উন্নয়নগামী বিশ্বে ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই উন্নত বীজ, রাসায়নিক সার ও আধুনিক সেচ সমন্বিত ‘উফশী’ (উচ্চফলনশীল) প্রযুক্তির বিকাশ শুরু হলেও বাংলাদেশের কৃষিতে এর প্রসার ঘটে স্বাধীনতা-উত্তরকালে। এ প্রযুক্তির আর্থসামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। লেখকের ডজনখানেক গবেষণালব্ধ রিপোর্ট/প্রকাশনা ছাড়াও বিআইডিএস ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ফলাফল মোটামুটি অভিন্ন। উফশী প্রযুক্তি বিকাশের ফলে উৎপাদন বেড়েছে, ফসলের ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এবং সর্বোপরি সম্প্রসারিত হয়েছে অন্যান্য গ্রামীণ কর্মকাণ্ড। কিন্তু যে জিনিসটা নিঃসন্দেহে হয়নি তা হলো, দারিদ্র্য নিরসন। অন্য কথায়, খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু দেশের খাদ্য ঘাটতি কমেনি কিংবা কর্মসংস্থান বেড়েছে কিন্তু বেকার সমস্যার সমাধান হয়নি। এ কারণেই সচেতন গবেষকদের মনে সংশয় জাগা স্বাভাবিক যে, এই বিশেষ প্রযুক্তির সার্বিক বিকাশে কিংবা এর নিট প্রভাব নির্ণয়ে কোথাও না কোথাও বড় রকমের গলদ রয়ে যাচ্ছে।
উফশী বীজের ব্যবহার বাংলাদেশে, বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তরকালে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ১৯৬৯-৭০ সালে মোট খাদ্যশস্যের জমির মধ্যে উফশী বীজের আওতায় ছিল মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। তা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৩ শতাংশে। খাদ্যশস্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উফশী বীজের ব্যবহার হয়েছে গমের ক্ষেত্রে। শেষ সময়কালে এর পরিমাণ ছিল ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ প্রয়োজন, সেসব খাদ্যশস্যের জমিতে গমের স্থান একেবারেই নগণ্য। গুরুত্ব হিসেবে পরবর্তী ফসল হলো বোরো। এ ফসলের ক্ষেত্রে আলোচ্য সময়কালে শতকরা সংখ্যাটি ২৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭৬-এ পৌঁছে। তবে এ ফসলটিও মোট খাদ্যশস্যের মাত্র ১৩-১৪ শতাংশ পরিব্যাপ্ত করে। আউশ ও আমনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে উফশী বীজের ব্যবহার কম। এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে টানা যায়, প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রতিটি খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে উফশী বীজের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ষাটের দশকের গোড়ার দিকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। ১৯৬৯-৭০ সালে বাংলাদেশে মোট শূন্য দশমিক ১৩২ মিলিয়ন মে.ট (মিলিয়ন মেট্রিক টন- সারের ক্ষেত্রে নিউট্রিয়েন্ট মানে) সার ব্যবহূত হয়। ওই বছর মোট নিট শস্যজমির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৮১ মি. হে (মিলিয়ন হেক্টর); অর্থাৎ ওই বছরে গড়ে হেক্টরপ্রতি সার ব্যবহূত হয়েছে ১৫ নিউট্রিয়েন্ট কেজি। প্রতি বছরই হেক্টরপ্রতি সারের পরিমাণ ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে হেক্টরপ্রতি সার ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বেশি ছিল।
উফশী বীজ ও রাসায়নিক সারের মতোই বাংলাদেশের কৃষিতে সেচের ব্যবহারও বেড়েছে, যদিও অত দ্রুতগতিতে নয়। এ দেশে সনাতনী সেচ পদ্ধতির ব্যবহার স্মরণাতীত কাল থেকে শুরু হলেও আধুনিক সেচ পদ্ধতির মাধ্যমে চাষ শুরু হয় ষাটের দশকের শেষার্ধে। বাংলাদেশের অধুনা সেচ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বেশ কয়েকটি বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথমত. মোট সেচকৃত এলাকা ১৯৬৯-৭০ সালে ১ দশমিক শূন্য ৬ মিলিয়ন হেক্টর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে ১ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন হেক্টরে দাঁড়ায়। আলোচ্য সময়ে মোট শস্যজমির শতকরা হিসাবে ৯ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ দশমিক ৭-এ পৌঁছে। দ্বিতীয়ত. অংশ হিসেবে সনাতনী পদ্ধতির (দুন, দোলনা ইত্যাদি) অবদান ক্রমে হ্রাস পেয়েছে, পক্ষান্তরে আধুনিক পদ্ধতির (বিশেষ করে অগভীর নলকূপের) অংশ ক্রমে বৃদ্ধি পায়। যেখানে প্রথম বছরে এদের অনুপাত ছিল ৬৮.৫ : ৩১.৫, তা শেষ সময়কালে দাঁড়ায় ২৩.১: ৭৬.৯। পাম্প ও নালা পদ্ধতির (যেমন— জিকে প্রজেক্ট, বরিশাল সেচ প্রকল্প ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেচ প্রকল্প) অবদান মোটামুটি স্থির থাকে।
বাংলাদেশে যত ফসলে সেচ দেয়া হয়, তার প্রায় সবটাই খাদ্যশস্যের মধ্যে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে ধান ও গম ছিল মোট সেচকৃত এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশের মধ্যে, গুরুত্ব অনুসারে সবচেয়ে বেশি অংশ পড়েছে বোরোর, তারপর গম, আমন ও অন্যান্য ফসলের।
