তথা অন্তর্নিহিত তাত্পর্যে এটি অভিন্ন এক উৎসব। তাছাড়া উৎসবের নাম নিয়ে বিভিন্ন গল্পও প্রচলিত রয়েছে। এমন একটি গল্প যেমন নৃগোষ্ঠীগুলোর লোকবিশ্বাস অনুযায়ী চৈত্র মাসের শুরুতেই একটি পাখি এসে ‘বিজু’ বলে ডেকে যায়। এ পাখিকে চাকমা সম্প্রদায় ‘বিজু পেইক’ বা ‘বিজু পাখি’ বলে। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা তিন দিনব্যাপী মহাধুমধামে বর্ষবরণ উৎসব পালন করে আসছে কিন্তু সেই প্রচীনকাল থেকে।

সুপ্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসবকে বলা হতো বিষুব-সংক্রান্তি। তাই ধারণা করা যায়, ওই শব্দ দুটি থেকে ধীরে ধীরে সংক্ষেপিত ও পরিবর্তিত রূপে কোথাও বিষু, বিহু, বৈসুক বা বৈসু ও বিজু হয়েছে আবার কোথাও সংক্রান, সাংক্রান (চাংক্রান), সাংক্রাই, সাংগ্রাইং ইত্যাদি রূপ নিয়েছে।

এ পর্যায়ে আবারো অতীত থেকে ঘুরে আসা যাক। ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা জানি যে পাল থেকে সেন, সেন থেকে নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মুসলিম মুঘল সম্রাটদের হাতে চলে যায় ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতা। মুঘলরা ক্ষমতায় এসে ইসলামিক বা আরবি ক্যালেন্ডার ‘হিজরি’ অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর এবং তার পুত্র দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন হিজরি সাল অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করেন। তবে তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর চান্দ্র মাসিক ক্যালেন্ডার পাল্টে বাংলা ক্যালেন্ডার পুনঃস্থাপন করেন।

হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র মাসভিত্তিক হওয়ায় ৩৫৪/৩৫৫ দিনে বছর হয়, যা সৌর বছরের (৩৬৫/৩৬৬ দিনে বছর) চেয়ে ১০/১১ দিন ছোট। ফলে হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী একই মাস ঘুরে ঘুরে কয়েক বছর পরে ভিন্ন ঋতুতে আসে। ফলে কৃষকদের খাজনা দিতে অসুবিধায় পড়তে হয়। কারণ, কৃষকদের ফসল বিক্রি করে খাজনা দিত কৃষকেরা। চান্দ্র মাসের বছর একেক সময় একেক ঋতুতে শেষ হয় বলে তখন ফসল তোলার সময়টা পঞ্জিকায় ঠিক থাকত না। এ অসুবিধা দূর করার জন্য সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেউল্লা সিরাজিকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌরবর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন। এভাবেই সৌরবর্ষপঞ্জি বাংলা পঞ্জিকার নবযাত্রা শুরু।

তবে, মূল পঞ্জিকায় অধিবর্ষ (প্রতি চার বছরে এক দিন বেড়ে যাওয়া, অর্থাৎ ৩৬৬ দিনে বছর হওয়া) সংক্রান্ত একটি জটিলতা ছিল। এতে বাংলা তারিখের মিল রাখা যেত না ইংরেজি তারিখের সঙ্গে। যেমন কোনো বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ৮ ফাল্গুনে পড়ছে তো কোনো বছর ৯ ফাল্গুনে। তথ্য মতে, এ বিষয়ক সমস্যা দূর করতে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি ফাল্গুন মাসকে অধিবর্ষের মাস ঘোষণা করেন।

চৈত্রসংক্রান্তির দিনকে পঞ্জিকার ভাষায় বলা হয় বিষুব-সংক্রান্তি বা মহাবিষুব-সংক্রান্তি। কারো কারো মতে, সংস্কৃত শব্দ সংক্রান্ত (যার অর্থ পরিবর্তন) থেকেই সংক্রান্তি শব্দের উত্পত্তি। বাংলা একাডেমির অভিধানে বিষুব, সংক্রান্ত বা সংক্রান্তি শব্দসমূহের উত্পত্তি নির্দেশ করা হয়েছে সংস্কৃত থেকে। এতে বিষুব শব্দের অর্থ যে সময়ে দিন ও রাত্রি সমান হয় ইত্যাদি উল্লেখ রয়েছে। আর সংক্রান্তি শব্দের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে সূর্য ও গ্রহাদির এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন; সঞ্চার, মাসের শেষ দিন (চৈত্রসংক্রান্তি) ইত্যাদি।

