সম্মাননাপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা হলেন চট্টগ্রামের জননী খাদ্য ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী বন্দনা নাথ, ঢাকার ইনক্রেডিবল প্রা. লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. তৌকির আহাম্মদ, ঢাকার ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের স্বত্বাধিকারী মো. মনির হোসেন, নরসিংদীর মেসার্স খলিল টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী মো. খলিল মিয়া, ফরিদপুরের মেসার্স সুকুমার ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী সুকুমার সাহা, যাত্রাবাড়ীর সুজন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মো. তমিজ উদ্দিন ও দিনাজপুরের সুতার কাব্যের স্বত্বাধিকারী সিরাজুম মনিরা

প্রাইম ব্যাংকের সহযোগিতায় যাত্রা সহজ হয়েছে
মো. তৌকির আহাম্মদ
স্বত্বাধিকারী, ইনক্রেডিবল প্রাইভেট লি.
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ছয়জন তরুণ থেরাপিস্টের একটি স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়। চারজন স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট এবং দুজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তাদের একটি লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি সমন্বিত থেরাপি সেন্টার গড়ে তোলা, যেখানে বিশ্বমানের সেবা দেশের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
শিক্ষাজীবন শেষে দীর্ঘ প্রায় সাত বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তারা উপলব্ধি করেন যে বাংলাদেশে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন থেরাপি সেবার সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে অনেক পরিবারকে শিশুদের উন্নত সেবার জন্য বিদেশে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
এ বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় ইনক্রেডিবল প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার আগে ইনক্রেডিবলের উদ্যোক্তারা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের থেরাপি সেন্টার পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা আধুনিক থেরাপি পদ্ধতি, সেবার মান এবং শিশুকেন্দ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক ও সহযোগিতা গড়ে তোলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল—বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে দেশের মধ্যেই বিশ্বমানের সেবা প্রদান করা।
তবে যাত্রার শুরুটা সহজ ছিল না। সে সময়ে অধিকাংশ মানুষ অটিজম, স্পিচ ডিলে, এডিএইচডি, ডিস্লেক্সিয়া, আচরণগত চ্যালেঞ্জ কিংবা শিশু উন্নয়ন সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখতেন না। অনেক অভিভাবক সামাজিক সংকোচের কারণে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথাও বলতে চাইতেন না। সে সময়ে তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ায় অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এমনকি উপযুক্ত জায়গা ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
কিন্তু শুরু থেকেই ইনক্রেডিবলের উদ্যোক্তারা সেবার মান নিয়ে আপসহীন ছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত সেবার মাধ্যমে অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। তাই বিভিন্ন উন্নয়নজনিত বিষয় নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সর্বোচ্চ মানের থেরাপি সেবা প্রদান অব্যাহত রাখি আমরা।
এরপর ধীরে ধীরে অভিভাবকদের আস্থা বাড়তে থাকে। সেবা গ্রহণ করে উপকৃত পরিবারগুলো অন্য পরিবারকে ইনক্রেডিবলের কথা জানাতে শুরু করে। এই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া বিশ্বাসই হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ইনক্রেডিবল ব্যাপক সাড়া পায়। শুরুতে যেখানে প্রতিষ্ঠাতা ছয়জন এবং সাতজন থেরাপিস্ট নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩০ জনে উন্নীত হয়। বর্তমানে ইনক্রেডিবলের দুটি শাখায় দেশী ও বিদেশী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ১২২ জন থেরাপিস্ট ও পেশাজীবী শিশুদের উন্নয়ন ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
এ দক্ষ টিম প্রতিদিন শিশুদের যোগাযোগ, আচরণ, শেখার দক্ষতা, সামাজিক বিকাশ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। এ কার্যক্রমই ইনক্রেডিবলকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল শিশু উন্নয়ন থেরাপি সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমানে গুলশানের পাশাপাশি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতেও ইনক্রেডিবলের শাখা সম্প্রসারিত হয়েছে। আর এ যাত্রায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। শাখা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রাইম ব্যাংক অসাধারণ সহযোগিতা প্রদান করে। বিশেষ করে ব্যাংকটির এসএমই বিভাগের দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা ইনক্রেডিবলের প্রবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় আমাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন খুবই সহজ হয়েছে।
আমরা মনে করি, প্রাইম ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং একটি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির সহায়ক মনোভাব, দ্রুত সেবা প্রদান এবং উদ্যোক্তাবান্ধব সুবিধা ইনক্রেডিবলের মতো উদীয়মান প্রতিষ্ঠানকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
বর্তমানে প্রাইম ব্যাংকের প্রায়োরিটি কার্ড গ্রাহকেরাও ইনক্রেডিবলের বিভিন্ন সেবায় বিশেষ সুবিধা উপভোগ করছেন, যা দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করেছে।
ক্ষুদ্র তাঁত থেকে শিল্প উদ্যোক্তা

মো. খলিল মিয়া
স্বত্বাধিকারী, মেসার্স খলিল টেক্সটাইল, নরসিংদী
মেসার্স খলিল টেক্সটাইল আজ নরসিংদীর অন্যতম পরিচিত গ্রে কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং এক নিরলস পরিশ্রমের গল্প।
নরসিংদী সদর উপজেলার চৌওয়ালা শিল্প অঞ্চলে মেসার্স খলিল টেক্সটাইলের অবস্থান। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ৩৩৪টি তাঁত মেশিন পরিচালিত হচ্ছে, কর্মসংস্থান হয়েছে দুই শতাধিকেরও বেশি। প্রতি মাসে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আট লাখ গজ গ্রে কাপড়। তবে এ অবস্থানে পৌঁছার পথ মোটেও সহজ ছিল না।
১৯৮৬ সাল থেকে বাবার হ্যান্ডলুম (তাঁত) ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। স্থানীয়ভাবে কাপড় উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে আমাদের জীবিকা চলত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডলুম ব্যবসা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় একসময় আমি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে পাড়ি জমাই। প্রায় ১৮ মাস সেখানে অবস্থান করলেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। বিদেশের চাকরি বা ব্যবসায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে আবার দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই।
দেশে ফিরে দেখি বাবার বয়স বেড়ে গেছে এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ব্যবসাটিও আগের মতো নেই। তখন সিদ্ধান্ত নিই পারিবারিক ব্যবসার হাল নিজের হাতে তুলে নেয়ার।
২০০২ সালে মাত্র ১৬টি মেশিন এবং প্রায় ৮ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে আমি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করি। সেই সময়ে লক্ষ্য ছিল আধুনিক পদ্ধতিতে গ্রে কাপড় উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা। সীমিত মূলধন, অনিশ্চিত বাজার এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সত্ত্বেও আমি চেষ্টা করি ধীরে ধীরে ব্যবসাকে এগিয়ে নেয়ার।
প্রথম কয়েক বছর ছিল অত্যন্ত কঠিন। উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছিল না। ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১১ সালে সঞ্চিত সব টাকা দিয়ে একটি বাড়ি ক্রয় করি। এতে ব্যবসার কার্যকরী মূলধনে চাপ সৃষ্টি হয় এবং আরো আর্থিক সংকটে পড়ে যাই। ঠিক সেই সময়ে প্রাইম ব্যাংক এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রথমে ৭ লাখ টাকার সিসি (হাইপো) ঋণ প্রদান করে। এ অর্থ ব্যবসার চলতি মূলধনের সংকট কাটিয়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সময়মতো ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাংকের আস্থা অর্জন করায় পরবর্তী বছরগুলোয় ঋণের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ে। একসময় সিসি (হাইপো) সুবিধা ৫০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। বর্তমানে প্রাইম ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকার সিসি (হাইপো) ঋণ এবং ১ কোটি টাকার জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছি।