উল্লেখ্য, সেচ এলাকা উফশী বীজ এলাকার চেয়ে অনেক কম। এর তাত্পর্য হলো, অনেক উফশী ফসলে সেচের ব্যবস্থা অনুপস্থিত। তথ্যগতভাবে মোট উফশী গমের জমির ৫৬ শতাংশ, আমনের জমির ১৫ শতাংশ এবং আউশের জমির ১১ শতাংশ সেচ ছাড়াই চাষ করা হয়। মজার ব্যাপার, বোরোর ক্ষেত্রে এ চিত্রটি উল্টো। অর্থাৎ সব উফশী বীজের জমিতে সেচ দেয়া ছাড়াও দেশীয় বীজের জমিতে সেচ দেয়া হয়।
সাফল্য
উফশী প্রযুক্তি যে সফলতা অর্জন করেছে তা আজ সর্বজনবিদিত। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশের কৃষিতে এ সফলতা নিয়ে এখন পর্যালোচনার প্রয়াস চালাব।
এ প্রযুক্তির যে সফলতা সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো, শস্যের ধরনের পরিবর্তন। বলা বাহুল্য, উন্নয়নগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে স্থানীয় অথবা সনাতনী ফসলই চাষ করা হতো। এ ধরনের ফসলের উৎপাদনশীলতা (হেক্টরপ্রতি উৎপাদন) তুলনামূলকভাবে খুবই কম। উফশী প্রযুক্তি এ ধারার আমূল পরিবর্তন এনেছে। সারণি-৫-এ সন্নিবেশিত তথ্য থেকে এর প্রমাণ মেলে। ১৯৬৯-৭০, ১৯৭৫-৭৬ ও ১৯৮৪-৮৫ সালের শস্যের ধরন শতকরা হিসাবে গণনা করে পরিবেশন করা হয়েছে। এ ধরনের যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে তার দু-একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। যেখানে ১৯৬৯-৭০ সালে আউশ, আমন ও বোরোর উফশীর অংশ মোট শস্যজমিতে শূন্য কিংবা তার কাছাকাছি ছিল, ১৯৮৪-৮৫ সালে সেখানে এগুলোর অংশ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ৮ দশমিক ২ এবং ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ডাল ও তৈলবীজ এবং পাটের জমির অংশ উল্লিখিত সময়কালের মধ্যে বেশ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
সম্ভবত সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো উৎপাদন বৃদ্ধি। হামিদ ও অন্যান্যের রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার সেচের আওতায় জমিতে অসেচ এলাকার জমির তুলনায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ২ দশমিক শূন্য ৩ মে.ট থেকে ২ দশমিক ৯৮ মে.ট বেশি [৮]। এরূপ ঋণাত্মক ফলাফল লেখকের অন্যান্য গবেষকদের রিপোর্টেও পাওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়েও এর ফলাফলে সমর্থন মেলে। অর্থের হিসাবে ১৯৭২-৭৩-এর স্থিরকৃত মূল্যে কৃষি থেকে জাতীয় আয়ের পরিমাণ ১৯৬৯-৭০-এ ৩ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা থেকে ১৯৮৫-৮৬ সালে আনুমানিক ৪ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পায়। পরিমাণগতভাবেও দেখা যায়, ১৯৮৪-৮৫ সালে সেচ দ্বারা চাষকৃত উফশী আমনের ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন (চালের মাপে) ছিল ২ দশমিক শূন্য ৪ মে.ট, অথচ সেচ ছাড়া স্থানীয় ছিটানো বীজের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ১ মে.ট।
১৯৮৪-৮৫ সালে মোট প্রায় ১৬ মিলিয়ন মে.ট খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করে দেখা যায়, ওই বছরে যদি উফশী প্রযুক্তির (বিশেষ করে উফশী বীজ ও সেচ) প্রসার না ঘটত এবং যদি সমপরিমাণ জমি খাদ্যশস্যের আওতায় থাকত, তাহলে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৪ মিলিয়ন মে.টনের বেশি হতো না। এর তুলনায় প্রাপ্ত উৎপাদন প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। এ পরিমাণকেই (অর্থাৎ ২.২ মিলিয়ন মে.ট) আমরা উফশী প্রযুক্তির নিট অবদান হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। একইভাবে নয় বছর আগে ১৯৭৫-৭৬ সালের জন্য উফশীর অবদান চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। দেখা যায়, উফশীর প্রয়োগ ব্যতীত প্রাপ্ত ১৩ মিলিয়ন মে.ট খাদ্য উৎপাদনের স্থলে ১১ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মে.ট উৎপাদিত হতো। এ পরিমাণ প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ হিসাবে (অন্য কথায় ব্যবহূত তথ্যে বড় রকমের কোনো ত্রুটি না থাকলে) এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, উফশী প্রযুক্তি সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি উফশী প্রযুক্তির সাফল্যের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। উল্লিখিত হামিদ ও অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় প্রযুক্তির তুলনায় উফশী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি শ্রমের ব্যবহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। এক হিসাবে দেখা যায়, অসেচ এলাকায় হেক্টরপ্রতি পারিবারিক ও ভাড়াটে শ্রম দিবসের সংখ্যা যেখানে ১৮৩, সেখানে সেচ এলাকায় এ সংখ্যা ২৮৯। অর্থাৎ ৫৮ শতাংশের বেশি।
১৯৮৪-৮৫ সালে মোট ১৬ মিলিয়ন মে.ট খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রায় ৬ দশমিক ১১ মিলিয়ন শ্রমবর্ষ ব্যবহূত হয়েছে। উফশী ব্যতীত শ্রমবর্ষের সংখ্যা পাওয়া গেছে ৫ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, কেবল খাদ্যশস্য (চাল ও গম) উৎপাদনের ক্ষেত্রে উফশী প্রযুক্তি প্রায় শূন্য দশমিক ৪৭ মিলিয়ন শ্রমবর্ষ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে; শতকরা হিসাবে এর পরিমাণ ৮ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির দেশে উফশীর এ অবদান খাটো করে না দেখাই শ্রেয়। আগ্রহী পাঠকরা ১৯৭৫-৭৬ সালের শ্রমবর্ষের হিসাব ওই সারণি থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
গণনায় প্রতীয়মান হয়, ১৯৬১-৭৪ সময়কালে সামান্য হলেও শ্রমিকপ্রতি খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, বৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ১৯৬১-৮৪ সময়কালে এ হার একটু বেশি— ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এটি মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য। ১৯৭৪-৮৪ সময়কালে যে বৃদ্ধির হার পাওয়া গেছে (৩%), তাতে সন্দেহ পোষণ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি লক্ষ করলে বোঝা যায়, ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে শহরের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার (১১%) গ্রামের চেয়ে ছিল অনেক বেশি (১.২%)। স্বভাবতই ধরে নেয়া যায়, গ্রাম থেকে অনেক লোক শহরে স্থানান্তর হয়েছে। এদের সংখ্যা কত? যদি ধরে নিই, শহরের লোকসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় পর্যায়ের মতোই ছিল, অর্থাৎ ২ দশমিক ৪ শতাংশ, তাহলে শহরের স্বাভাবিক লোকসংখ্যা দাঁড়ায় ৮ দশমিক শূন্য ২ মিলিয়ন। অতএব ১৪.০৯-৮.০২ = ৬.০৭ মিলিয়ন লোক গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছে বলে অনুমান করা যায়। আবার উল্লিখিত সময়কালে মোট জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫১ মিলিয়ন। অর্থাৎ ১৩.৫১-৬.০৭ = ৭.৪৪ মিলিয়ন লোক (অতিরিক্ত) গ্রামেই থেকে গেছে। এখন যদি ১৯৭৪ সালে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ১৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন এবং ১৯৮১ সালে ১৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন হয়, তাহলে বাকি ১ দশমিক ৪ মিলিয়নসহ ৭ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন বাড়তি লোক গেল কোথায়? স্বভাবতই যেকোনো একটি তথ্য বেঠিক হতে বাধ্য। তবে যেহেতু ১৯৮৩-৮৪ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য আমাদের হাতে আছে এবং ১৯৮১ সালের তথ্য সেভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, সেহেতু আমরা ১৯৭৪ সালের হিসাবটি সন্দেহযুক্ত এবং ঊর্ধ্বগামী পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট বলে আখ্যায়িত করতে পারি। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৪-৮৪ সময়কালের জন্য গণনাকৃত শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনের হারও ঊর্ধ্বগামী পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট।
উফশী প্রযুক্তির সুবিধাভোগীদের তালিকায় খুদে ও প্রান্তিক কৃষকদের নামও দেখা যায়। তারাও যে সুবিধা পাচ্ছেন, এ বিশ্বাসের ভিত্তি হলো উফশী গ্রহণে তাদের অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৮৩-৮৪ কৃষিশুমারি অনুযায়ী, এ শ্রেণীর কৃষকরা তাদের মোট আবাদি খাদ্যশস্যের জমির ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ উফশীর আওতায় আনেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ সংখ্যা বাকি দুটো শ্রেণীর (মাঝারি ও বড়) কৃষকদের চেয়ে বেশি। এরূপ ফলাফল বিভিন্ন ব্যষ্টিগত গবেষণা থেকেও পাওয়া গেছে। স্বভাবতই অনুমান করা হয়, খুদে ও প্রান্তিক কৃষকরাও উফশী প্রযুক্তি সুবিধার অংশীদার। আবার যেহেতু নিবিড় সেচ এলাকায় কৃষি শ্রমিকের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি, সেহেতু এ এলাকার শ্রমিকরা বেশ উচ্চহারে মজুরিপ্রাপ্ত হন।
উল্লিখিত সরাসরি প্রভাব ছাড়াও উফশী প্রযুক্তি পরোক্ষভাবেও পল্লী উন্নয়নে প্রভাব রাখতে পারে। বিভিন্ন ব্যষ্টিগত গবেষণার ফল থেকে জানা যায়, নিবিড় সেচ এলাকায় প্রচুর চালকল স্থাপিত হয়েছে। বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলায় এ লেখক ১৯৮২ সালে এক গবেষণা পরিচালনাকালে লক্ষ করেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যে ওই উপজেলায় চালকলের সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে ১৭-তে উন্নীত হয়। ফলে ঢেঁকি প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও গরিব লোকেরা বাজার থেকে ধান কিনে, বাড়িতে সিদ্ধ-শুকানোর কাজ সেরে, চালকলে ভাঙিয়ে বাজারে বিক্রি করে। তথ্য সংগ্রহকালে এরূপ বহু ধান প্রক্রিয়াকরণ পরিবারের আবির্ভাব লক্ষ করা গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং এর ধাক্কায় রাস্তাঘাটের সংস্কার ও উন্নয়নও লক্ষ করা গেছে। উফশী প্রযুক্তির আরো একটি প্রভাব দেখা যায় তা হলো, নেতৃত্ব সৃষ্টি। গভীর নলকূপ কিংবা শক্তিচালিত পাম্প ব্যবহারকালে যেহেতু ৪০ থেকে ৭০ জন কৃষকের যৌথভাবে কাজ করতে হয়, সেহেতু তাদের মধ্যে (বিশেষ করে যারা ব্যবস্থাপক কিংবা চেয়ারম্যান হন) নেতৃত্বের সূচনা ঘটেছে। এ ধরনের প্রভাব পল্লী উন্নয়ন সহায়ক হওয়াই স্বাভাবিক।