বাংলা নববর্ষ একটা বিশুদ্ধ স্থানীয় ও লোক উৎসব। এ একই প্রকৃতির উৎসব ভারতের আসামে বিহু, হিমাচল প্রদেশ ও হিমালয়ের প্রায় সবক’টি রাজ্যে বিষুব-সংক্রান্তি আর নেপালে বিষু উৎসব নামে পরিচিত। অন্যদিকে মিয়ানমারে এটি ছিংগায়ান ও থাইল্যান্ডে সংক্রান নামে পরিচিত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন নামে এ লোক উৎসব পালন করে থাকে। পাঞ্জাবে যেমন বৈশাখী, হিমাচলে বাসোয়া। মৈথিলীতে জুড়ি শীতল আর শ্রীলংকায় আলুথ আওরুদ্ধা।

এপ্রিলের ১৪ তারিখ বা তার দুয়েকদিন আগে-পরে বছরের প্রথম দিন বা নববর্ষ পালনকারী জাতি-গোষ্ঠীর সংখ্যা কিন্তু অনেক। যাদের সঙ্গে হয়তো শশাঙ্ক থেকে শুরু করে আকবরের শাসনের কোনো নিকট সম্পর্ক নেই। তবে মূল ভিত্তি অপরিবর্তিত রেখে এ ক্যালেন্ডার নানা আকারে, নানা রূপে গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল এলাকাজুড়ে ব্যবহূত হচ্ছে কমপক্ষে ২৫০০ বছর ধরে। যেমন ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল হচ্ছে ২০৭৮তম নেপালি বর্ষের প্রথম দিন (পয়লা বৈশাখ)।

পয়লা বৈশাখে নববর্ষ পালনের সবচেয়ে পুরনো ইতিহাসটা পাওয়া যায় কৌলিয় সম্রাট অঞ্জন কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৬৯১ সালে। মানে, গৌতম বুদ্ধেরও দেড়শ বছর আগে। বা আজ থেকে ২৭০৬ বছর আগে। এখান থেকে বাংলা ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের সবচেয়ে পুরনো দাবিটা হয় সম্রাট অঞ্জনের।

আগেই উল্লেখ করেছি যে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাউস, ভিয়েতনাম, ভুটান ও শ্রীলংকার মতো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশগুলোতে একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। ওরা একে বলে বৌদ্ধ পঞ্জিকা। বিভিন্ন দেশে কিছুটা ভিন্নতাভেদে যিশুর জন্মের ৫৪৫ থেকে ৫৪৩ বছর আগে এর উদ্ভব। অর্থাৎ বিক্রম সাম্বাত ক্যালেন্ডারের চেয়ে বৌদ্ধ ক্যালেন্ডার আরো ৪৮৮ বছরের পুরনো। আর নেপালি বর্ষের দিকে তাকিয়ে এ কথা তো বলাই যায়।

যুগান্তরের জীবন পদ্ধতির অন্তরেই সংস্কৃতির জন্ম ও বিকাশ। জীবনের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক তাই অবিচ্ছিন্ন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষ যা জন্মসূত্রে লাভ করে না, যা তাকে শিখে নিতে হয়। পয়লা বৈশাখ তাই শুধু বাঙালির নববর্ষ নয়, এটি পুরো দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নববর্ষ। বাংলাদেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এ পঞ্জিকা অনুসরণ করে এবং এটি তাদেরও নববর্ষ।

তাছাড়া পৃথিবীর খুব কম দেশেরই নিজের একটি পঞ্জিকা আছে। সে বিবেচনায় আমরা কিন্তু গর্ব করতেই পারি যে আমাদের নিজস্ব একটি পঞ্জিকা আছে। আছে নিজস্ব নববর্ষ। যে কয়টি সৌভাগ্যবান দেশের নিজস্ব পঞ্জিকা রয়েছে, তারা খুব ঘটা করেই নিজের নতুন বছরের আগমনকালকে উদযাপন করে।

 

রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক