পৃথিবীর নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ (বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী)। অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশের ১৫-৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যারা অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারেন। এ বিপুল জনসম্পদকে বাংলাদেশ যদি ব্যবহার করতে সমর্থ হতো তবে অর্থনীতির অবস্থা অনেক বেশি সমৃদ্ধ করা হয়তো সম্ভব হতো। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এ বিপুল জনসম্পদের একাংশ বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাইগ্রেট করে এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের থেকে এগিয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান জনশক্তি রফতানিতে ওপরের দিকে। বাংলাদেশের বেশ বড় মাইগ্র্যান্ট নেটওয়ার্ক আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। জনশক্তি রফতানির পেছনে এই মাইগ্র্যান্ট নেটওয়ার্ক বড় অবদান রেখে চলছে।
মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ভিত্তিতে বলা যায়, মাইগ্রেশন বা অভিবাসন এমনি একটা জীবন ও জীবিকার উপায়, যা মূলত পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলেই সংঘটিত হয়। কারণ পরিবার তার জীবিকার উৎসগুলোকে নিরাপদ করতে চায়। এতে করে ভবিষ্যতে তাদের পারিবারিক আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য আসে এবং যেকোনো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে পারিবারিক আয় সুরক্ষিত থাকে। মাইগ্রেশন মানুষ বিভিন্ন স্থানে করে থাকে, যেমন দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরে।
তাত্ত্বিকভাবে, মাইগ্রেশন প্রবণতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি। কারণ স্থানীয়ভাবে তাদের কাজের সুযোগ-সুবিধা শহরের তুলনায় কম। গ্রামীণ জীবন কৃষিকাজনির্ভর হওয়ায় এবং ব্যবসা, চাকরি বা অন্যান্য জীবিকার উৎসগুলোও অপর্যাপ্ত বিধায় মাইগ্রেশনকে বেছে নিতে তারা বাধ্য হয়। আবার বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাইগ্রেশন হয় শহরাঞ্চলমুখী। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি না হয়ে বরং স্বল্পমেয়াদি মাইগ্রেশন সংঘটিত হয়। দেশের বাইরে যারা অভিবাসী হয়ে পাড়ি জমান তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। তারা দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিদেশে থাকেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের পরিবার দেশেই অবস্থান করেন, যার কারণে দেশে টাকা পাঠানো তাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
সফল অভিবাসন অর্থাৎ অভিবাসনের উদ্দেশ্য যদি পূরণ হয় তাহলে তার ভালো প্রতিফলন পড়ে রেখে যাওয়া পরিবারের ওপর। এর কারণে একদিকে পরিবার যেমন আর্থিকভাবে সচ্ছল ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক তেমনি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরো মজবুত হয়। একটি পরিবার থেকে সফল মাইগ্রেশনের ফলে রেমিট্যান্স অর্জিত হয়, যা ওই পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করতে পারে। রেমিট্যান্স পারিবারিকভাবে সম্পদ অর্জন, আয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। এছাড়া গবেষকরা বিভিন্ন দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখিয়েছেন যে রেমিট্যান্স প্রবাহ পারিবারিক পর্যায়ে আয় বৃদ্ধি ছাড়াও মানবসম্পদ গঠনেও ভূমিকা রাখে। যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশেও রেমিট্যান্সের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপর্ণ। অনেক গবেষক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখিয়েছেন কীভাবে পারিবারিক আয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও জনসম্পদ গঠনে রেমিট্যান্স ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের কারণে দৃশ্যমান পরিবর্তন কম হলেও অদৃশ্যমান বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মাইগ্রেশনের ফলে পাওয়া রেমিট্যান্স প্রবাহ থেকে অনেকভাবে উপকৃত হয়। অর্থনীতির গতি সচল রাখতে এবং বেগবান করতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের প্রভাব অতুলনীয়। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন ২০০৭-২০০৯ সময়কালে পৃথিবীর অর্থনীতিতে ইকোনমিক রিসিশন দেখা দেয়। এ সময়ে আমেরিকান অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় সব দেশের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে। ওই সময়ে যদিও বিভিন্ন অর্থনৈতিক পলিসি গ্রহণ করা হয় কিন্তু তারপরও বেশ কয়েক বছর লাগে সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য। বাংলাদেশ মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল যে অর্থনীতির গতি মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে পড়বে এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। সে সময় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক রিকভারির জন্য পলিসি গ্রহণ করা হয় কিন্তু বাংলাদেশের হাতে তখন ট্রাম্পকার্ড হিসেবে রেমিট্যান্স ছিল, যা অর্থনৈতিক রিকভারির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যতটা ধারণা করা হয়েছিল, ঠিক ততটা খারাপভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আক্রান্ত হয়নি রেমিট্যান্সের অব্যাহত প্রবাহের কারণে। অর্থনৈতিক কাণ্ডারির ভূমিকায় তখন আবর্তিত হয় রেমিট্যান্স প্রবাহ, যা এখনো বাংলদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বর্তমানের প্রেক্ষাপটেও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে দেশের রিজার্ভ যখন হুমকির সম্মুখীন ঠিক তখনই রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করা হচ্ছে। কারণ রেমিট্যান্স প্রবাহ এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে এবং করছেও। রেমিট্যান্স একটি দেশের বিনিয়োগকে প্রভাবিত করে যার সুদূরপ্রসারী ভূমিকা অর্থনীতিতে পড়ে। রেমিট্যান্স বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপি গ্রোথ বাড়াতে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতেও অসামান্য অবদান রাখে। আমার পিএইচডি গবেষণায় আমি মাইগ্রেশনের প্রভাবে পারিবারিক সম্পদ বাড়তে দেখেছি। এছাড়া এর প্রভাবে পরিবারের আয়ও বেড়েছে এবং একই কারণে পরিবারের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। অর্থাৎ মাইগ্রেশন এমনই একটি জীবন ও জীবিকা, যা একটি পরিবার তথা ইকোনমিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম। তবে আমরা রেমিট্যান্স বলতে সবসময়ই অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সকে বুঝি কিন্তু সোশ্যাল রেমিট্যান্সের ভূমিকা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দেশ থেকে টাকার সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসীরা মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক উপাদান, শিক্ষা, প্রযুক্তিসহ অনেক কিছু পাঠান যা দেখা যায় না, কিন্তু এর তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এই রেমিট্যান্স সামাজিক চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, শিক্ষা পদ্ধতি, প্রযুক্তিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী অবদান রাখে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল কিন্তু বাংলাদেশ থেকে অদক্ষ জনশক্তি রফতানি বেশি পরিলক্ষিত হয়। অদক্ষ জনশক্তি রফতানি করে বাংলাদেশ যে রেমিট্যান্স আয় করে তার থেকে অনেক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব স্বল্প-দক্ষ ও দক্ষ জনশক্তি রফতানি করে। তাই বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও স্বল্প-দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ওপর বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগানোর অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে অভিবাসন, যা আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিকে আরো মজবুত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষেরা মাইগ্রেট করে, কারণ তাদেরই ধরা হয় পরিবারের রুটি-রুজির বন্দোবস্তকারী এবং মহিলারা সাধারণত ঘর সামলান, যা বাংলাদেশ সমাজ কাঠামোর বহিঃপ্রকাশ। এমতাবস্থায় মাইগ্রেশনকে শুধু পুরুষের জন্য উন্মুক্ত না করে জেন্ডার-নিরপেক্ষ ভাবার সময় এসেছে। এতে সমাজ কাঠামোয় এবং মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন আসবে। মহিলাদের ক্ষমতায়নেও এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ মাইগ্রেশন সংঘটিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে, যেখানে কাজের নিশ্চয়তা, কাজের পরিবেশ এবং বেতন কাঠামো ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় অনুন্নত। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কর্মীদের কাজের ভালো পরিবেশ, কাজের নিশ্চয়তা এবং উচ্চ বেতন পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে, যা মাইগ্র্যান্টদের উৎসাহিত করতে পারে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।