দুই দশকেরও বেশি সময়ের নিরলস পরিশ্রমের ফলে আজ মেসার্স খলিল টেক্সটাইল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবসায়িক মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকায়। অতি দ্রুত আরো ১২০টি নতুন মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্পিনিং মিল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও রয়েছে আমার। আশা করি সে সময়ও প্রাইম ব্যাংককে পাশে পাব।
২ হাজার টাকায় শুরুসুজন মেটালের

তমিজউদ্দিন
প্রতিষ্ঠাতা, সুজন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ
আমার জন্ম মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে জীবনের পথচলা শুরু করি। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে একটি বাথরুম ফিটিংস কারখানায় স্বল্প বেতনে চাকরি করি। সেখান থেকেই শিল্প ও ব্যবসা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ১৯৭৮ সালে মাত্র ২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করি। প্রথমে বিভিন্ন কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ করতাম, পরে নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার উৎপাদিত বাথরুম ফিটিংস পণ্যের চাহিদা বাজারে বাড়তে থাকে।
ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে পুঁজির সংকট ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময় প্রাইম ব্যাংকের এসএমই ঋণ আমাকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। ঋণের অর্থ দিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন শুরু করি, যা ব্যবসার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজ ‘সুজন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন বাথরুম ফিটিংস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে প্রতিষ্ঠিত কারখানায় বর্তমানে প্রায় ২৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ১০ বিঘা জমির ওপর নতুন ও আধুনিক শিল্প-কারখানা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
আমার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে আরো সমৃদ্ধ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সরকারের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সুবিধা ও স্বল্প সুদে শিল্প ঋণ সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো বড় অবদান রাখতে পারব, ইনশা আল্লাহ।
শূন্য থেকে গ্রুপ অব কোম্পানি

মো. মনির হোসেন, স্বত্বাধিকারী, ক্রিয়েটিভ বিজনেস গ্রুপ
প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকে একটি ছোট স্বপ্ন, অনেক সংগ্রাম এবং কিছু সাহসী সিদ্ধান্তের গল্প। আমাদের গল্পটাও ঠিক তেমনই। ২০০৮ সালে ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও আমাদের উদ্যোক্তা জীবনের বাস্তব ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি হয় ২০১৪ সালে। এ বছর ক্রিয়েটিভ ক্লিপিং পাথ লিমিটেড (সিসিপিএল) প্রতিষ্ঠা করি আমরা। আন্তর্জাতিক বাজারে ইমেজ পোস্ট-প্রডাকশন ও ক্রিয়েটিভ সার্ভিস প্রদানকারী একটি ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু হওয়া সিসিপিএলের মূল শক্তি ছিল দক্ষ জনশক্তি, সততা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির মানসিকতা।
তবে সে সময়ে আমাদের কাছে বড় মূলধন ছিল না, ছিল না বড় অফিস কিংবা শক্তিশালী অবকাঠামো। তরুণদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারের অসীম সম্ভাবনা পূরণ করাই ছিল লক্ষ্য। তবে উদ্যোক্তা জীবনের পথ কখনই সরল নয়।
২০২০ সালে করোনা মহামারী পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। বিশ্বের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন আমরাও একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। আমাদের শত শত কর্মী, হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং চলমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