সংশয়
আমরা এতক্ষণ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উফশী প্রযুক্তির সাফল্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরলাম। আগেই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। সাফল্যের এ চিত্র যদি নির্ভেজালও হয়, তবুও যে সত্যটা পাশাপাশি থেকে যাচ্ছে তা হলো, দারিদ্র্যের ক্রমবর্ধমান গতি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৬৩-৬৪ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল, এ হার ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭৭-৭৮ সালে ৬৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এ কারণেই উফশী প্রযুক্তির সাফল্যের মধ্যে সংস্কারের অবকাশ থাকা অস্বাভাবিক নয়। এ অধ্যায়ে সম্ভাব্য সংশয়গুলো প্রথমে প্রশ্নাকারে প্রকাশ করে, পরে প্রাপ্ত তথ্য বা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিচার করা হবে।
এক. উফশী প্রযুক্তি শস্যের ধরনের পরিবর্তন এনেছে, এ কথা সত্য কিন্তু এতে শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে কি?
উফশী প্রযুক্তি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি শস্যের নিবিড়তা বেড়ে যায়, এমনকি যদি স্থিরও থাকে, তবে তার ফলাফল সংশয়মুক্ত হতে বাধ্য (অন্যান্য জিনিস পরিবর্তন না হওয়া সাপেক্ষে)। কিন্তু যদি এ নিবিড়তা হ্রাস পায়, তাহলে সার্বিক ফলাফল সংশয়মুক্ত হতে পারে না। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে শস্যের নিবিড়তা ১৯৬৯-৭০ সালে ১৫১ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১৯৭১-৭২ সালে ১৩৮ শতাংশ হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় এ নিবিড়তা ক্রমে বেড়ে ১৯৮২-৮৩ সালে ১৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও অধুনাকালে তা আবার হ্রাস পেতে শুরু করেছে। সার্বিকভাবে এ সময়কালের প্রবৃদ্ধির হার যদিও ধনাত্মক এসেছে, তবে তা মাত্র শূন্য দশমিক ৬২। এটি দেশের সার্বিক শস্য খাতের চিত্র। হামিদ ও অন্যান্যের রিপোর্টে দেখা যায়, গঙ্গা প্লাবিত এলাকায় (এরূপ এলাকা সারা বাংলাদেশে মোট শস্যজমির এক-চতুর্থাংশের বেশি) সেচের মাধ্যমে চাষকৃত জমির শস্যের নিবিড়তা (১২৯%) অন্যান্য এলাকার চেয়ে কম (১৩৬%)। এ ধরনের এলাকায় কৃষকরা নানা কারণে আগের দুটি (কিংবা তিনটি) স্থানীয় ফসলের পরিবর্তে একটি (কিংবা দুটি উফশীসহ) উফশী ফসল করছেন। ব্যাখ্যায় দেখা যায়, মাঘ মাসের দিকে তারা উফশী ধান চাষ শুরু করেন এবং বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ধান কাটেন। ধান কাটার দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই বন্যার পানি এসে যায়। আবার কার্তিক, অগ্রহায়ণ মাসের দিকে যখন বন্যার পানি সরে যায়, তখন উফশী ধান আবাদ করার আগে সময় থাকে মাত্র দুই মাস কিংবা তারও কম। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব নয় বিধায় অনেকেই ওই একটি ফসলই করেন।
দুই. উফশী প্রযুক্তি সার্বিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে সন্দেহ নেই। তবে সেই বর্ধিত উৎপাদনের উৎস কী— জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, না চাষের আওতায় জমি বৃদ্ধি? দেশের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি যদি জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে না হয়ে খাদ্যশস্যের আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে হয়, তবে তার সার্বিক ফলাফল সংশয়মুক্ত নয়। এ বিষয়টি যাচাই করার জন্য ১৯৬৯-৭০ থেকে ১৯৮৪-৮৫ পর্যন্ত উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার, খাদ্যশস্যের আওতায় জমির পরিমাণ প্রবৃদ্ধির হার এবং হেক্টরপ্রতি ফলন প্রবৃদ্ধির হার গণনা করা হয়েছে। মজার ব্যাপার, প্রতিটি খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রেই (কেবল গম ব্যতীত, যার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম) জমির পরিমাণের প্রবৃদ্ধির হার উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলন প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হয়েছে। এ ফলাফল খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। এ থেকে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশে উফশীর আমলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং এর আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য। উল্লেখ্য, মোট চালের ক্ষেত্রে মোট উৎপাদন বেড়েছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে, পক্ষান্তরে জমির পরিমাণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ হারে, যাতে ফলন প্রবৃদ্ধির হারে হয়েছে ঋণাত্মক (-২.১২%)।
তিন. খাদ্যশস্যের বর্ধিত জমির উৎস কোথায়?