সেই সংকটময় সময়ে যখন অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা পেতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন প্রাইম ব্যাংক আমাদের পাশে দাঁড়ায়। প্রাইম ব্যাংকের প্রণোদনা সহায়তা এবং আস্থাভিত্তিক ব্যাংকিং সহযোগিতা শুধু একটি আর্থিক সহায়তা ছিল না, এটি ছিল আমাদের জন্য একটি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির অনুষঙ্গ। সে সহযোগিতা আমাদের ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেক সময় একটি ব্যবসার জন্য অর্থায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয় একজন অংশীদারের বিশ্বাস। প্রাইম ব্যাংক আমাদের প্রতি সেই বিশ্বাস দেখিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা শুধু সংকট কাটিয়ে উঠিনি, বরং নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে গেছি।
আজ ক্রিয়েটিভ বিজনেস গ্রুপের অধীনে ছোট-বড় ১৪টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ছয় শতাধিক জনবলের।
আমার ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছে প্রাইম ব্যাংক

সুকুমার সাহা
স্বত্বাধিকারী, সুকুমার ভান্ডার
আমি ২০০৯ সালের জুন থেকে প্রাথমিকভাবে ব্যবসা শুরু করি। তবে পুঁজি সংকটের কারণে সে সময় ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছিলাম না। পারিবারিক মূলধন দিয়ে কোনোমতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যবসা চালিয়ে যাই, পরবর্তী সময়ে আমার চলতি মূলধনের প্রয়োজন হলে আমি প্রাইম ব্যাংক ফরিদপুর শাখায় যোগাযোগ করি। তারা আমার ব্যবসায়িক সব কাগজপত্র দেখে ২০১৩ সালে আমার জমি বন্ধক রেখে ২০ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করেন।
আমি আমার নিজস্ব মূলধন ও প্রাইম ব্যাংকের সহায়তায় ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকি এবং আমার ব্যবসায়িক সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সংগঠিত করি। ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করায় আমার ব্যবসার গ্রাহকরা আমার ওপরে অধিকতর আস্থা রাখতে শুরু করে। এতে আমার ব্যবসার পরিধি দিন দিন আরো বাড়তে থাকে।
প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার সুবাদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচি প্রদান করে এবং আমাকে উদ্বুদ্ধ করে, আমার ব্যবসার পরিধি আরো কীভাবে বড় করা যায়। আমার ব্যবসায়িক জ্ঞান ও ব্যাংকের সহায়তাই আমার ব্যবসা দিন দিন বড় হতে থাকে। ২০২৬ সালে আমি মোট ৪ হাজার ৬২ টন তিল বিক্রি করেছি। এরই মধ্যে ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রেড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিল রফতানিও শুরু করেছি। ২০১৩ সালে আমার ঋণসীমা মাত্র ২০ লাখ টাকা থাকলেও বর্তমানে আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে সিসি (হাইপোফিকেশন) সীমা ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা হয়েছে। এসডিএফ ও কনভেনশনাল ঋণসীমা উন্নীত হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায়।
বর্তমানে আমি তিল ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও লক্ষ্য রয়েছে শিগগির প্রথম স্থান অধিকার করার।
অংশীদার হিসেবে প্রাইম ব্যাংককে পেয়ে গর্বিত

সিরাজুম মনিরা
স্বত্বাধিকারী, সুতার কাব্য, দিনাজপুর
নারীদের কর্মসংস্থান ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের শুধু ঘরের কাজের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে বাইরে এনে কাজে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু হয় ‘সুতার কাব্য’র। ব্যবসার শুরুতে সবচেয়ে বড় দ্বিধা ছিল—কোন পণ্য নিয়ে কাজ করা যায়। অনেক ভাবনাচিন্তার পর দেশীয় কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর বিপুল চাহিদা বিবেচনা করে পরিবেশবান্ধব পাটজাত হস্তশিল্পকে বেছে নেয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর আগে পণ্যকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা এবং কর্মীদের নিয়মিত বেতন সচল রাখতে দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রির এক কঠিন লড়াই করতে হয়েছে। একটি সুশৃঙ্খল ও দক্ষ ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং এবং সেলস টিম গড়ে তোলা ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এ পুরো সময়টা পার করতে হয়েছে অদম্য সংগ্রাম আর ধৈর্যের সঙ্গে। সীমাহীন এ প্রতিকূলতার মাঝেও ‘সুতার কাব্য’কে এগিয়ে নিয়েছে কিছু মহৎ উদ্দেশ্য ও আত্মবিশ্বাস। নিজের আত্মনির্ভরশীলতার পাশাপাশি এলাকার পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কিছু করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।
কাজের স্বীকৃতি সবসময় নতুন উদ্যমে পথচলার সাহস দেয়। সুতার কাব্য ২০২৩ সালে অর্জন করে ব্যবসায়ে অনন্য অবদানের জন্য সম্মানজনক ডিএইচএল-দ্য ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৫ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জাতীয় পুরস্কার। এ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলো মানুষের এবং দেশের জন্য আরো বড় কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
তবে সুতার কাব্যর এ পথচলা সহজ ছিল না। যাত্রার শুরুতে ছিল না পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনবল কিংবা পণ্য উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা। আবার একই সঙ্গে ছিল মূলধনের অভাব। একটি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডানা মেলতে সঠিক সময়ে সঠিক আর্থিক সহযোগিতা অপরিহার্য। সুতার কাব্যের সেই ক্রান্তিলগ্নে আশীর্বাদ হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রাইম ব্যাংক। ২০০৩ সালে যখন সুতার কাব্য নিজেদের জায়গায় কারখানার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তখন প্রাইম ব্যাংক মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ২৫ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা প্রদান করে।
এ আর্থিক সহায়তা ব্যবসার প্রসারে এবং রফতানি বাজারে পা রাখার ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।
প্রথম দফার ঋণ সফলভাবে পরিশোধের পর সুতার কাব্য বর্তমানে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা উপভোগ করছে, যা প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধনের চাহিদা পূরণ করে ব্যবসাকে গতিশীল রাখছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য একটি ব্যাংককে অংশীদার হিসেবে পেয়ে সুতার কাব্য গর্বিত এবং প্রাইম ব্যাংকের এ সময়োচিত ও দূরদর্শী সহযোগিতাকে সবসময় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
ঋণের ওপর ভিত্তি করেই পুনরায় ব্যবসা করছি

বন্দনা নাথ
স্বত্বাধিকারী, জননী খাদ্যভাণ্ডার
আমি একজন সাধারণ গৃহিণী। চট্টগ্রামের মিরসবাই থানার আবুতোরাব বাজারে আমার মুদি দোকান। মূলত ব্যবসাটি ছিল আমার স্বামীর। ২০২১ সালের ৭ মে তিনি পরলোক গমন করলে ছোট ছোট দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। স্বামীর চিকিৎসায় ৬ লাখ টাকারও বেশি খরচ হওয়ায় অনেকটাই শূন্য হয়ে পড়ি।
আমার স্বামী ছিলেন অনেক বড় একজন ব্যবসায়ী। আমাদের উত্তরবঙ্গ থেকে চালসহ সব মুদিপণ্য আসত। পাইকারি, খুচরা দুটোই ছিল। ফলে ওনার প্রায় ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য আরো ২০-৩০ লাখ টাকার মতো ঋণ ছিল। এসব ঋণ শোধ করতে গিয়ে দোকানের অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়ে। সেই সময় দোকান দেখাশোনা করত আমার ছেলে। দোকান চালানোর ক্যাশ ফুরিয়ে যাওয়ায় আমার ছেলেটার পক্ষে একা দোকান সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন আমি ঘর থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
কিন্তু ব্যবসা পুনরায় চালু করতে গিয়ে মূলধন জটিলতায় পড়ি। অনেক ব্যাংকের কাছে লোনের জন্য গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার আগে থেকে বড় অংকের একটা ঋণ থাকায় কোনো ব্যাংক আমাকে ঋণ দিতে রাজি হচ্ছিল না। আমার কাছে সম্পদ ছিল, কিন্তু হাতে কোনো ক্যাশ টাকা ছিল না বলে সব পথ বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি খুবই ভেঙে পড়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে ঠিক তখনই প্রাইম ব্যাংক আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
প্রাইম ব্যাংকের স্থানীয় শাখার ব্যবস্থাপক আবু তাহের সাহেব আমার সঙ্গে কথা বলে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। কাগজ জমা দেয়ার পর তিনি সব খোঁজখবর নিয়ে আমাকে ডেকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করলেন।
অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমাকে ঋণ দেয়া হয় প্রাইম ব্যাংক থেকে। সেই সময় আমার কাছে এটি অনেক বড় পাওয়া হয়ে উঠেছিল। এ ঋণের ওপর ভিত্তি করেই আমার ব্যবসাটি পুনরায় দাঁড় করাতে পেরেছি।
সব মিলিয়ে প্রাইম ব্যাংক আমার জীবনে আশার আলো দেখিয়েছিল বলেই আজ আমি এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি। প্রাইম ব্যাংকের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।