বাংলাদেশে এখনো ‘আবাদযোগ্য-অনাবাদি’ এবং ‘বর্তমানে অনাবাদি’ জমির পরিমাণ প্রচুর। ১৯৮৪-৮৫ সালে মোট আবাদি জমিতে এর অংশ ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। খাদ্যশস্যের আওতায় বর্ধিত জমি যদি এ ধরনের অনাবাদি জমি থেকে এসে থাকে, তবে তার নিট ফলাফল হবে নির্ভেজাল আনন্দদায়ক; কিন্তু তা না হয়ে যদি অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের অংশ কমিয়ে এ জমি বাড়ানো হয়ে থাকে, তবে তার নিট ফলাফল সংশয়মুক্ত নয়। ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় ১৯৮৪-৮৫ সালে খাদ্যশস্যের আওতায় জমির পরিমাণ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ (নিট হিসাবে) বেশি। সবচেয়ে বেশি জমি বেড়েছে উফশী বোরোর (অতিরিক্ত ৭.৬%) এবং উফশী আমনের ক্ষেত্রে (অতিরিক্ত ৮.২%)। আরো দেখা যায়, এই বাড়তি জমির মূল উৎস পাটের জমি (-২.৪%), ডাল ও তৈলবীজের জমি (-১.০%) এবং অন্যান্য (-১.৬%) বিশেষ করে তামাকের জমি। আলোচ্য সময়কালে ওই ‘আবাদযোগ্য-অনাবাদি’ এবং ‘বর্তমান অনাবাদি’ জমির অবস্থা কেমন হয়েছে? বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, এ জমির পরিমাণ ১৯৬৯-৭০ সালে শূন্য দশমিক ২৯৮ মিলিয়ন হেক্টর থেকে বেড়ে ১৯৮৪-৮৫ সালে শূন্য দশমিক ৩৮৯ মিলিয়ন হেক্টর হয়েছে। অর্থাৎ শতকরা হিসাবে প্রায় ৩১ শতাংশ, তাও আবার মাত্র ১৬ বছরে। আরো উল্লেখ করা যায়, এ সময়কালে বন এলাকার পরিমাণ ২ দশমিক ২৪ মিলিয়ন হেক্টর থেকে ২ দশমিক ১৪ মিলিয়ন হেক্টরে হ্রাস পেয়েছে। অতএব ডাল, তৈলবীজ, মরিচসহ পাট উৎপাদন কমিয়ে কিংবা বন এলাকা সাফ করে শুধু ধান ও গম উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল প্রয়োগে দেশের সার্বিক নিট সুবিধা কতটুকু হয়েছে তা অবশ্যই সংশয়মুক্ত হতে পারে না।
চার. আধুনিক সেচ পদ্ধতির মাধ্যমে সেচের জমির (বিশেষ করে অগভীর নলকূপের মাধ্যমে) ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি হয়তোবা আশার বাণী শোনায় কিন্তু এর সংশ্লিষ্ট পর্দার আড়ালের ছবিটির দিকে খেয়াল করা হচ্ছে কি?
আগেই বলা হয়েছে, আধুনিক সেচ পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যে পদ্ধতিটি পালন করছে, সেটি হলো অগভীর নলকূপ। বাংলাদেশে এরূপ নলকূপের ব্যবহার প্রসার লাভ করে ১৯৭৭ সালের পরে। এর জীবনকাল সাধারণত ৭ থেকে ১২ বছর। যে তথ্যটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো, ১৯৮০-৮১ সাল নাগাদ বিএডিসি, বিকেবি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৪১ হাজার ৩৭৭টি অগভীর নলকূপ বিক্রয় করা হয়, অথচ ওই বছরে মোট অগভীর নলকূপ ব্যবহারের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৩০, অর্থাৎ অব্যবহূত ছিল ৩২ শতাংশ নলকূপ (এর কিছু অংশ হয়তো অসেচ কাজে, যেমন— ধান ভানা ও নৌকা চালানোয় ব্যবহার হয়ে থাকবে)। এভাবে দেখা যায়, ১৯৮২-৮৩ সাল নাগাদ মোট নলকূপ বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫৯টি, ব্যবহার হয়েছে ৬২ হাজার ২৫৩টি। অর্থাৎ অব্যবহূত থেকেছে শতকরা ৪২টি। ১৯৮৪-৮৫ সালে যথাক্রমে এ সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮, ৭৩ হাজার ৬৬ এবং ৫৩ শতাংশ। অতএব এটি প্রমাণিত হলো, একটি অগভীর নলকূপ ব্যবহার করতে হলে কমপক্ষে দুটি নলকূপ বাজারে ছাড়তে হচ্ছে। এটি কি উফশী প্রযুক্তি বিকাশের শুভ লক্ষণ?
পাঁচ. উফশী প্রযুক্তি কর্মসংস্থান যে সৃষ্টি করছে তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের, বিশেষ করে পল্লী বাংলার বেকারত্বের অবসান ঘটবে— এরূপ চিন্তা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কতখানি সংশয়মুক্ত?
আসুন, প্রথমে প্রাপ্ত তথ্যাবলি জেনে নিই: (ক) ১৯৮৩-৮৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে বাংলাদেশের মোট গ্রামীণ বেসামরিক শ্রমশক্তির সংখ্যা ২৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে ১৯৮৪-৮৫ সালে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ১ মিলিয়ন (খ) ওই জরিপ অনুযায়ী ১৯৮৩-৮৪ সালে কৃষিতে নিয়োজিত মোট শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন এবং তা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে এ সংখ্যা তার পরের বছরে দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন। এটাও লক্ষণীয়, এ হিসাব অনুযায়ী কৃষির বাইরে শ্রমশক্তি থাকছে ২৫.১-১৬.৫ = ৮.৬ মিলিয়ন (গ) আমাদের হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৪-৮৫ সালে খাদ্য খাতে মোট ব্যবহূত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ১১ মিলিয়ন, যা কৃষিতে নিয়োজিত মোট শ্রমিকের এক-চতুর্থাংশ এবং মোট গ্রামীণ বেসামরিক শ্রমশক্তির ৩৭ শতাংশ (ঘ) মোট উফশী এলাকার (সেচের মানে) ৯০ শতাংশই খাদ্যশস্যের আওতায়, যা অদূরভবিষ্যতে আরো বাড়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান (ঙ) আমাদের হিসাব অনুযায়ী ১৯৭৫-৭৬ থেকে ১৯৮৪-৮৫ সালের মধ্যে খাদ্য খাতে শ্রমবর্ষ বেড়েছে সার্বিকভাবে মাত্র ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ (৫.৭৮ মি. থেকে ৬.১১ মি.), অথচ ওই সময়কালে সেচের আওতায় জমির পরিমাণ বেড়েছে ৪৭ শতাংশ (১.২৬৮ মি.হে থেকে ১.৮৬৫ মি.হে)। এ তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ১২। উল্লেখ্য, ক্লে ও খান তাদের গবেষণায় এ স্থিতিস্থাপকতা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৫ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন।
এ পটভূমিতে আমরা যদি কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা শূন্য দশমিক ২ ধরি এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের সেচ এলাকার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ ধরি (এ হার ১৯৭৫-৭৬ থেকে ১৯৮৪-৮৫ সালের মধ্যে ছিল মোটামুটি ৪ দশমিক ৪), তাহলে খাদ্য খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। এ অনুমানের ভিত্তিতে একটু হিসাব করে দেখানো যায়, ১৯৮৯-৯০ (অর্থাৎ তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষ বছরে) সালে মোট শ্রমের ব্যবহার হবে ৬ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন, অর্থাৎ ১৯৮৪-৮৫ সালের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩৭ মিলিয়ন বেশি। এভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও কৃষির বাইরে রাখা শ্রমশক্তিকে কৃষির আওতায় আনার চিন্তা দূরে থাক, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট নতুন শ্রমশক্তির জন্য কৃষিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা অবাস্তব। তাই তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় খাদ্য খাতে যে অতিরিক্ত এক মিলিয়নের অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা ঊর্ধ্বগামী পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট হতে বাধ্য।
ছয়. উফশী প্রযুক্তির প্রভাবে খুদে ও প্রান্তিক চাষীরা উপকৃত হয়েছেন এটা প্রমাণযোগ্য, কিন্তু তাতে কি ধনী-গরিবের বৈষম্য হ্রাস পেয়েছে?
এ সংশয়টি বিচার করার জন্য ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত উভয় প্রকার তথ্যই আমাদের হাতে আছে। হামিদের প্রবন্ধে দেখা যায়, আধুনিক সেচ ব্যবহারকারী কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য বিদ্যমান। খুদে কৃষকদের তুলনায় মাঝারি ও বড় কৃষকদের একরপ্রতি নিট আয় যথাক্রমে ৫ ও ১০ শতাংশ বেশি। সনাতনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে এ বৈষ্যমের চিত্র ঠিক উল্টো। মাঝারি কৃষকদের আয় (সেখানে বড় কৃষক পাওয়া যায়নি) খুদে কৃষকদের তুলনায় ৫ শতাংশ কম। সেচবহির্ভূত এলাকায় ওই বৈষম্য আরো বেশি। সেখানে মাঝারি ও বড় কৃষকদের নিট একরপ্রতি আয় খুদে কৃষকদের তুলনায় যথাক্রমে ১৮ ও ৩৫ শতাংশ বেশি। ওই প্রবন্ধে আরো দেখা যায়, একরপ্রতি নিট আয়ের পরিবর্তে যখন মোট খামারপ্রতি আয় বিবেচনা করা হয় তখন বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য আরো বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক সেচের আওতায় খামারপ্রতি নিট কৃষি আয় খুদে কৃষকদের তুলনায় মাঝারি ও বড় কৃষকদের যথাক্রমে ১০০ ও ৩৪৮ শতাংশ বেশি। এ ধরনের তথ্য থেকেই উপসংহার টানা হয়: যদিও উফশী প্রযুক্তির (সেচ) প্রভাব খুদে ও বড় কৃষকদের একরপ্রতি নিট আয়ের বৈষম্য হ্রাস করেছে কিন্তু তাদের মধ্যকার নিট কৃষি আয়ের বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের তথ্যের জন্য এমপিও কর্তৃক প্রকাশিত ফলাফলের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি থেকে যে ফলাফল লক্ষ করা যায়, তা পূর্বোল্লিখিত ফলাফলের অনুকূলে। দেখা যায়, সেচহীন অবস্থায় যে বৈষম্য ছিল, তা সনাতনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে হ্রাস পায় কিন্তু আধুনিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে জিনি সহগের সাহায্যে বৈষম্য পরিমাপের চেষ্টা করা হয়েছে। দেখা যায়, সেচবহির্ভূত এলাকায় জিনি সহগ যেখানে শূন্য দশমিক ৩৩, তা প্রধান সেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৪৯। অতএব আধুনিক সেচ পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে খুদে/বড় কৃষকদের আয়ের বৈষম্য যে বেড়েছে তা নিঃসন্দেহে সত্য।
সাত. উফশী প্রযুক্তি বিকাশের ফলে বড় কৃষকরা আরো বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু সেই বর্ধিত আয়ের কোনো অংশ উদ্ধারের সরকারি উদ্যোগ সফল হয়েছে কি? কিংবা সেই আয় কৃষকরা নিজেরাই কৃষি উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন কি?
‘কৃষি উন্নয়ন দেশের সার্বিক উন্নয়নের চাবিকাঠি’— এ ধরনের উক্তির যথার্থতা বিচারে এ প্রশ্নের উত্তর বা ব্যাখ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উফশী প্রযুক্তি প্রসারের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন উপকরণের ওপর সরকার প্রচুর ভর্তুকি প্রদান করত। সে কারণে কৃষকদের বাড়তি আয়ের একটি অংশ তুলে নেয়ার সরকারি উদ্যোগকে সবাই সমর্থন জানাত। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই ভর্তুকি ক্রমে হ্রাস করা হয়েছে। হাত নলকূপ ও অগভীর নলকূপের ওপর ভর্তুকি মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সার, পাম্প ও গভীর নলকূপের ওপর যথাক্রমে ১০, ২০ ও ২৫ শতাংশ ভর্তুকি এখনো রয়ে গেছে। তবে এর পরিমাণ প্রতি বছরই হ্রাস পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে যেসব সেচ প্রকল্প (যেমন— ঠাকুরগাঁ গভীর নলকূপ প্রকল্প, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা প্রকল্প ইত্যাদি) পরিচালিত হচ্ছে, তাতে শুধু যে মূলধন খরচই ভর্তুকি হিসেবে দেয়া হচ্ছে তাই নয়, বরং চলতি ব্যয়ও ভর্তুকি হিসেবে চলে যাচ্ছে। এতে বিভিন্ন প্রকল্পের কৃষকদের মধ্যে আয়ের চরম বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। মজার কথা, ১৯৬৩-৬৪ সাল থেকে এ ধরনের প্রকল্প চালু হলেও ১৯৭৬ সালের আগ পর্যন্ত সেচ ব্যবহারকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সেচকর আদায়ের কোনো চিন্তাভাবনাই করা হয়নি। পরে ওই ধরনের প্রকল্পের আওতার কৃষকদের কাছ থেকে তাদের বর্ধিত আয়ের ৩ শতাংশ সেচকর ধার্য করা হয়। কিন্তু তা আদায়ের ছবি একেবারেই অসন্তোষজনক (১২; ৩-৬৪)। দেখা যায়, ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জিকে প্রজেক্ট, জিডব্লিউডি প্রজেক্ট, ডিএনডি সেচ প্রকল্প ও তুরং সেচ প্রকল্পের জন্য মোট ২৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন টাকার কর ধার্য করে। কিন্তু ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র শূন্য দশমিক ৬ মিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ মোট ধার্যকৃত পরিমাণের মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। স্বভাবতই এ ধরনের বিফলতা উফশী প্রযুক্তির সাফল্যে ফাটল সৃষ্টি করছে।
ওই বর্ধিত আয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারেও কিছু মন্তব্য করা যায়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সেচ থেকে প্রাপ্ত আয়ের সিংহভাগই খরচ হয় মাত্র দুটি খাতে— ভোগ (৩২%) ও জমি ক্রয় (৩১%)। কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য ব্যয় হয় মাত্র ২ শতাংশ। বাকি অর্থ ব্যয় হয় শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি খাতে। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, যেসব কৃষক তাদের নগদ টাকা শিল্প স্থাপনের (বিশেষ করে ওয়ার্কশপ স্থাপনে) জন্য বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ছিলেন, তারা তা বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হননি প্রধানত দুটো কারণে— এক. তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান একেবারেই সীমিত এবং দুই. নেতৃত্বদানকারী সংস্থার (বিএডিসি) উদাসীনতা ও অদক্ষতা। মাহবুব তার আলোচনায় এ প্রসঙ্গে আরো সুন্দর ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তার মতে, বিত্তবান কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ না করার মূল কারণ হলো, ওইসব যন্ত্রের অভিজ্ঞতা এবং তার পরিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত আয়তন ও অবস্থানের খামারের অভাব। উল্লেখ্য, সবচেয়ে ছোট আধুনিক যন্ত্র (অগভীর নলকূপ) ব্যবহারের জন্য কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ হেক্টর জমির প্রয়োজন। যাদের এ পরিমাণ কিংবা এর বেশি জমি আছে সেগুলোও আবার বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত এবং বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো। তবে সেচযন্ত্র কিনে তার সাহায্যে পার্শ্ববর্তী জমির মালিকদের কাছে পানি বিক্রি করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়নি, এ কথা ঠিক নয়। কিন্তু এ ধরনের প্রচেষ্টা পানির ক্রেতাদের আর্থিক অসচ্ছলতা ও কৃষিপণ্যের ওঠানামার দরুন মার খেয়ে যাচ্ছে। এর উপরেও রয়েছে কৃষি উপকরণ ও কৃষিপণ্যের দামের অসামঞ্জস্য। উল্লেখ্য, বিগত বছরগুলোয় কৃষিপণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বেড়েছে কৃষি উপকরণের মূল্য।
আট. সর্বশেষ কিন্তু সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংশয় হলো, মোট খাদ্যশস্য কিংবা উফশী বীজের আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব পরিসংখ্যানগত তথ্য ব্যবহূত হয়েছে, তা কতখানি সংস্কারমুক্ত, নির্ভেজাল?
বলতে গেলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোই বাংলাদেশের তথ্য সরবরাহের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। গ্রামবাংলা কিংবা কৃষি সম্পর্কে যেসব তথ্য সরবরাহ করা হয়, তা সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও এর কিছু ত্রুটি সবারই জানা। ইউনিয়ন পর্যায়ে যারা তথ্য সংগ্রহ করেন (যা পরবর্তী পর্যায়ে শুধু যোগ করার কথা) তাদের যথোপযুক্ত দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। গ্রাম পর্যায়ে গবেষণা পরিচালনাকালে এ লেখক লক্ষ করেছেন, অনেক সময় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে কোনো কোনো বছরের তথ্য সরবরাহ করা না হলেও উপজেলা পর্যায়ে তা ঠিকই সংযোজন হয়। আবার এ তথ্য যখন উপরের পর্যায়ে বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে যায়, সেখানে ‘সামান্য শুদ্ধিকরণ’ ও ‘সমন্বয়করণ’-এর নামে যা করা হয়, তা অবগত হলে এসব তথ্যের প্রতি বিশ্বাস খর্ব হতে বাধ্য। শোনা যায়, জাতীয় পর্যায়ে কোনো বছরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের আগে তার ‘রাজনৈতিক’ যথার্থতাও বিচার করা হয়। তবে যেহেতু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যের আর কোনো বিকল্প নেই সেহেতু ওই তথ্য ঊর্ধ্বগামী কিংবা নিম্নগামী পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট কিনা, তাও বলার উপায় নেই।
ভাগ্যের কথা, ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি কৃষিশুমারি হয়ে গেছে। তিন-চার বছর বিলম্বে হলেও এর বিভিন্ন রিপোর্ট এখন বাজারে আসতে শুরু করেছে। এর একটি রিপোর্ট থেকে (ভলিউম ‘দুই’) ১৯৮৩-৮৪ সালে খাদ্যশস্যের আওতায় জমি সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত ১৯৮৩-৮৪ সালের প্রচলিত তথ্যের মধ্যে বড় রকমের গরমিল লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৯৮৩-৮৪ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী যদিও ওই সালে খাদ্যশস্যের আওতায় মোট জমি ছিল ৯ দশমিক ৭৭৭ মিলিয়ন হেক্টর, প্রচলিত তথ্যে তা দেখানো হয়েছে (যা আমরা আমাদের আলোচনার জন্য ব্যবহার করেছি) ১১ দশমিক শূন্য ৭৪ মিলিয়ন হেক্টর, অর্থাৎ ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। ব্যষ্টিগতভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, শুমারির তুলনায় প্রচলিত তথ্যে আমনের এলাকা দেখানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি (২৪%), তারপর এসেছে বোরো (১০%)। শুধু মোট খাদ্যশস্যের জমির ব্যাপারেই নয়, উফশীর জমির ক্ষেত্রেও বিরাট গরমিল। ওই সালে প্রচলিত তথ্যে দেখা যায়, মোট খাদ্যশস্য জমির ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভালো উফশীর আওতায়, শুমারির তথ্যে এ সংখ্যা মাত্র ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। পাঠকরা প্রশ্ন রাখতে পারেন, কোন উেসর তথ্য সত্য কিংবা বেশি নির্ভরশীল? আমি নির্দ্বিধায় জবাব দেব: শুমারির তথ্য বেশি নির্ভরশীল। কারণ একটিই, এটি পরিচালনা করতে রাষ্ট্রকে খরচ করতে হয়েছে কোটি কোটি টাকা। আমার জবাব যদি মেনে নেয়া হয়, তবে ফলাফল মোটেই সুখকর হওয়ার নয়। অর্থাৎ আমরা উফশীর সাফল্য প্রদর্শন করতে গিয়ে যেসব তথ্য ব্যবহার করেছি, তার সবই ঊর্ধ্বগামী পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট। অন্য কথায়, আমরা উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান দিয়েছি, প্রকৃত উৎপাদন হবে এর চেয়ে ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ কম। যে কর্মসংস্থানের হিসাব দিয়েছি, তারও প্রকৃত পরিমাণ হবে ওই পরিমাণ কম এবং সর্বোপরি দেশের দারিদ্র্যের আকার হবে তার চেয়ে ওই পরিমাণ বেশি।
[বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি, ১৯৮৯’ থেকে পুনঃমুদ্রণ]
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক





